যে ওড়নায় ঢাকার কথা নববধূর লাজুক হাসি, সেই ওড়নাতেই নিথর দেহ

Passenger Voice    |    ১২:২৯ পিএম, ২০২৬-০৩-১৩


যে ওড়নায় ঢাকার কথা নববধূর লাজুক হাসি, সেই ওড়নাতেই নিথর দেহ

যেই লাল রঙা সোনালি পাড়ের ওড়নার আড়ালে লাজুক হাসিমাখা মুখ ঢাকার কথা ছিল নববধূর, সেই বিয়ের ওড়নাতেই পা থেকে মাথা পর্যন্ত ঢাকা তার দেহ। তার ওপর রাখা এক টুকরো সাদা কাপড়। যে চোখে ছিল নতুন সংসারের স্বপ্ন, সেই চোখ এখন চিরতরে বন্ধ। হাসপাতালের স্ট্রেচারে নিথর হয়ে পড়ে আছেন নববধূ। যে মুখে নতুন সংসারের গল্প শোনার অপেক্ষায় ছিলেন স্বজনেরা, সেই মুখকে ঘিরেই কান্না আর সব হারানোর আহাজারি।

গতকাল বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) থেকে এমনি হৃদয়বিদারক একটি ছবি ঘুরছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে। ছবিটি দেখে অনেকেই শোকাহত হচ্ছেন, কেউ কেউ আবেগাপ্লুত হয়ে লিখছেন- এক মুহূর্তের দুর্ঘটনা কীভাবে একটি পরিবারের সব স্বপ্ন কেড়ে নিতে পারে, তারই নির্মম উদাহরণ এই ঘটনা।

পরনের খয়েরি বেনারসি, গা ভরা গয়না, হাতে টুকটুকে লাল মেহেদি- সবই অক্ষত থাকলেও নেই শুধু নববধূর প্রাণ। বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার বেলাইব্রিজ এলাকায় খুলনা-মোংলা মহাসড়কে বৃহস্পতিবার বিকেলে এক সড়ক দুর্ঘটনায় বর-কনেসহ ১৪ জন নিহত হয়েছেন।

এই দুর্ঘটনায় দুই গ্রামজুড়ে এখন শুধুই আহাজারি। বিয়ের আনন্দ মুছে গিয়ে স্বজনদের চোখে নামেছে অশ্রুর ধারা। নিহতদের মধ্যে মোংলায় নেওয়া হয়েছে ৯ জনের মরদেহ, কয়রায় ৪ জনের এবং রামপালে রাখা হয়েছে মাইক্রোবাসচালকের মরদেহ। শেষ বিদায়ের অপেক্ষায় এখন দুই পরিবারের স্বজনরা।

জানা গেছে, গত বুধবার রাতে খুলনার কয়রা উপজেলার আমাদী ইউনিয়নের নাকসা গ্রামের বাসিন্দা আবদুস সালাম মোড়লের মেয়ে মার্জিয়া আক্তারের সঙ্গে বাগেরহাটের মোংলা উপজেলার শ্যালাবুনিয়া গ্রামের আবদুর রাজ্জাকের ছেলে আহাদুর রহমান সাব্বিরের বিয়ে হয়। বিয়ের অনুষ্ঠান শেষে বরপক্ষের সদস্যরা রাত কাটান কনের বাড়িতেই।

পরদিন সকালে নববধূকে নিয়ে মাইক্রোবাসে করে স্বামীর বাড়ি মোংলার উদ্দেশ্যে রওনা দেন তারা। কিন্তু পথিমধ্যে ঘটে যায় মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। খুলনা-মোংলা মহাসড়কের বেলাই ব্রিজ এলাকায় তাদের বহনকারী মাইক্রোবাসটির সঙ্গে নৌবাহিনীর একটি বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। মুহূর্তেই থেমে যায় আনন্দের যাত্রা।

দুর্ঘটনায় নিহতদের মধ্যে রয়েছেন বাগেরহাটের মোংলা পৌরসভার ৮নং ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি আব্দুর রাজ্জাকের ছেলে আহাদুর রহমান সাব্বির, তার নববধূ মার্জিয়া আক্তার মিতু, কনের বোন লামিয়া, নানি আনোয়ারা বেগম, দাদি রাশিদা বেগম, আব্দুল্লাহ, পুতুল, ঐশী, গাড়িচালক নাঈম শেখ, শিশু ইরাম, সামিউল ও আলিফ।

আজ শুক্রবার (১৩ মার্চ) দুই পরিবারে নিহতদের মরদেহ দাফনের প্রস্তুতি চলছে।

নিহত বরের ভাই জনি বলেন, আমার সব শেষ হয়ে গেছে। স্ত্রী, সন্তান, ভাই-বোন সবাইকে হারালাম। আমি একা হয়ে গেলাম। শোকাহত জনি বেশি কথাও বলতে পারছিলেন না।

প্রতিবেশী মো. জাহিদুল ইসলাম বলেন, মরদেহের গোসল সম্পন্ন হয়েছে। জুমার নামাজের পর তাদের দাফন করা হবে। বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম জানাজায় অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।

নিহত কনে মার্জিয়া আক্তার মিতুর মামা আবু তাহের বলেন, মার্জিয়ার শ্বশুরবাড়ি মোংলার শেলাবুনিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিল বরযাত্রীদের মাইক্রোবাসটি। বিকেল ৪টার পর রামপালের কাছাকাছি দুর্ঘটনা ঘটে। আমাদের সব শেষ হয়ে গেল।

কাটাখালি হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জাফর আহমেদ বলেন, পরিবারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ময়নাতদন্ত ছাড়াই নিহতদের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।