শিরোনাম
বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন ডা. ইশরাত
Passenger Voice | ০২:৫০ পিএম, ২০২৬-০৩-২৬
‘আমার একটা মাত্র বাচ্চা, সোনার ছেলে আমার। আমার চাঁদের মতোন ছেলে। সেই ছেলে নাই হয়ে গেছে। আমার একমাত্র ভাইটাও চলে গেল। আমার মা টাকেও হারিয়ে ফেললাম।’ এভাবে কান্নাজড়িত কণ্ঠে আর্তনাদ করছে দৌলতদিয়ায় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বাস নদীতে তলিয়ে যাওয়ার ঘটনায় নিহত একই পরিবারের তিন সদস্যের স্বজন ডা. ইসরাত জাহান রুবা।
বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) সকাল সাড়ে ১০টায় পৌর শহরের ৭নং ওয়ার্ড ভবানীপুর লাল মিয়া সড়কে নিহতের বাড়িতে গিয়ে স্বজনদের আহাজারি দেখা যায়। স্বজনদের আহাজারিতে আকাশবাতাস ভারি হয়ে উঠছিল।
একই পরিবারের নিহত তিনজন হলেন, রাজবাড়ী পৌরসভার ভবানীপুর ৮নং ওয়ার্ড লালমিয়া সড়ক এলাকার মৃত মৃত ইসমাঈল হোসেন খানের স্ত্রী রেহেনা আক্তার (৬১), রেহেনা আক্তারের ছোট ছেলে আহনাফ তাহমিদ খান (২৫) ও রেহেনা আক্তারের নাতি রাজবাড়ী পৌরসভার ৫নং ওয়ার্ডের কেবিএম মুসাব্বির ও ডা. ইশরাত জাহান রুবার ছেলে তাজবীর (৭)। নিহত আহনাফ জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ শিক্ষার্থী ছিলেন।
নিহত আহনাফের বড় বোন ও তাজবীরের মা ডা. ইশরাত জাহান কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আমি কেমনে করে বাঁচব তোরে ছাড়া (তাজবীর), আমি কেন আগের দিন আমার বাচ্চাটারে নিয়ে গেলাম না, তাহলে আমার বাচ্চাটা বেঁচে যেত। আমার ছোট ভাইটাও চলে গেল।
তিনি বলেন, আমি ঢাকায় ছিলাম। আমার বাচ্চা আসতেছে এজন্য আমি বাসায় রান্না করছিলাম। আমি কিছুই জানতাম না। সন্ধ্যায় আমাকে গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে ফোন দেওয়া হয়। এর কিছুক্ষণ পর আমার বন্ধু আমাকে ফোন দিয়ে জানায় আমার মা আর নেই। আমার ছোট ভাই ও আমার বাচ্চার সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। পরে জানতে পারলাম আমার ছোট ভাই ও আমার একমাত্র সন্তানও মারা গেছে। সন্তানের লাশ রাতে শনাক্ত করেছিলাম, আর ছোট ভাইয়ের লাশ আজ সকালে পেয়েছি। আমার মায়ের লাশ রাতেই গোয়ালন্দ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পেয়েছিলাম।
একমাত্র সন্তান, ভাই ও মা কে হারিয়ে ইসরাত জাহান রুবা শোকে কাতর। তিনি বলেন, আমার একটা মাত্র ছেলে আর নেই, আমার একটা ভাই, আর কোনো ভাই নেই। আর কোনো সন্তান নেই। আমি যতটুকু টাইম চাকরিতে থাকি এরপর বাসায় এসে বাচ্চাকে সময় দেই। আমার বাচ্চাকে ছাড়া কেমন করে বাঁচব এখন আমি। আমার একটা মাত্র বাচ্চা, সোনার ছেলে আমার। আমার চাঁদের মতো ছেলে। সেই ছেলে নাই হয়ে গেছে।
তিনি সন্তান ও ভাইয়ের স্মৃতিচারণ করে বলেন, আমি ঈদের ছুটি শেষ করে যখন ঢাকা যাই তখন আমার ছেলে বলছিল মা সাবধানে যেও। আমি তখন বললাম রাতে কার কাছে ঘুমাবা তুমি, সে বলল মামার কাছে ঘুমাব। আমার ছেলের মামাও নেই, আমার ছেলেও নেই। দুজন মিলে নাই হয়ে গেছে আমার জীবন থেকে। আমার এত ভালো ভাই, আমাদের এত সুন্দর সংসার, আমরা দুই বোন ডাক্তার। কত সুখ শান্তি আমাদের পরিবারে, এক সেকেন্ডের মধ্যে সব কিছু শেষ হয়ে গেল। আমার সংসার ভেঙে ছাড়খার হয়ে গেল। আমার সব ছিল, এখন সব নাই হয়ে গেল। আমি এখন কি নিয়ে বাঁচব।
নিহত শিশু তাজবীরের চাচা আতাউল গণি মুক্তাদির বলেন, আমার ভাতিজারা ঢাকায় মিরপুরে থাকে। ওর বাবা মেরিন ইঞ্জিনিয়ার, বর্তমানে সে সুদানে রয়েছে। আমার ভাতিজার মা একজন চিকিৎসক। আনার তাজবীর ইংলিশ মিডিয়ামে প্লে শ্রেণিতে পড়ে। আমার ভাতিজা ঈদের ছুটিতে রাজবাড়ীতে এসেছিল দাদা বাড়ি ও নানা বাড়িতে ঈদ করতে। ঈদ শেষ করে গতকাল বিকেলে আমার ভাতিজা তার নানী, খালা ও মামার সঙ্গে ঢাকায় ফিরছিল। তাদের বাসটি দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নদীতে পড়ে যায়। এতে তাজবীরের খালা বেঁচে ফিরে এলেও বাকিরা মারা গেছে। আমার ভাতিজা আমাদের বংশের প্রদীপ ছিল। আমরা তাকে হারিয়ে ফেললাম।
এদিকে একমাত্র ছেলে, ভাই ও মা কে হারিয়ে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন ডা. ইশরাত জাহান রুবা ও ডা. নুসরাত জাহান। তারা মরদেহের পাশে এসে বারবার স্বজন হারানোর বেদনায় কান্না আহাজারি করছে।
উল্লেখ্য, গতকাল বুধবার বিকেল সোয়া ৫টার দিকে ঘাটের ৩নং পন্টুন থেকে কুষ্টিয়া থেকে ঢাকাগামী সৌহার্দ্য পরিবহনের ওই বাস ফেরিতে ওঠার সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নদীতে পড়ে যায়। এতে এখন পর্যন্ত মোট ২৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এখনো উদ্ধার অভিযান চলমান রয়েছে। নিহতদের পরিবারকে দাফনের জন্য জেলা প্রশাসন থেকে ২৫ হাজার টাকা ও আহতদের ১৫ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে।
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত 2019 - 2026 PassengerVoice | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Developed By Muktodhara Technology Limited.
পাবলিক মতামত