শিরোনাম
Passenger Voice | ১১:৪৫ এএম, ২০২৬-০৩-২৯
রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়ার ৩নং ফেরিঘাটে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যাত্রীবাহী বাস নদীতে পড়ে যাওয়ার ঘটনায় নারী,পুরুষ ও শিশুসহ ২৬ জন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় পৃথক দুইটি তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়েছে। তবে বাসচালক ও পরিবহন সংশ্লিষ্টরা বাস দুর্ঘটনার জন্য ঘাটের অব্যবস্থাপনাকেই দুষছেন।
এ দুর্ঘটনা নিয়ে একাধিক বাস চালক ও পরিবহন সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলেছে দেশীয় গণমাধ্যম ঢাকা পোস্টের এই প্রতিবেদক। চালক ও পরিবহন সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে ঘাটের অব্যবস্থাপনার বিষয়টি উঠে এসেছে।
চালকেরা বলছেন, ঘাটের পন্টুনে রেলিং বা ব্যারিকেড থাকলে বাসটি এভাবে নদীতে পড়ে যেত না। এছাড়া ঘাটের এ্যাপ্রোচ সড়ক ঢালু ও খাড়া। যার কারণে গাড়ি ওঠানামা করতেও চালকদের বেগ পেতে হয়।
দৌলতদিয়া ৩ নম্বর ফেরিঘাটের সামনে ফেরিতে ওঠার জন্য সিরিয়ালে দাঁড়িয়ে ছিল ঢাকাগামী গোল্ডেন লাইন পরিবহন। এসময় এই পরিবহনের চালক সাহেব আলীর সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, দুর্ঘটনা কবলিত গাড়িটির হয়তো টায়ার রড নষ্ট হয়ে গিয়েছিল অথবা স্টিয়ারিং বক্স ফ্রি হয়ে গিয়েছিল। অর্থাৎ চালকের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল, চালক কোনো কাজ করতে পারেনি। গাড়িটি যখন পন্টুনে উঠেছিল তখন চালক চেষ্টা করেছিল হয়তো। কিন্তু চেষ্টা করলে হবে কি, যখন টায়ার রড চলে যাবে, তখন ড্রাইভারের ক্ষমতা নেই ঠেকানোর। অথবা স্টিয়ারিং বক্স যখন লক হয়ে গেলে কোনো চালকের পক্ষে গাড়ি ঠেকানো সম্ভব না। এসব কারণেই হয়ত সৌহার্দ্য পরিবহনে এমন দুর্ঘটনা ঘটেছে।
তিনি আরও বলেন, বাসটির ব্রেকের সমস্যা ছিল বলে মনে হয় না। আমার কাছে মনে হয় টায়ার রডের হুক ছুটে গিয়েছিল অথবা স্টিয়ারিং ফ্রি হয়ে গিয়েছিল। এ দুইটি জিনিসে যখন সমস্যা হয় তখন গাড়ি চালকের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। আল্লাহ যেন এভাবে কাউকে কোনো বিপদ না দেই।
মুক্তাগাছা-ময়মনসিংহ পরিবহনের চালক শৈলন। তিনি পরিবহন জগতে রয়েছেন প্রায় ৪০ বছরের বেশি। দৌলতদিয়া ঘাট এলাকায় বাস দুর্ঘটনা নিয়ে তার সাথে আলাপকালে তিনি বলেন, ফেরিঘাটেরই সমস্যা, বাসের কোনো সমস্যা ছিল না। সেদিন যে গাড়িটা পড়ল পন্টুনে যদি রেলিং বা বেড়া থাকতো তাহলে গাড়িটাও পড়তো না। খোলা ছিল বলেই গাড়িটা নিয়ন্ত্রণ করেত পারেনি চালক। সামনে রেলিং থাকলে গাড়িটি আটকে যেত। তাহলে এতগুলো লোকের ক্ষতি হতো না। সরকারেরও ক্ষতি, যার গেছে তারও ক্ষতি।
এই চালক আরও বলেন, পদ্মা সেতু চালু হওয়ার আগে থেকে আমরা এই রুটে গাড়ি চালাই। কিন্তু আজও এই ঘাটের উন্নতি হয়নি। সেই কষ্ট করেই আমরা চলাফেরা করছি। জানের নিরাপত্তা নেই। সেদিন মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে গেলো, সারাদেশের মানুষ দেখেছে। এই ঘাটের দিকে সরকারের নজর দেওয়া উচিত, কিন্তু তারা দেয় না। এখন নতুন সরকার আছে, তারা যদি কিছু করে তাহলে আমরা খুশি হব।
ঢাকাগামী দ্রুতি পরিবহনের চালক কামরুল ইসলাম টিপু বলেন, সৌহার্দ্য পরিবহন বাসটি ৩নং ফেরিঘাটে এসে রানিং ফেরি মিস করে অন্য ফেরির জন্য পন্টুনে অপেক্ষা করছিল। যখন ছোট একটি ফেরি পন্টুনে ভিড়ে তখন সৌহার্দ্য পরিবহনের বাসের চালকের ক্লাচে পা লেগেছিল। এজন্য হয়তো স্টিয়ারিং লক হয়ে গিয়েছল, চালক নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। তখন গাড়ি সোজা নেমে চলে গেছে পানিতে। কোনো চালকই চায় না সে দুর্ঘটনার কবলে পড়ুক।
রয়েল এক্সপ্রেসের চালক কামাল হোসেন বলেন, ফেরির পন্টুনে যদি রেলিং বা ব্যারিকেড দেওয়া থাকতো তাহলে এত বড় দুর্ঘটনা ঘটতো না। এখানে পন্টুনের পুরো মুখ খালি ছিল বলে গাড়ি সহজেই পড়ে গেছে। তাই আমাদের দাবি ফেরির পন্টুনে লোহার রেলিং বা ব্যারিকেড দেওয়া হোক। যাতে করে কোন গাড়ি ব্রেক ফেল বা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেললেও রেলিংয়ে গিয়ে ঠেকে যায়।
এসডি পরিবহনের চালক রিয়াজুল ইসলাম বলেন, দৌলতদিয়া ঘাটের পন্টুন ও এপ্রোচ সড়কের সমস্যা দীর্ঘদিনের। পন্টুনের ওপর যে বিট গুলো তাকে ওই বিটগুলোও নেই, লেভেল হয়ে গেছে। অনেক সময় ব্রেক ধরলেই চাকা স্লিপ কেটে যায়। এজন্য অবশ্যই পন্টুনে রেলিং থাকা উচিত। রেলিং থাকলে গাড়ি ব্রেক ফেল করলেও রেলিং এ আটকে যাবে। সাইডে রেলিং হাই থাকলে গাড়ি পানিতে যাবে না।
টোটন খান নামের বাসের এক সুপারভাইজার বলেন, ঘাটগুলোতে সংস্কার প্রয়োজন এবং পন্টুনে লোহার রেলিং থাকা উচিত। আমার দীর্ঘদিনের কর্মজীবনে এই প্রথম এমন দুর্ঘটনা দেখলাম। ড্রাইভার কখনো চায় না এমন হোক। যতটুকু সম্ভব সে চেষ্টা করে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখার। আমরা সবসময় চেষ্টা করি যাত্রীদের নিরাপদে তার গন্তব্যে পৌঁছে দিতে। যাত্রীদের সেবা দেওয়ার জন্য আমরা সবসময় চেষ্টা করি।
সৌহার্দ্য পরিবহনের দৌলতদিয়া ঘাট তত্ত্বাবধায়ক মনির হোসেন বলেন, দৌলতদিয়া ফেরি ঘাটের জিরো পয়েন্টে অনেক সময় বিআইডব্লিউটিসির তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীরা দায়িত্বে থাকেন। ঘাটের পরিস্থিতি না বুঝেই অনেক সময় নদী পাড়ি দিতে আসা ঢাকামুখী গাড়িগুলোকে ফেরি ঘাটে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
তিনি আরও বলেন, গত বুধবার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা সৌহার্দ্য পরিবহনের বাসটিকেও ৩ নম্বর ঘাটে পাঠিয়ে দেন। ঘাটে এসে তারা দেখেন, একটি ফেরি যানবাহন নিয়ে চলা শুরু করেছে। উপায় না পেয়ে পন্টুনের মাথায় সংযোগ সড়কে বাসটি পরের ফেরির জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। কিছুক্ষণ পর আরেকটি ছোট ফেরি এসে পন্টুনে ধাক্কা দিয়ে ভেড়ে। সংযোগ সড়ক ঢালু সড়ক হওয়ায় এবং পন্টুনের ধাক্কা খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চালক নিয়ন্ত্রণ করতে পারেননি। সরাসরি পন্টুন থেকে নদীতে পড়ে যায় বাসটি।
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত 2019 - 2026 PassengerVoice | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Developed By Muktodhara Technology Limited.
পাবলিক মতামত