মধ্যপ্রাচ্যের তেল রপ্তানি বন্ধ করে দেবে ইরান

Passenger Voice    |    ১১:৪৪ এএম, ২০২৬-০৩-১১


মধ্যপ্রাচ্যের তেল রপ্তানি বন্ধ করে দেবে ইরান

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা চলতে থাকলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে কোনো তেল রপ্তানি হতে দেওয়া হবে না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)। মঙ্গলবার (১০ মার্চ) এ হুঁশিয়ারি দেয় দেশটি।

এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ইরান যদি তেল রপ্তানি বন্ধ করার চেষ্টা করে তবে যুক্তরাষ্ট্র আরও কঠোরভাবে হামলা চালাবে।

তবে এই তীব্র বাকযুদ্ধের মধ্যেও বৈশ্বিক বাজারে তেলের দাম কমেছে এবং শেয়ারবাজারে উত্থান দেখা গেছে। এর কারণ ট্রাম্পের বক্তব্য। তিনি মনে করেন সংঘাত দ্রুত শেষ হবে। যদিও ইরান তাদের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে মোজতবা খামেনিকে নিয়োগ দেওয়ায় উত্তেজনা কিছুটা বেড়েছে।

গতকাল সোমবার ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ইরানের সামরিক শক্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি আরও দাবি করেন, আগে যে চার সপ্তাহের সময়সীমা উল্লেখ করেছিলেন তারও আগে যুদ্ধ শেষ হতে পারে। তবে ‘বিজয়’ বলতে তিনি ঠিক কী বোঝাচ্ছেন তা স্পষ্ট করেননি।

অন্যদিকে ইসরায়েল বলছে, তাদের যুদ্ধের লক্ষ্য ইরানের ধর্মীয় শাসনব্যবস্থাকে উৎখাত করা। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য হলো ইরানের জনগণকে অত্যাচারের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হতে সহায়তা করা।’

তিনি আরও বলেন, ‘শেষ পর্যন্ত এটি তাদের সিদ্ধান্ত। তবে এতে কোনো সন্দেহ নেই যে আমরা তাদের শক্তি ভেঙে দিচ্ছি এবং আমাদের হাত এখনো প্রসারিত রয়েছে। যদি আমরা ইরানের জনগণের সঙ্গে মিলিতভাবে সফল হই, তাহলে স্থায়ীভাবে এই সংঘাতের অবসান ঘটাতে পারব। রাষ্ট্রের জীবনে এমন স্থায়িত্ব বলে কিছু থাকে।’

যদিও মার্কিন কর্মকর্তারা বলেছেন, ওয়াশিংটনের মূল লক্ষ্য ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ও পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করা। তবে ট্রাম্প বলেছেন, ইরানে একটি অনুগত সরকার প্রতিষ্ঠিত না হলে যুদ্ধ শেষ হবে না।

জাতিসংঘে ইরানের রাষ্ট্রদূতের তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারির শেষদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিভিন্ন স্থানে বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু করার পর থেকে অন্তত ১ হাজার ৩৩২ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন এবং হাজারও মানুষ আহত হয়েছেন।

ট্রাম্প আরও সতর্ক করে বলেন, ইরান যদি হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে তেলবাহী জাহাজ চলাচল বন্ধ করার চেষ্টা করে, তবে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা আরও ব্যাপক হবে।

গত সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘যদি তারা তেলের প্রবাহ বন্ধ করতে চায়, আমরা তাদের এমনভাবে আঘাত করব যে ওই অঞ্চলে তারা বা তাদের কোনো সহযোগী আর ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না।’

এদিকে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড কোর জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা চলতে থাকলে তারা মধ্যপ্রাচ্য থেকে কোনো তেল বের হতে দেবে না।

রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের উদ্ধৃতি অনুযায়ী এক মুখপাত্র বলেন, ‘যুদ্ধের শেষ কবে হবে তা আমরাই নির্ধারণ করব।’ তিনি ট্রাম্পের মন্তব্যকে ‘অর্থহীন’ বলে অভিহিত করেন।

পরে ট্রাম্প নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশোসালে একই ধরনের সতর্কবার্তা পুনরায় দেন। তিনি লিখেছেন, ‘ইরান যদি হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে তেলের প্রবাহ বন্ধ করার চেষ্টা করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র তাদের এখন পর্যন্ত যতটা আঘাত করেছে তার চেয়ে ২০ গুণ বেশি শক্তভাবে আঘাত করবে।’

বিশ্বের বৃহত্তম তেল রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান সৌদি আরামকো গতকাল মঙ্গলবার সতর্ক করে বলেছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে বৈশ্বিক তেলবাজারে ‘ভয়াবহ পরিণতি’ দেখা দিতে পারে।

হরমুজ প্রণালি বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথগুলোর একটি। এই পথ দিয়ে উপসাগরীয় অঞ্চলের বড় তেল উৎপাদক দেশগুলো থেকে ওমান উপসাগর ও আরব সাগরে তেল পাঠানো হয়। যুদ্ধের কারণে এরই মধ্যে এই প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে তেলবাহী ট্যাঙ্কারগুলো চলাচল করতে পারছে না। ফলে সংরক্ষণাগার ভরে যাওয়ায় অনেক উৎপাদক দেশ তেল উত্তোলনও বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আবার আলোচনা শুরু হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম। তার ভাষায়, তিন দফা আলোচনায় অগ্রগতির কথা বলার পরও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর হামলা চালিয়েছে।

পিবিএসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘তারা বলেছিল আলোচনা এগোচ্ছে। কিন্তু তারপরই তারা আমাদের ওপর হামলা চালাল। তাই এখন আমেরিকার সঙ্গে আবার কথা বলা আমাদের কর্মসূচিতে থাকবে বলে মনে হয় না।’

গত সোমবার নিহত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির স্থলাভিষিক্ত হিসেবে তার ছেলে মোজতবা খামেনিকে নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্তও দ্রুত যুদ্ধ শেষ হওয়ার আশা কমিয়ে দিয়েছে। এতে তেলের বাজারে বড় ওঠানামা দেখা যায় এবং শেয়ারবাজারে ধস নামে।

তবে ট্রাম্প যখন দ্রুত যুদ্ধ শেষ হওয়ার সম্ভাবনার কথা বলেন এবং রাশিয়ার জ্বালানির ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হতে পারে এমন খবর প্রকাশ পায়, তখন বাজারের পরিস্থিতি আবার বদলে যায়।

রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে কথা বলার পর ট্রাম্প জানান, তেলের ঘাটতি কমাতে যুক্তরাষ্ট্র কিছু দেশের ক্ষেত্রে তেল-সম্পর্কিত নিষেধাজ্ঞা শিথিল করবে।

বিভিন্ন সূত্রের মতে, এর অর্থ হতে পারে রাশিয়ার তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরও শিথিল করা। তবে এতে ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়াকে শাস্তি দেওয়ার পশ্চিমা প্রচেষ্টা জটিল হয়ে উঠতে পারে। অন্য বিকল্প হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত তেল মজুত থেকে তেল ছাড়ার বিষয়ও বিবেচনা করা হচ্ছে।

গত সোমবার তেলের দাম সর্বোচ্চ ২৯ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ার পর মঙ্গলবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১০ শতাংশের বেশি কমে যায়, যা ২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ দামের কাছাকাছি ছিল। একই সঙ্গে বৈশ্বিক শেয়ারবাজারও কিছুটা ঘুরে দাঁড়ায়।

যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রলের দাম রাজনৈতিকভাবে খুবই সংবেদনশীল একটি বিষয়। কারণ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ভোটারদের বড় উদ্বেগের একটি হলো জ্বালানির দাম বৃদ্ধি। ওই নির্বাচনে ট্রাম্পের রিপাবলিকান দল কংগ্রেসে তাদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার চেষ্টা করবে।

গত সোমবার প্রকাশিত রয়টার্স/ইপসোস জরিপে দেখা গেছে, ৬৭ শতাংশ মার্কিন নাগরিক মনে করেন আগামী কয়েক মাসে পেট্রলের দাম বাড়বে। আর মাত্র ২৯ শতাংশ মানুষ এই যুদ্ধকে সমর্থন করছেন। সূত্র: রয়টার্স