শিরোনাম
Passenger Voice | ১২:০২ পিএম, ২০২৬-০৩-৩১
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুর দুর্বল ব্যাংক হিসেবে চিহ্নিত করে পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংককে (সোশ্যাল ইসলামী, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, ইউনিয়ন, গ্লোবাল ইসলামী ও এক্সিম ব্যাংক) একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করেছেন। আমানতকারীদের আস্থা ফেরানো, তারল্য সংকট দূর করা এবং শরিয়াহ মোতাবেক ব্যাংকিং সেবা পরিচালনা করার লক্ষ্যে ব্যাংকটি গঠন করা হলেও তেমন কোনো অগ্রগতি নেই ব্যাংকটিতে। এমনকি যাত্রা শুরুর তিন মাস পার হলেও এখনো ব্যাংকটিতে ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নিয়োগ দিতে পারেনি সরকার। ব্যাংকটির গঠনকালে চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছিলেন সাবেক সচিব ড. মোহাম্মদ আইয়ুব মিয়া। কিন্তু সম্প্রতি ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে তিনিও পদত্যাগ করেছেন। ফলে বর্তমানে ব্যাংকটি এমডি ও চেয়ারম্যানশূন্য।
মূলত পাঁচ ব্যাংকে নিয়োজিত প্রশাসকদের মাধ্যমেই চলছে ব্যাংকটির কার্যক্রম। যদিও প্রশাসকদের কারোরই ইসলামি ব্যাংকিং পরিচালনার অভিজ্ঞতা নেই বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, ব্যাংকটিতে বর্তমানে রুটিন কিছু কাজ হলেও গ্রাহক ও ব্যবসাবান্ধব কোনো কার্যক্রম হচ্ছে না। সব মিলিয়ে বর্তমানে ব্যাংকটিতে একধরনের স্থবিরতা চলছে।
এদিকে আমানতকারীদের আস্থা বাড়াতে ব্যাংকটি গঠন করা হলেও বর্তমানে ব্যাংকটি চরম আস্থার সংকটে পড়েছে। যার প্রভাব পড়েছে পুরো ব্যাংকিং খাতে। এ ছাড়া ‘হেয়ারকাট’ পদ্ধতির মাধ্যমে এসব ব্যাংকের আমানতকারীদের ২০২৪ ও ২০২৫ সালের মুনাফা না দেওয়ার ঘোষণা এবং পরে আমানতকারীদের আন্দোলনের মুখে ৪ শতাংশ হারে মুনাফা দেওয়ার ঘোষণায় তাদের মধ্যে একধরনের হতাশা কাজ করছে। শুধু তা-ই নয়, মেয়াদ শেষ হলেও আমানতকারীদের আমানত ফেরত দেওয়া হচ্ছে না। আমানতের সুরক্ষা হিসেবে যে ২ লাখ টাকা করে দেওয়ার কথা রয়েছে, সেটিও সব গ্রাহককে দিতে পারছে না। ফলে ব্যাংকটির প্রতি গ্রাহকের আস্থা তলানিতে নেমে গেছে।
জানা গেছে, হেয়ারকাট নিয়ে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের প্রায় ৭৬ লাখ আমানতকারী অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন। কারণ বাংলাদেশ ব্যাংক এখনো বিনিয়োগ মুনাফার ওপর আরোপিত বিতর্কিত ‘হেয়ারকাট’ (লাভ কমিয়ে দেওয়া) প্রত্যাহারের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত প্রশাসকরাও বারবার নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে অনুরোধ করেছেন মুনাফা কমানোর এই সিদ্ধান্ত বাতিল করতে। তাদের মতে, পূর্ণ মুনাফা হার পুনর্বহাল না করলে আমানতকারীদের আস্থা ফিরে পাওয়া সম্ভব হবে না, যা ব্যাংকটির ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য অত্যন্ত জরুরি। এই সংকট বহু ব্যক্তিগত আমানতকারীকে প্রভাবিত করেছে, বিশেষ করে পেনশনভোগীদের, যারা জীবিকার জন্য এই মুনাফার ওপর নির্ভর করেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘হেয়ারকাট’ প্রত্যাহার নিয়ে আলোচনা চলছে, তবে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। তিনি বলেন, আগামী ১৫ দিনের মধ্যেই সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও এমডি নিয়োগ দেওয়া হবে।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, এখন পর্যন্ত ‘হেয়ারকাট’বিষয়ক নীতিতে কোনো পরিবর্তন হয়নি। তবে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে।
ক্ষতিগ্রস্ত আমানতকারীরা এই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করেছেন। তারা বলছেন, মূল টাকা ফেরত পাওয়ার জন্য তারা অপেক্ষা করতে পারেন, কিন্তু অর্জিত মুনাফা কমিয়ে দেওয়া তারা মেনে নেবেন না। ব্যাংক খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, ‘হেয়ারকাট’ বাতিল করা হলে প্রতিষ্ঠানটি তিন-চার মাসের মধ্যে স্থিতিশীল হতে পারে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ভুক্তভোগী ব্যাংক আমানতকারী অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যসচিব আলিফ রেজা বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংক অযৌক্তিকভাবে হেয়ারকাটের মাধ্যমে আমানতকারীদের পুরো মুনাফা প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত করার উদ্যোগ নিয়েছে, যা আমরা কোনোভাবেই মেনে নেব না। এই লক্ষ্যে গতকাল আমরা গভর্নর বরাবর একটি স্মারকলিপি দিয়েছি। সেখানে হেয়ারকাট পদ্ধতি বাতিল করে পুরো মুনাফা দেওয়া এবং ব্যাংকের সব ধরনের স্বাভাবিক কার্যক্রম চালু করার দাবি জানিয়েছি।’ দাবি মানা না হলে আগামী ৭ এপ্রিল বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে মানববন্ধনসহ আমরণ অনশন কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেন তিনি।
ভুক্তভোগী আমানতকারীদের পক্ষ থেকে গভর্নর বরাবর দেওয়া স্মারকলিপিতে বলা হয়েছে, ‘গত ২১ জানুয়ারি জারীকৃত অমানবিক সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবিতে আমরা নিয়মিত আন্দোলন করে আসছি। কিন্তু এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে কোনো সিদ্ধান্ত না পাওয়ায় আমরা অসহায় আমানতকারীরা হতাশ ও বিপর্যস্ত হয়ে আজ চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিনাতিপাত করছি। সে লক্ষ্যেই আমরা আগামী ৭ এপ্রিল আমানতকারীদের একটি প্রতিনিধিদল আপনার সঙ্গে আলোচনায় বসতে চাই। আমরা দৃড়ভাবে বিশ্বাস করি, সাবেক গভর্নরের নির্দেশিত এই কালো রেজল্যুশনটি বাতিল করলে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের প্রতি সব গ্রাহকের আস্থা পুনরায় ফিরে আসবে।’
সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের ভুক্তভোগী গ্রাহক মো. আরিফউদ্দিন খান বলেন, ‘গুরুতর অসুস্থ হওয়ায় ব্যাংক থেকে প্রথম ধাপে ২ লাখ টাকা তুলতে পেরেছি। যদিও ব্যাংকে আমার সাড়ে ৪ লাখ টাকা জমা রয়েছে। আর আমার অপারেশনে খরচ হয়েছে প্রায় ৫ লাখ টাকা। বাকি টাকা ধার করে চিকিৎসা ব্যয় মিটিয়েছি। কিন্তু এখন পাওনাদারের টাকা পরিশোধ করতে পারছি না। ব্যাংক তিন মাস পর বাকি টাকা দেওয়ার আশ্বাস দিলেও এখন দিচ্ছে না। বলছে, পরবর্তী ধাপের টাকা দিতে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে এখনো অনুমোদন পাওয়া যায়নি।’ তিনি বলেন, ‘নিজের টাকা ব্যাংকে থাকার পরও পাওনাদারের যন্ত্রণায় আমি আরও অসুস্থ হয়ে যাচ্ছি। আমরা তো বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বীকৃত ব্যাংকেই টাকা রেখেছিলাম। তাহলে এখন কেন বাংলাদেশ ব্যাংক দায়িত্ব নিচ্ছে না। কেন লুটপাটকারীদের দায় আমাদের মতো সাধারণ গ্রাহকদের ওপর দেওয়া হচ্ছে’–তাও জানতে চান তিনি।
এমন বাস্তবতায় গতকাল সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের উদ্যোক্তা পরিচালকরা একীভূত না করে স্বতন্ত্রভাবে ব্যাংকটি পরিচালনার দাবি জানান। তারা বলেন, গত দেড় বছরে যারা সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছেন, তাদের কর্মকাণ্ডে ব্যাংকটি আরও সংকটে পড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্তে শেয়ার শূন্যে নামিয়ে শেয়ারহোল্ডারদের ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে। সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদেরও ক্ষতির মুখে ফেলে দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, এ পরিস্থিতিতে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংককে মার্জার প্রক্রিয়া থেকে অব্যাহতি দেওয়ার জন্য সরকারের কাছে সুপারিশ করা হয়েছে। প্রকৃত উদ্যোক্তাদের হাতে দায়িত্ব ফিরিয়ে দিলে তারা ব্যাংকটিকে পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করতে পারতেন। কিন্তু বর্তমান প্রশাসন আমানতকারী ও ব্যবসায়ীদের যথাযথ সহযোগিতা করছে না। এ সময় ব্যাংক রেগুলেশন অ্যাক্ট, ২০২৫ পাস না করারও আহ্বান জানান তারা। অন্যদিকে শুরু থেকেই একীভূতকরণে রাজি ছিল না তুলনামূলক ভালো অবস্থানে থাকা এক্সিম ব্যাংকও।
জানা গেছে, একীভূতকরণের শুরুতে পাঁচ ব্যাংকের অ্যাসেট কোয়ালিটি রিভিউ (AQR) করানো হয়েছিল কেপিএমজি এবং আর্নেস্ট অ্যান্ড ইয়ং নামক দুটি প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে। সে সময় বিতর্কিত কেপিএমজি নিয়ে আপত্তি উঠলেও এখন নতুন করে আবারও পাঁচ ব্যাংকের দায়-দেনার মান যাচাই করছে একই প্রতিষ্ঠান। যার জন্য ব্যাংকগুলোকে ৫ কোটি টাকা করে পরিশোধ করতে হবে। উল্লেখ্য, সে সময়ের একিউআর রিপোর্ট এখন পর্যন্ত প্রকাশ করেনি বাংলাদেশ ব্যাংক।
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত 2019 - 2026 PassengerVoice | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Developed By Muktodhara Technology Limited.
পাবলিক মতামত