জ্বালানিসংকটে অস্থির কাপড় ও সুতার বাজার

Passenger Voice    |    ১১:২০ এএম, ২০২৬-০৪-০২


জ্বালানিসংকটে অস্থির কাপড় ও সুতার বাজার

দেশের বস্ত্রশিল্পের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র নরসিংদীর বাবুরহাট ও মাধবদী এলাকার কাপড় ও সুতার বাজার জ্বালানিসংকটের কারণে অস্থির হয়ে উঠেছে। গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতিতে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় সুতার সরবরাহ কমে গেছে এবং বেড়েছে উৎপাদন খরচ। এতে বিপাকে পড়েছেন তাঁতি, ব্যবসায়ী, শ্রমিক ও পরিবহনসংশ্লিষ্টরা।

দেশের মোট কাপড়ের প্রায় ৭০ শতাংশ সরবরাহ করা হয় ‘প্রাচ্যের ম্যানচেস্টার’ হিসেবে পরিচিত নরসিংদীর এই অঞ্চল থেকে। কিন্তু চলমান জ্বালানিসংকটের প্রভাবে সুতার বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি দেখা দিয়েছে। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, গত কয়েক সপ্তাহে প্রতি পাউন্ড সুতার দাম ১০ থেকে ১২ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে, যা কাপড়ের বাজারে সরাসরি প্রভাব ফেলছে।

গতকাল বুধবার দুপুরে সরেজমিন বাবুরহাট ও মাধবদীর বিভিন্ন মার্কেট ঘুরে দেখা যায়, আগের তুলনায় ক্রেতার উপস্থিতি অনেক কম। দোকানগুলোতে বিক্রেতারা অপেক্ষায় থাকলেও বিক্রি সন্তোষজনক নয়। ব্যবসায়ীদের মুখে উদ্বেগের ছাপ স্পষ্ট। মিলগুলোতে নিয়মিত গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ না থাকায় উৎপাদন স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হচ্ছে না বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

স্থানীয় তাঁতি আবু তাহের বলেন, ‘উৎপাদন খরচ এত বেড়ে গেছে যে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। সুতা, রং ও শ্রমিক মজুরি–সবকিছুর দাম বেড়েছে।’ তিনি আরও বলেন, জ্বালানিসংকটের অজুহাতে কোনো অসাধু সিন্ডিকেট যেন বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে, সে বিষয়ে সরকারের নজরদারি জরুরি।

আরেক তাঁতি আব্দুল করিম জানান, আগে সপ্তাহে তিন থেকে চারটি অর্ডার পেতেন, কিন্তু এখন একটি কাজও নিয়মিত পাচ্ছেন না। তিনি বলেন, ‘সুতার দাম বাড়ায় উৎপাদন চালানোই কঠিন হয়ে গেছে।’

স্থানীয় ব্যবসায়ী সুমন সাহা বলেন, বাজারে ক্রেতা কমে যাওয়ার পাশাপাশি উৎপাদন খরচ বেড়েছে। বিক্রি না বাড়ায় লাভের পরিবর্তে পুঁজি ধরে রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক ব্যবসায়ী নতুন অর্ডার নিতে দ্বিধায় রয়েছেন বলেও জানান তিনি।

এদিকে জ্বালানিসংকটের প্রভাব পড়েছে পরিবহন খাতেও। ট্রাকচালক রহিম মিয়া বলেন, তেলের সংকট ও খরচ বৃদ্ধির কারণে পরিবহন ভাড়া বেড়েছে। ফলে ব্যবসায়ীরা নিয়মিত পণ্য পরিবহন করতে পারছেন না, এতে চালকদের আয় কমে গেছে। একই অভিযোগ করেন ট্রাকমালিক জাকির হোসেন। তিনি জানান, আগের মতো ট্রিপ না পাওয়ায় পরিবহন ব্যবসাও ক্ষতির মুখে পড়েছে।

তাঁতশিল্প শ্রমিক রফিকুল ইসলাম বলেন, আগে নিয়মিত কাজ থাকলেও এখন অনেক দিন কাজ ছাড়া বসে থাকতে হচ্ছে। আয় কমে যাওয়ায় পরিবারের খরচ চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে ক্রেতারাও বাড়তি দামের চাপ অনুভব করছেন। স্থানীয় বাসিন্দা নাজমা বেগম বলেন, কাপড়ের দাম বেড়ে যাওয়ায় প্রয়োজন থাকলেও সব সময় কেনাকাটা করা সম্ভব হচ্ছে না।

মাধবদীর আনন্দ ইয়াংয়ের স্বত্বাধিকারী বিনয় দেবনাথ বলেন, সুতাসংকটের কারণে পরিস্থিতি এখনো অনিশ্চিত। তবে দাম বাড়লেও তাঁতিদের সুতা সরবরাহ বন্ধ করা হয়নি। আগামী সপ্তাহে বাজার পরিস্থিতি আরও পরিষ্কার বোঝা যাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

ব্যবসায়ীরা জানান, দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করা এবং সুতার বাজার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ না নিলে দেশীয় বস্ত্র খাত বড় সংকটে পড়তে পারে। নরসিংদীর ঐতিহ্যবাহী এই শিল্প স্থানীয় অর্থনীতির পাশাপাশি দেশের রপ্তানি আয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়ায় সংশ্লিষ্টরা সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।