চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে চালকদের ভুল ধারণায় ঝরছে প্রাণ

Passenger Voice    |    ০১:০৪ পিএম, ২০২৬-০৩-৩০


চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে চালকদের ভুল ধারণায় ঝরছে প্রাণ

চালকদের একটি ভুল ধারণা চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ককে বিপজ্জনক করে তুলছে। অধিকাংশ চালকের ধারণা, অন্য বাসের আগে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারলে যাত্রীদের কাছে সেই বাসের গুরুত্ব বাড়বে। এই ধারণা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে তারা বেপরোয়া ওভারটেকিংয়ের পাশাপাশি গতির সীমা লঙ্ঘন করছেন। যে কারণে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বাসগুলো খাদে পড়ে যাচ্ছে কিংবা মুখোমুখি সংঘর্ষের শিকার হচ্ছে। এ মহাসড়কে চলাচলকারী একাধিক যাত্রী এবং চালকের সঙ্গে আলাপকালে এ তথ্য উঠে এসেছে।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দুর্ঘটনার অনেকগুলো কারণের মধ্যে অসুস্থ প্রতিযোগিতায় সামনের বাসকে যেকোনো মূল্যে ওভারটেক করার জেদ অন্যতম। এ সড়কে চলাচলকারী অধিকাংশ বাস আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্পন্ন। যে কারণে চালকরা অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসে গাড়ি চালান এবং অনেক সময় গতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হন। যে কারণে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক এখন এক আতঙ্কের জনপদে পরিণত হয়েছে। দক্ষিণ চট্টগ্রামের লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত এই সড়কটি বর্তমানে যেন এক উন্মুক্ত মরণফাঁদ। প্রশস্ততার অভাব, বেপরোয়া গতি আর ফিটনেসবিহীন যানবাহন এবং ধীরগতির যানবাহনের উৎপাতে প্রতিনিয়ত ঝরছে তাজা প্রাণ। সর্বশেষ গত ২৬ মার্চ চকরিয়ার বানিয়ারছড়া এলাকায় পর্যটকবাহী বাসের ধাক্কায় দুজন পর্যটক নিহতের ঘটনা ঘটে।

নিরাপদ সড়ক চাই বাংলাদেশ-এর কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ও চট্টগ্রামের সাধারণ সম্পাদক শফিক আহমদ সাজিব বলেন, চলতি বছরের শুরু থেকে ঈদ পর্যন্ত চট্টগ্রাম কক্সবাজার মহাসড়কে অর্ধশতাধিক দুর্ঘটনায় ২৬টি তাজা প্রাণ ঝরেছে। এর প্রধান কারণ হলো চালকদের একটি ভুল ধারণা। তারা মনে করেন, ওভারটেক করে আগে পৌঁছানো সম্মানের। অবশ্য বাস মালিকরা বছর শেষে বেশি ট্রিপ মারা চালককে পুরস্কৃত করেন। সেটি বন্ধ করার জন্য আমরা অনেক বলেছি। 

চিরিংগা হাইওয়ে থানা পুলিশের ইনচার্জ মোহাম্মদ আরিফুল আমিন বলেন, চকরিয়া (চিরিংগা) হাইওয়ে থানার দায়িত্বাধীন এলাকা চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের লোহাগাড়া উপজেলার আধুনগর এলাকা থেকে শুরু করে চকরিয়া উপজেলার ফাঁসিয়াখালী (ভেন্ডিবাজার) পর্যন্ত অংশের ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের ২৭ মার্চ পর্যন্ত দুর্ঘটনা ৩৮টি দুর্ঘটনায় ১৭ জন নিহত এবং ৩২ জন আহত হয়েছে।

মালুমঘাট হাইওয়ে থানার ইনচার্জ মেহেদী হাসান বলেন, মালুমঘাট হাইওয়ে থানার আওতাধীন এলাকা চকরিয়ার দক্ষিণাঞ্চল ফাঁসিয়াখালী (ভেন্ডিবাজার এলাকা) থেকে শুরু করে রামু উপজেলার সীমানা সংলগ্ন খুটাখালী (নতুন অফিস এলাকা) পর্যন্ত অংশে ২৫ সালে দুর্ঘটনায় ২২ জন নিহত হয়েছে। ২৬ সালে নিহত হয়েছে দুজন।

হাইওয়ে পুলিশের চকরিয়া ও দোহাজারী ফাঁড়ির কর্মকর্তারা জানান, দুর্ঘটনা রোধে তারা নিয়মিত গতি পরিমাপক যন্ত্র ব্যবহার করছেন এবং মামলা দিচ্ছেন। তবে চালকদের অসচেতনতা ও সরু রাস্তার কারণে দুর্ঘটনা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। তারা জানান, চকরিয়ার মহাসড়কের পাশে প্রায় ৪২টি ছোট রাস্তা রয়েছে। এই রাস্তা থেকে তিন চাকার যানবাহনগুলো সরাসরি মহাসড়কে প্রবেশ করে। এতে মহাসড়কে চলাচলরত দূরপাল্লার যানবাহনগুলো অনেক সময় বিপাকে পড়ে। চালকরা গাড়ি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়।

সংশ্লিষ্টদের মতে, সড়কটির যানবাহন ধারণক্ষমতা ১২ থেকে ১৫ হাজার হলেও চলাচল করে দ্বিগুণেরও বেশি। বিশেষ করে ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে মোটরসাইকেলে করে বিভিন্ন পর্যটক কক্সবাজার উদ্দেশে যখন যাত্রা করে। তখন তারা দীর্ঘক্ষণ গাড়ি চালানোর কারণে একসময় ক্লান্ত হয়ে দুর্ঘটনার শিকার হন। এছাড়া এই মহাসড়কে নম্বর প্লেটবিহীন অবৈধ ডাম্প ট্রাকের বেপরোয়া গতিও দুর্ঘটনার একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ।

কুতুবদিয়ার বাসিন্দা চট্টগ্রাম শহরের ব্যবসায়ী তানভীর মাহমুদ জানান, এক সময় মহাসড়কে তিন চাকার গাড়ি চলা বন্ধ ছিল। ৫ আগস্টের পর এই মহাসড়কে তিন চাকার গাড়ি চাপ বেশ লক্ষণীয়। যার কারণে কক্সবাজারমুখী ওর চট্টগ্রামমুখী দূরপাল্লার বাসগুলো যখন দ্রুত গতিতে একটি আরেকটি ওভারটেক করতে গিয়ে ধীরগতি তিন চাকার গাড়িগুলো দুর্ঘটনার শিকার হয়। সড়কের আরেক আপদ ত্রিপলবিহীন লবণের ট্রাক। লবণবাহী ট্রাক থেকে পানি সড়কে পড়ে পিচ্ছিল হয়ে যায়। এতে হালকা যানবাহনগুলো সহজেই দুর্ঘটনার শিকার হয়। বিশেষ করে মোটরসাইকেল লবণপানিতে ভেজা মহাসড়কে ব্রেক করলে কিংবা বেশি গতিতে চালালে নিশ্চিতভাবে দুর্ঘটনার শিকার হয়।

কক্সবাজারের সচেতন নাগরিক সমাজ ও নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) আন্দোলনের কর্মী মিহরাজ রায়হান বলেন, পর্যটন নগরীর সঙ্গে যোগাযোগের এ প্রধান সড়কটি দ্রুত চার লেনে উন্নীত করা এখন সময়ের দাবি। পাশাপাশি ফিটনেসবিহীন গাড়ি বন্ধ এবং হাইওয়ে পুলিশের কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা না গেলে এই লাশের মিছিল থামানো সম্ভব হবে না। তাছাড়া চালকদের পেশাদারত্ব নিশ্চিতকরণ, যত্রতত্র ওভারটেকিং প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি।

চট্টগ্রাম কক্সবাজার মিনি বাস মালেক সমিতির সহসভাপতি আনোয়ার হোসেন বলেন, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে চলাচলকারী দূরপাল্লার যানবাহনগুলোর জন্য মূর্তিমান আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে সংযোগ সড়ক (বাই রোড) থেকে হঠাৎ মূল সড়কে উঠে আসা ছোট যানবাহনগুলো। বিশেষ করে টমটম, অটোরিকশা (সিএনজি) ও মোটরসাইকেলের বেপরোয়া গতির কারণে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার ঝুঁকিতে পড়ছে বড় যাত্রীবাহী বাস ও পণ্যবাহী ট্রাক।

মহাসড়কে নিয়মিত চলাচলকারী হানিফ পরিবহনের চালক মো. মামুন জানান, সংযোগ সড়কগুলো থেকে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে তিন চাকা ও দুই চাকার গাড়িগুলো মূল সড়কে উঠে আসে। তিনি বলেন, আমরা যখন মহাসড়কে গাড়ি নিয়ে (রানিংয়ে) থাকি, তখন হঠাৎ করে এসব ছোট যান সামনে চলে আসলে গাড়ি নিয়ন্ত্রণ করা আমাদের জন্য অত্যন্ত কষ্টকর হয়ে পড়ে। ওভারটেকিং প্রতিযোগিতার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, যে কেউ নিজ গন্তব্যে আগে পৌঁছাতে চাইবে। এটাই বাস্তবতা। তবে এক্ষেত্রে প্রত্যেক চালককে নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব দিতে হবে।

সড়ক ও জনপথ বিভাগ কক্সবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী রোকন উদ্দিন খালেদ চৌধুরী বলেন, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের আধুনিকায়ন ও যাতায়াত নির্বিঘ্ন করতে বড় ধরনের উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। বর্তমানে এই মহাসড়কের প্রশস্ততা ৬.৮ মিটার থাকলেও, একে ১০ মিটারে উন্নীত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পটিয়া, লোহাগাড়া, চকরিয়া এবং কেরানিহাট–এ চারটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে বাইপাস সড়ক নির্মাণ করা হবে। এর মধ্যে কেরানিহাটে একটি অত্যাধুনিক ফ্লাইওভার নির্মাণের প্রকল্প ইতোমধ্যে অনুমোদন হয়েছে। ‘চট্টগ্রাম হাইওয়ে কক্সবাজার ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেক্ট’-এর অধীনে এই কাজ হবে।

তিনি জানান, পটিয়ার ওয়াই ক্রসিং থেকে কেরানিহাট পর্যন্ত সড়ক ইতোমধ্যে ১০ মিটার প্রশস্ত করা হয়েছে। চলতি অর্থবছরে কেরানিহাট থেকে দোহাজারী (দাঙ্গালিয়া) পর্যন্ত ১২ কিলোমিটার সড়ক ১০ মিটার প্রশস্ত করার জন্য বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। আগামী অর্থবছরে পুরো কক্সবাজার পর্যন্ত সড়কটি ১০ মিটার প্রশস্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি জানান, পটিয়ার ওয়াই ক্রসিং থেকে জিদ্যা বাজার হয়ে চকরিয়ার এক আলি পর্যন্ত একটি বিশেষ উন্নয়ন পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া ফাঁসিয়াখালী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত আরেকটি সড়ক উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। এসব প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। এই মেগা প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে পর্যটন নগরী কক্সবাজারের সঙ্গে চট্টগ্রামের যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও দ্রুত ও নিরাপদ হবে।

ঝুঁকিপূর্ণ বাঁকে বিআরটিএর লাল পতাকা লাগানো প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তারা এ কাজটি সারা দেশে করেছে। তবে চট্টগ্রাম কক্সবাজার মহাসড়কে তাদের চিহ্নিত ৯টি ছাড়াও অনেকগুলো ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক রয়েছে। এই মহাসড়কে অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার দুর্ঘটনার সংখ্যা কিছুটা কমেছে বলে তিনি দাবি করেন।