শিরোনাম
Passenger Voice | ১০:৩৫ এএম, ২০২৬-০৩-২৯
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেছিলেন, ‘ডিপোগুলোতে পর্যাপ্ত তেল আছে। সরবরাহও কমায়নি।’ তার পরও রাজধানীসহ সারা দেশের অধিকাংশ ফিলিং স্টেশনে জ্বালানি তেল পেতে চালকদের লাইন দিন দিন বড় হচ্ছে। অনেক ফিলিং স্টেশনে সারা রাত জেগেও তেল পাচ্ছেন না চালকরা। ঈদুল ফিতরের পর এই চিত্র ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।
এ অবস্থায় গতকাল শনিবার তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে, দেশে জ্বালানি তেলের মজুত ও সরবরাহ সম্পূর্ণ স্বাভাবিক রয়েছে। জ্বালানি ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম তদারকি ও সমন্বয়ের লক্ষ্যে দেশের সব পেট্রলপাম্পে ট্যাগ অফিসার নিয়োগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়। মজুতদারি ঠেকাতে ৯ জেলার ১৯ ডিপোতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) মোতায়েন করা হয়েছে। তেলের মজুত ঠেকাতে কঠোর হওয়ার নির্দেশ নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ডিপো থেকে তেল সরবরাহের সময় পরিবর্তন করা হয়েছে।
ঈদুল ফিতরের দীর্ঘ ছুটির পর রাজধানী ঢাকায় মানুষের যাতায়াতের জন্য মোটরসাইকেল, প্রাইভেট গাড়ি ও গণপরিবহনের চাপ বাড়ছে। জ্বালানি তেল পেতে বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে ছুটছেন চালকরা। কিন্তু ডিপো থেকে চাহিদামতো তেল না দেওয়ায় বেশির ভাগ ফিলিং স্টেশন বন্ধ থাকছে। এসব পাম্পে চালকের দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। অনেকে তেল না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন। শুধু রাজধানীর নয়, বিভিন্ন জেলায় এই দৃশ্য দেখায় বলে জানান আমাদের ব্যুরো ও প্রতিনিধিরা।
রাজধানীর মোহাম্মদপুরের আসাদগেটে তালুকদার ফিলিং স্টেশনে দেখা যায়, তেল বিক্রি বন্ধ। রশি দিয়ে সীমানা ঘেরা। ভেতরে কয়েকটা প্রাইভেট কার। এদিকে চন্দ্রিমা উদ্যান পর্যন্ত গাড়ির লাইনে দেখা যায়। আর বন্ধ পাম্পের ভেতরে বসে অলস সময় পার করছেন প্রতিষ্ঠানটির কর্মীরা।
পাম্প বন্ধ থাকার কারণ জানতে চাইলে ক্যাশিয়ার ফাত্তাহ আজিজ বলেন, ডিপো থেকে তেল পাওয়ামাত্র চালকদের দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু শেষ হয়ে গেলেই পাম্প বন্ধ থাকছে। চালকদের অপেক্ষা করতে হচ্ছে।’
এ সময় মো. আসিফ নামের এক মোটরসাইকেল চালক বলেন, ‘বেলা সাড়ে ১১টায় এই পাম্পে তেল নিতে লাইনে দাঁড়িয়েছি। ৩টা বাজতে যাচ্ছে। কোনো খরব নেই। কখন পাব তাও জানি না। কারণ পাম্প থেকে ২টার সময় বলেছিল ৩টায় গাড়ি আসবে। কিন্তু এখনো আসেনি।’ অন্য চালকরাও একই ভোগান্তির কথা জানান।
এই চিত্র শুধু এই ফিলিং স্টেশনই না, রাজধানীর খিলক্ষেতের মেঘনা, মহাখালী, মিরপুর-২ নম্বর সেকশনের স্যাম অ্যাসোসিয়েটস, কল্যাণপুরের কমফোর্ট ফিলিং স্টেশন, খালেক ফিলিং স্টেশন, শ্যামলীর মেসার্স সাহিল ফিলিং স্টেশন, পরিবাগের পূর্বাচল ফিলিং স্টেশনসহ অনেক ফিলিং স্টেশনে তেল বিক্রি বন্ধ দেখা গেছে। এসব পাম্পের প্রবেশমুখে বাঁশ বা রশি দিয়ে আটকে রাখা হয়েছে।
এসব ফিলিং স্টেশনের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ছুটির দিনে ডিপো বন্ধ। আমরা কীভাবে তেল পাব। এ জন্যই পাম্প বন্ধ থাকছে।
তবে আসাদগেটের সোনার বাংলা ফিলিং স্টেশনে দেখা যায় ভিন্ন দৃশ্য। এখানে মোটরসাইকেল ও প্রাইভেট গাড়ির চালকদের চাহিদামতো জ্বালানি তেল দেওয়া হচ্ছে।
মোটরবাইক চালক মো. আবদুল হাকিম বলেন, ‘এখন বাজে সাড়ে ৩টা। এই পাম্পে তেল নিতে ১টায় মিরপুর সড়কে লাইনে দাঁড়িয়েছিলাম। চারদিক ঘুরে দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষা করার পর ট্যাংক ভরে তেল পেলাম। ভোগান্তি কাকে বলে বোঝেন।’
প্রাইভেট কারচালক সুমন বলেন, ‘অনেক অপেক্ষার পর ৩৫ লিটার তেল পেলাম। কিন্তু এই তেল পেতে ঘণ্টাখানেক অপেক্ষা করতে হয়েছে।’
অন্য চালকরাও তেল পেতে একই ভোগান্তির তথ্য জানান। তারা জানান, অধিকাংশ ফিলিং স্টেশন বন্ধ। তাই এখানে লম্বা লাইন। এর অবসান হওয়া দরকার।
এই ফিলিং স্টেশনের ম্যানেজার সজীব সরকার শংকর খবরের কাগজকে বলেন, ‘যতক্ষণ তেল থাকছে সবাইকে দেওয়া হচ্ছে। যে যার মতো নিচ্ছেন। কিন্তু শেষ হলেই পাম্প বন্ধ রাখতে হচ্ছে। তখনই সমস্যা হচ্ছে।’
জ্বালানি তেল মজুত রোধে বিজিবি মোতায়েন
জ্বালানি তেলসংকট ও সারা দেশে মজুতদারি ঠেকাতে দেশের ৯ জেলার ১৯টি ডিপোতে বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। গতকাল বিজিবির সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে দেশে ১৯টি তেলের ডিপোতে বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে।
অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার রয়েছে। অবৈধ জ্বালানি মজুত ও বিক্রি প্রতিরোধ এবং নাশকতা ঠেকাতে ডিপো কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে তাৎক্ষণিক ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া সীমান্ত দিয়ে জ্বালানি তেল পাচার ঠেকাতে অতিরিক্ত টহল, নৌ টহল, চেকপোস্টে তল্লাশি এবং সীমান্তবর্তী এলাকায় গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।
সব পেট্রল পাম্পে ট্যাগ অফিসার নিয়োগ
জ্বালানি ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম তদারকি ও সমন্বয়ের লক্ষ্যে দেশে সব পেট্রল পাম্পে ট্যাগ অফিসার নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়। গত শুক্রবার জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অনলাইন সভায় এ সিদ্ধান্ত হয়। গতকাল এক বার্তায় মন্ত্রণালয় এসব তথ্য জানায়।
সিদ্ধান্তে বলা হয়, দেশের সব পেট্রল পাম্পের জন্য একজন ট্যাগ অফিসার নিয়োগ করতে হবে। ঢাকা ও চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন এলাকায় বিপিসি ট্যাগ অফিসার নিয়োগ করবে। ঢাকা ও চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন এলাকা ব্যতীত জেলা ও বিভাগীয় শহরে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসক ও উপজেলা পর্যায়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা তাদের অধিক্ষেত্রাধীন প্রতিটি পেট্রল পাম্পের জন্য একজন সরকারি কর্মকর্তাকে ট্যাগ অফিসার হিসেবে নিয়োগ করবেন। ট্যাগ অফিসাররা জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ/বিপিসি নির্ধারিত পদ্ধতিতে কাজ করবেন ও দৈনিক প্রতিবেদন দেবেন।
প্রতিটি পেট্রল পাম্পের জন্য একজন সরকারি কর্মকর্তাকে ট্যাগ অফিসার হিসেবে নিয়োগ দিয়ে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগে তথ্য পাঠানোর জন্য সংশ্লিষ্ট সব দপ্তর ও সংস্থাকে অনুরোধ করা হয়েছে।
ডিপো থেকে তেল সরবরাহে নতুন সময় নির্ধারণ
দেশের ফিলিং স্টেশন ও পাম্পগুলোতে জ্বালানি তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে ডিপো থেকে তেল খালাসের সময়সূচি পরিবর্তন করেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। নতুন সময়সূচি অনুযায়ী, এখন থেকে প্রধান স্থাপনা ও ডিপোগুলো থেকে জ্বালানি পণ্য সরবরাহ কার্যক্রম প্রতিদিন সকাল ৭টায় শুরু হয়ে শেষ হবে বেলা ৩টায়। গতকাল বিপিসির সচিব শাহিনা সুলতানা স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ সময়সূচির কথা জানানো হয়।
সারা দেশে জ্বালানি তেলের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ বজায় রাখতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।
খুলনায় বেশির ভাগ সময় যায় তেল সংগ্রহে
খুলনা প্রতিনিধি জানান, জ্বালানি তেলের জন্য খুলনার ফিলিং স্টেশনগুলোতে সকাল থেকেই যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা যায়। বিকেল হলেও চালকদের ভিড় কমে না। গতকাল সারা দিন জ্বালানি তেল না থাকায় খুলনার পাওয়ার হাউস মোড়ে মেঘনা পেট্রোলিয়াম ফিলিং স্টেশন বন্ধ থাকতে দেখা যায়। বাঁশ দিয়ে ফিলিং স্টেশনের প্রবেশপথ আটকে দেওয়া হয়।
হাউস মোড়ে কেসিসি পেট্রোলিয়াম ফিলিং স্টেশনে গতকাল দুপুর ১২টা থেকে তেল বিক্রি শুরু হয়। জ্বালানি তেলের জন্য যানবাহনচালকদের দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করেও চাহিদামতো তেল না পাওয়ায় অসেন্তাষ প্রকাশ করতে দেখা যায়। প্রতিটি মোটরসাইকেলে ২০০ থেকে ৩০০ টাকার, প্রাইভেট কার ও মাইক্রোবাসে ২ হাজার থেকে ৩ হাজার টাকার তেল দেওয়া হচ্ছে।
যানবাহনচালকরা অভিযোগ করেন, ৩-৪ ঘণ্টা অপেক্ষা করে যা তেল পাওয়া যায়, তা দিয়ে দুই দিনের বেশি চলে না।
ফিলিং স্টেশনের মালিকরা জানান, প্রতিদিন ডিপো থেকে রেশনিং পদ্ধতিতে চাহিদার অর্ধেক বা এক-তৃতীয়াংশ তেল দেওয়া হয়। ফলে অল্প সময়ের মধ্যে শেষ হয়ে যায়।
মেহেরপুরে তেল পেতে রাত থেকে অপেক্ষা
মেহেরপুর প্রতিনিধি জানান, প্রখর রোদে সড়কের পাশে দীর্ঘ লাইনে শত শত মোটরসাইকেলচালক অপেক্ষা করছেন। তীব্র গরম আর রোদে দাঁড়িয়ে থাকা বাইকাররা কখন তেল পাবেন তাও জানেন না। সীমাহীন কষ্ট ভোগ করছেন তারা। অনেকে রাত ৩টার সময় এসে অপেক্ষা করছেন ২০০ টাকার তেলের জন্য। প্রশাসনের কোনো নজরদারি না থাকায় মাঝে মাঝে উত্তেজনা তৈরি হচ্ছে লাইনের মধ্যে।
মোটরসাইকেলচালক শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘দীর্ঘ লাইন হবে বলে রাত ৪টার সময় এসেছি। তার পরও দেখি আমার আগে অনেকেই অপেক্ষা করছেন।’
বামন্দীর মেসার্স জামান ফিলিং স্টেশনের স্বত্বাধিকারী হামিদুর রশীদ মুন্না বলেন, ‘মাঠে গম, এ ছাড়া ঝড়-বৃষ্টির সময়। এ বিবেচনা করে চাষিদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তেল দিচ্ছি। কোনো ট্রাক এলে তেল দিচ্ছি না।’
মেহেরপুর জেলার এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট তাজওয়ার আকরাম শাখাপি ইবনে সাজ্জাদ বলেন, ‘তেল থাকা সত্ত্বেও সংকট তৈরি করলে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। অভিযোগ পেলেই তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
সাতক্ষীরায় চড়া দামে তেল বিক্রি
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি জানান, সাতক্ষীরার আশাশুনি সড়কের বুটহাটা মোড়ের মেসার্স ফুয়েল স্টেশনসংলগ্ন ফুটবলের ফাঁকা মাঠটি এখন আর মাঠ নেই। দেখলে মনে হয় যেন সেখানে মোটরসাইকেলের হাট বসেছে। গতকাল এ দৃশ্য দেখা যায়।
পাম্পগুলোতে পেট্রল ও অকটেনের এই তীব্র সংকটের সুযোগ নিচ্ছে একশ্রেণির অসাধু চক্র। পাম্পে তেল না থাকলেও সড়কের পাশের দোকানগুলোতে চড়া দামে মিলছে জ্বালানি তেল। চালকরা বাধ্য হয়ে বেশি টাকা দিয়ে এই তেল কিনছেন।
সাতক্ষীরার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) রিপন বিশ্বাস জানান, প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টার মধ্যে ফিলিং স্টেশন থেকে জ্বালানি তেল সংগ্রহ করতে হবে। তেল নেওয়ার সময় চালকদের অবশ্যই ড্রাইভিং লাইসেন্স, রেজিস্ট্রেশন ও ট্যাক্স টোকেন সঙ্গে রাখতে হবে। হেলমেট পরিধান বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। জেলা প্রশাসকের সিল ও স্বাক্ষরযুক্ত ‘ফুয়েল কার্ড’ থাকতে হবে।
উল্লেখ্য, গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হলে জ্বালানি তেল নিয়ে চালকদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা যায়। বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে তারা হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন। বাধ্য হয়ে বিপিসি তেল বিক্রিতে রেশনিং বা সীমা চালু করে। এরপর বিভিন্ন পাম্পে আরও ভিড় দেখা যায়। চালকদের ভোগান্তি কমাতে বাধ্য হয়ে সরকার রেশনিং প্রথা তুলে নেয়।
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত 2019 - 2026 PassengerVoice | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Developed By Muktodhara Technology Limited.
পাবলিক মতামত