শিরোনাম
Passenger Voice | ১২:৩৮ পিএম, ২০২৬-০৩-০৯
আসন্ন ঈদুল ফিতর উপলক্ষ্যে ঘরমুখো মানুষের যাত্রা নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন করতে ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে সরকার। এবার বড় ধরনের দুর্ঘটনা মোকাবিলায় হেলিকপ্টার ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মহাসড়ক বা রেলপথে আকস্মিক কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে দ্রুত উদ্ধারকাজ শুরু করতে এসব হেলিকপ্টার সার্বক্ষণিক প্রস্তুত রাখা হবে। এছাড়া যানজট নিরসন এবং সার্বিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ১৫৫টি স্পটে সিসি ক্যামেরা স্থাপন ও ড্রোন দিয়ে নিবিড় পর্যবেক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দুর্ঘটনার পর প্রথম কয়েক ঘণ্টা উদ্ধারকাজের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ সময়ে দ্রুত তৎপরতা চালানো গেলে প্রাণহানি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। এ কারণে হেলিকপ্টার ও জরুরি উদ্ধার সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখাকে সময়ের দাবি ও যুগোপযোগী পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন তারা।
সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত কমিটির বৈঠকে এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভায় উপস্থিত দায়িত্বশীল সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে, ঈদে ঘরমুখো মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধ, যানজট নিয়ন্ত্রণ ও দুর্ঘটনা প্রতিরোধে বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রতি বছর ঈদে সড়ক, রেল ও নৌপথে যাত্রীদের অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়। অতীতে বড় ধরনের দুর্ঘটনার পর উদ্ধারকাজে বিলম্ব হওয়ার যেসব অভিযোগ ছিল, তা নিরসনে এবার বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এবার যে কোনো দুর্ঘটনার পরপরই দ্রুত উদ্ধার তৎপরতা শুরু করতে হেলিকপ্টার প্রস্তুত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
মহাসড়ক বা রেলপথে বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে সংশ্লিষ্ট দুর্গম এলাকায় দ্রুত পৌঁছাতে আকাশপথ ব্যবহার করা হবে। এজন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সশস্ত্র বাহিনীর সংশ্লিষ্ট ইউনিটগুলোকে প্রয়োজনীয় হেলিকপ্টার প্রস্তুত রাখতে বলা হয়েছে। এছাড়া উদ্ধার অভিযানে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল, রেসকিউ বোট, আধুনিক অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম ও অ্যাম্বুলেন্স সার্বক্ষণিক মোতায়েন রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে কোস্টগার্ডের সহায়তাও নেওয়া হবে। পাশাপাশি মহাসড়কের নিকটস্থ হাসপাতাল ও ট্রমা সেন্টারগুলোকে জরুরি সেবা দেওয়ার জন্য বিশেষভাবে প্রস্তুত থাকার নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে।
সীমান্তে বাড়তি নজরদারি
বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, সভায় সীমান্তের নিরাপত্তা এবং মাদকের অবৈধ সরবরাহ রোধ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করে সীমান্ত এলাকায় মাদক ও চোরাচালান বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি জোরদার করতে বিজিবি ও কোস্টগার্ডকে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সীমান্তে নিয়মিত টহল বাড়ানোর পাশাপাশি গোয়েন্দা নজরদারিও কয়েকগুণ বৃদ্ধি করা হবে।
টিকিট কালোবাজারি ও অতিরিক্ত ভাড়া বন্ধে কড়াকড়ি
ঈদযাত্রায় বাস, ট্রেন ও লঞ্চের টিকিট নিয়ে কালোবাজারি একটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা। এ বছর এ বিষয়ে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, কোনোভাবেই নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা যাবে না। টিকিট কালোবাজারি প্রতিরোধে টার্মিনালগুলোতে বিশেষ পর্যবেক্ষণ টিম মোতায়েন করা হবে। এছাড়া যাত্রী সচেতনতায় তথ্য মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালানো হবে।
যাত্রীদের সচেতন করতে বিশেষ প্রচারণা
ঈদে ঘরমুখো মানুষের যাতায়াত নির্বিঘ্ন করতে জনসচেতনতামূলক কার্যক্রমের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে ঈদযাত্রায় ‘অজ্ঞান পার্টি’ বা প্রতারক চক্রের দৌরাত্ম্য থেকে বাঁচতে অপরিচিত ব্যক্তির দেওয়া খাবার বা পানীয় গ্রহণ না করার বিষয়ে যাত্রীদের সতর্ক করা হবে। রেলস্টেশন, বাস টার্মিনাল ও লঞ্চঘাটে এ লক্ষ্যে নিয়মিত মাইকিংসহ বিভিন্ন ধরনের প্রচারণা চালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
যানজট নিয়ন্ত্রণে ১৫৫ স্পটে সিসি ক্যামেরা ও ড্রোন
ঈদযাত্রায় দীর্ঘ যানজট নিরসনে এবার প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি বাড়ানোর বড় ধরনের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। সড়ক ও মহাসড়ক বিভাগের চিহ্নিত ১৫৫টি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করে কেন্দ্রীয়ভাবে যান চলাচল পর্যবেক্ষণ করা হবে। ঈদের আগে ও পরে এসব স্থানে বিশেষ তদারকি জোরদার করা হবে; এমনকি প্রয়োজন হলে পরিস্থিতি পর্যালোচনায় ড্রোন ব্যবহারের পরিকল্পনাও রয়েছে।
পদ্মা ও যমুনা সেতুসহ যানজটপ্রবণ এলাকাগুলোতে অতিরিক্ত রেকার (অচল গাড়ি অপসারণকারী যন্ত্র) প্রস্তুত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে কোনো গাড়ি বিকল হলে দ্রুত তা সরিয়ে নেওয়া যায়। এছাড়া টোল প্লাজাগুলোতে দ্রুত টোল আদায়ের জন্য আধুনিক প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
ঈদের ছুটিতে রাজধানীসহ বড় শহরগুলো জনশূন্য হয়ে পড়ায় তালাবদ্ধ বাসাবাড়িতে চুরি-ডাকাতির ঝুঁকি বেড়ে যায়। এ ঝুঁকি মোকাবিলায় বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় পুলিশের টহল বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও কূটনৈতিক এলাকায় বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
শহর ও বন্দর এলাকাগুলোতে সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ ও র্যাবের টহল বাড়ানোর পাশাপাশি সন্দেহজনক কার্যক্রম পর্যবেক্ষণে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্র মতে, ঈদ উপলক্ষ্যে অপরাধ প্রতিরোধে বিভিন্ন জনাকীর্ণ স্থানে সাদা পোশাকে পুলিশ মোতায়েন থাকবে।
শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধে কঠোর নির্দেশনা
ঈদের আগে গার্মেন্টস শ্রমিকদের বেতন ও বোনাস নিশ্চিত করার বিষয়টি সভায় বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, মার্চ মাসের বেতন এবং ঈদ বোনাস অবশ্যই ঈদের ছুটির আগে পরিশোধ করতে হবে। সেই সঙ্গে শ্রমিকদের ছুটি নির্ধারিত সময় অনুযায়ী দিতে হবে এবং কোনোভাবেই এই সময়ে শ্রমিক ছাঁটাই করা যাবে না। বেতন-ভাতা পরিশোধের বিষয়টি তদারকি করতে মালিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে শিল্প পুলিশ নিয়মিত সমন্বয় করবে।
ঈদে কেনাকাটার ভিড় বাড়ায় মার্কেট ও শপিং মলগুলোতে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। শপিং এলাকাগুলোতে পোশাকধারী পুলিশের পাশাপাশি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সাদা পোশাকের গোয়েন্দা মোতায়েন থাকবে। বিশেষ করে নারী ক্রেতাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নারী পুলিশের উপস্থিতি বাড়ানো হবে।
নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সেনাবাহিনী, বিজিবি ও র্যাবের নিয়মিত টহল জোরদার করা হবে। বড় বড় মার্কেটগুলোতে সিসি ক্যামেরা স্থাপন নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং এ বিষয়ে মার্কেট মালিক সমিতিগুলোকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে পূর্ণ সহযোগিতার আহ্বান জানানো হয়েছে।
অতিরিক্ত যাত্রী বহন ও কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষ
ঈদযাত্রায় বাস, ট্রেন ও লঞ্চে অতিরিক্ত যাত্রী বহন রোধে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পরিবহন সংশ্লিষ্ট প্রতিটি সংস্থাকে এ বিষয়ে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট ও নজরদারি চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যাত্রী নিরাপত্তার স্বার্থে ঝুঁকিপূর্ণভাবে যাতায়াত বন্ধে প্রশাসন জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করবে।
ঈদের সার্বিক পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণের জন্য পুলিশ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো বিশেষ কন্ট্রোল রুম চালু করবে। যেকোনো জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়া দিতে এসব কন্ট্রোল রুমকে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত করা হবে, যাতে মুহূর্তের মধ্যেই সমন্বয় করা সম্ভব হয়।
নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন ঈদযাত্রাই সরকারের লক্ষ্য
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রতি বছর ঈদের সময় রাজধানীসহ বড় শহরগুলো থেকে লাখ লাখ মানুষ নাড়ির টানে বাড়ি ফেরেন। এই বিশাল জনস্রোতের কারণে যানজট নিরসন, দুর্ঘটনা রোধ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এক বিশাল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। তবে এবার আগাম পরিকল্পনা ও সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছে সরকার।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক কাজী শরীফ উদ্দিনের মূল্যায়ন
নিরাপত্তা বিশ্লেষক কাজী শরীফ উদ্দিন মনে করেন, ঈদের সময় প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো বিপুলসংখ্যক মানুষের একযোগে যাতায়াত নিশ্চিত করা। সড়ক, রেল ও নৌপথে যাত্রীচাপ কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ায় দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ে। তিনি বলেন, ‘দুর্ঘটনার পরবর্তী প্রথম কয়েক ঘণ্টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ সময় দ্রুত উদ্ধারকাজ শুরু করা গেলে প্রাণহানি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। এ কারণে হেলিকপ্টার ও জরুরি উদ্ধার সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখা একটি সময়োপযোগী উদ্যোগ।’
তিনি আরও যোগ করেন, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি এখন সময়ের দাবি। যানজটপ্রবণ পয়েন্টগুলোতে সিসি ক্যামেরা ও ড্রোনের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ এবং দ্রুত অচল যানবাহন সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা থাকলে মানুষের ভোগান্তি অনেকটাই লাঘব হবে। তবে কেবল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রস্তুতিই যথেষ্ট নয়; যাত্রীদের সচেতনতা এবং পরিবহন খাতের শৃঙ্খলাও নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে টিকিট কালোবাজারি, অতিরিক্ত ভাড়া আদায় এবং অতিরিক্ত যাত্রী বহন বন্ধে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।
অপরাধ বিশেষজ্ঞ মো. সাখাওয়াত হোসেনের অভিমত
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘ঈদের সময় বড় শহরগুলো ফাঁকা হয়ে যাওয়ায় এবং টার্মিনালগুলোতে মানুষের অতিরিক্ত ভিড়ের সুযোগে অপরাধ সংগঠনের ঝুঁকি বেড়ে যায়। বাসাবাড়িতে চুরি-ডাকাতি, টিকিট কালোবাজারি কিংবা যাত্রীদের টার্গেট করে প্রতারণার মতো ঘটনা এই সময়ে বেশি দেখা যায়।’
তিনি পরামর্শ দেন যে, টার্মিনাল ও স্টেশনগুলোতে ‘অজ্ঞান পার্টি’ বা প্রতারক চক্র ঠেকাতে সাদা পোশাকে পর্যাপ্ত জনবল নিয়োগ এবং সিসি ক্যামেরা জোরদার করা জরুরি।
সাখাওয়াতের মতে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটের মধ্যে শক্তিশালী সমন্বয়, নিয়মিত টহল ও গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো গেলে অপরাধ অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে।
সূত্র ঢাকা পোস্ট
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত 2019 - 2026 PassengerVoice | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Developed By Muktodhara Technology Limited.
পাবলিক মতামত