লালমনিরহাট টাকার বিনিময়ে চলছে রেলওয়ের লাইসেন্স-বাণিজ্য

Passenger Voice    |    ১২:৩৫ পিএম, ২০২৬-০৩-১০


লালমনিরহাট টাকার বিনিময়ে চলছে রেলওয়ের লাইসেন্স-বাণিজ্য

রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চল জোনের লালমনিরহাট বিভাগে সরকারি রাজস্ব আদায়ের নামে ব্যাপক অনিয়ম ও ‘তুঘলকি’ কাণ্ড চালানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগে বলা হচ্ছে, বিভাগীয় ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তা মো. মনজুর হোসেন রেলওয়ের নীতিমালা ‘লঙ্ঘন’ করে অফিসে বসেই নগদ অর্থের বিনিময়ে অবৈধভাবে লাইসেন্স দিচ্ছেন। তিনি সরকারি কোষাগারে সামান্য অর্থ জমা দিয়ে বাকি টাকা ‘আত্মসাৎ’ করছেন–এমন গুরুতর অভিযোগও পাওয়া গেছে। 

রংপুর বিভাগের ৮টি জেলার ৮৪টি স্টেশন এলাকা লালমনিরহাট রেলওয়ের ভূ-সম্পত্তি বিভাগের আওতায়। এসব জায়গায় দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে গড়ে উঠেছে শত শত দোকানপাট।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, নিয়মিত অভিযানের কথা বলে এসব দোকানপাট বন্ধ করে রাখছেন মনজুর হোসেন। পরে বাণিজ্যিক লাইসেন্স দেওয়ার নামে দোকানমালিকদের কাছ থেকে  ‘মোটা অঙ্কের ঘুষ নিচ্ছেন’ বলে অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। 

লালমনিরহাট রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এসব লাইসেন্স প্রদান বা রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে মানা হচ্ছে না কোনো নিয়মনীতি। এতে সরকার বড় অঙ্কের রাজস্ব হারাচ্ছে। কারণ অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী রেলওয়ের লাইসেন্স ফি বাবদ সকল রাজস্ব এ-চালানের মাধ্যমে তফসিলি ব্যাংকে জমা নেওয়া এবং এ উদ্দেশ্যে যেকোনো নগদ অর্থ লেনদেন সম্পূর্ণ অবৈধ।  বাংলা‌দেশ রেলও‌য়ের ভূ-সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা নীতিমালায় বলা হয়েছে, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পর্যা‌লোচনা এবং যথাযথ পদ্ধ‌তি অনুসরণ করে লিজ বা লাইসেন্স অনুমোদন করতে হবে। সেই লাইসেন্স অনু‌মো‌দনের পরে সরকা‌রি পাওনা‌ আদা‌য়ের জন্য ডিমান্ড নো‌টিশ ইস্যু করার বিধান রয়েছে। কিন্তু মনজুর হোসেন সেই বিধিবিধান কিছুই মানছেন না বলে অভিযোগ করছেন ভুক্তভোগীরা। 

মো. মনজুর হোসেনের নানা কর্মকাণ্ডের অডিও রেকর্ড গণমাধ্যমের হাতে রয়েছে। ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলার পরে লালমনিরহাট রেলওয়ের ভূ-সম্পত্তি বিভাগে গিয়ে আরও কিছু তথ্য জানা যায়। 

ওই কার্যালয়ের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী জানান, লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার বাসিন্দা রনিউল ইসলাম ও ফজলে রহমান নামের দুই ব্যক্তির কাছ থেকে সরকারি রাজস্ব আদায়ের কথা বলে মনজুর হোসেন সর্বমোট ২ লাখ ৯ হাজার টাকা নেন। 

কিন্তু  তিনি নিজ অফিসের কর্মচারীর মাধ্যমে লালমনিরহাটের মিশন মোড় শাখার অগ্রণী ব্যাংকে ৬টি সরকারি এ-চালানের মাধ্যমে ৮৯ হাজার টাকা জমা করেন। ১ লাখ ২০ হাজার টাকা তিনি কোষাগারে জমা দেননি। পরে জানা যায়, মনজুর হোসেন ওই দুই ব্যক্তির হাতে ধরিয়ে দেন ‘ভুয়া’ বাণিজ্যিক লাইসেন্স, আদতে যা রেলওয়ে এস্টেট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম নামক সফটওয়্যারে এন্ট্রি করা তথ্যের কপি মাত্র। 

ভুক্তভোগী ব্যক্তিরা জানান, বারবার সরকারি কোষাগারে অর্থ জমা দেওয়ার রশিদ চাইলেও তাদের কোনো রশিদ দেওয়া হয়নি। এ লাইসেন্স তিনি কীভাবে ইস্যু করেছেন এ-সংক্রান্ত নথিপত্র দেখাতে বললেও তিনি তা দেখাতে পারেননি। 

রনিউল ইসলাম বলেন, ‘কিছুদিন আগে বড়খাতা রেলস্টেশন এলাকায় আমার দোকানসহ বেশ কয়েকটি দোকানে তালা মারেন মনজুর হোসেন। তিনি আমার ৪৯২ বর্গফুট জমির জন্য ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা দিতে বলেন। আমি তার অফিসে গিয়ে টাকা দিয়ে আসি। কিন্তু তিনি কোনো চালানের কপি আমাকে দেননি। পরে আমি জানতে পারি, আমার নামে অগ্রণী ব্যাংকে তিনটি চালানের মাধ্যমে মাত্র ৫৩ হাজার ১৯৭ টাকা জমা দেওয়া হয়েছে। এভাবে তিনি আরও অনেকের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা আত্মসাৎ করছেন। কেউ টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে দোকান উচ্ছেদসহ মামলা করার হুমকি দেন তিনি।’

রেলওয়ের এস্টেট কর্মকর্তা মো. মনজুর হোসেনের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার ও সাধারণ মানুষকে প্রতারিত করার বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উঠেছে। রেলের কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মনজুর হোসেন রেলওয়ের কৃষিজমিকে নিয়মবহির্ভূতভাবে বাণিজ্যিক জমিতে রূপান্তর করেছেন। যারা রেলের জমি অবৈধভাবে দখল করে আছেন, তাদের সঙ্গে আঁতাত করে নামমাত্র (মাত্র ৩ বছরের) রাজস্ব আদায়ের ব্যবস্থা করেছেন তিনি। দাপ্তরিক কোনো নথি বা নিয়ম অনুসরণ না করেই গোপনে দখলদার বা দোকান মালিকদের নামে ডিমান্ড নোটিশ স্বাক্ষর করেছেন তিনি। সরকারি এস্টেট ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যারে নিজেই অবৈধ দখলদারদের তথ্য এন্ট্রি দিয়ে সেটির একটি প্রিন্ট কপি তাদের হাতে ধরিয়ে দিচ্ছেন তিনি।

এমন সব কর্মকাণ্ডে সরকার রাজস্ব বঞ্চিত হচ্ছে। পাশাপাশি অবৈধভাবে রেলের জমি দখলের প্রবণতা বাড়ছে। একই সঙ্গে রেলের ভূ-সম্পত্তি অফিস হতে লিজ এনে দেওয়ার নামে দালাল শ্রেণি গড়ে উঠছে।

জানা যায়, রেলওয়ের ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তা মো. মনজুর হোসেনের এসব কর্মকাণ্ডে  ‘প্রত্যক্ষ সহযোগী’ হিসেবে কাজ করছেন রেলওয়ের লালমনিরহাট বিভাগের ভূ-সম্পত্তি অফিসের অফিস সহকারী জাবের হোসেন ও ফিল্ড কানুনগো সিদ্দিকুর রহমান। যদিও  এসব অভিযোগ তারা অস্বীকার করেছেন।

ডিভিশনাল এস্টেট অফিসার মো. মনজুর হোসেন নিজ অফিসে অর্থ লেনদেনের বিষয়টি স্বীকার করে নেন। তবে অন্য অভিযোগগুলো নিয়ে প্রশ্ন করলে তিনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন।

লালমনিরহাট রেলওয়ের বিভাগীয় ব্যবস্থাপক মো. তসলিম আহমেদ খান বলেন, আমি মাত্রই জয়েন করেছি। এ রকম অনিয়ম হলে খতিয়ে দেখা হবে। তদন্তসাপেক্ষে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলের চিফ স্টেট অফিসার মো. নাদিম সরোয়ার বলেন, খাজনা বা লাইসেন্স ফি আদায়ের ক্ষেত্রে নগদ অর্থ লেনদেনের সুযোগ নেই। বাণিজ্যিক লাইসেন্স যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই দিতে হবে। বিষয়গুলো তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সূত্র খবরের কাগজ

প্যা/ভ/ম