শাহজালালে মশার উপদ্রব, যাত্রী-স্বজনরা নাজেহাল

Passenger Voice    |    ০১:৫৫ পিএম, ২০২৬-০৩-০৮


শাহজালালে মশার উপদ্রব, যাত্রী-স্বজনরা নাজেহাল

রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে মশার উপদ্রব চরমে পৌঁছেছে। এতে দুর্ভোগে পড়ছেন যাত্রীরা, তাদের স্বজন এবং বিমানবন্দরে কর্মরত কর্মীরা। দেশের প্রধান আন্তর্জাতিক প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত এই বিমানবন্দরের ভেতর ও বাইরে প্রায় সর্বত্রই মশার উৎপাত এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে তা এখন যাত্রীসেবা ও অন্যান্য কার্যক্রমকে মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত করছে। 

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, বিমানবন্দরের টার্মিনাল ভবনের ওয়েটিং রুম, কনকোর্স হল, বোর্ডিং ব্রিজ, ইমিগ্রেশন ও কাস্টমস এলাকা থেকে শুরু করে লাগেজ বেল্ট জোন–কোথাও স্বস্তি নেই। দেশি-বিদেশি যাত্রীরা অভিযোগ করছেন, স্থির থাকলেই শরীরের উন্মুক্ত অংশে মশা কামড়াতে শুরু করে। হাত দিয়ে তাড়ালেও তেমন কাজ হয় না, বরং অনেক সময় মশা হাতে বসে থাকছে। ফলে বসে থাকা তো দূরের কথা, দাঁড়িয়ে থাকাও অনেকের জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে।

এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বাড়ছে ফ্লাইট বাতিলের সংখ্যা। বিমানবন্দর সূত্রে জানা গেছে, ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার জেরে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ তাদের আকাশসীমা সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়ায় গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে গতকাল শনিবার পর্যন্ত ঢাকা থেকে মোট ২৬৮টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। ইরান, ইরাক, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কাতার ও জর্ডানগামী বা সেসব রুটের ওপর দিয়ে চলাচলকারী ফ্লাইটগুলো সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হয়েছে।

ফ্লাইট বাতিল ও মশার উপদ্রব–দুই সংকট একসঙ্গে তৈরি হওয়ায় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা যাত্রী ও তাদের স্বজনরা পড়েছেন মহাবিপাকে। সংশ্লিষ্টদের মতে, দায় এড়ানোর সংস্কৃতি পরিহার করে সমন্বিত ও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এমন ঘটনা নতুন নয়। ২০১৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি রাতে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে মশার ভয়াবহ উপদ্রবের কারণে মালয়েশিয়ান এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটের যাত্রা প্রায় দুই ঘণ্টা বিলম্বিত হয়। কেবিন ক্রুরা মশা নিধন না করা পর্যন্ত যাত্রীরা চরম ভোগান্তিতে পড়েন এবং উড়োজাহাজটি রানওয়ে থেকে ফিরে আসতে বাধ্য হয়, যা বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। মশার কামড়ে অতিষ্ঠ যাত্রীরা ক্ষোভ প্রকাশ করলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যায়নি এখনো, বরং ক্রমেই বেড়েছে। সম্প্রতি উড়োজাহাজের ভেতরেও মশার উপস্থিতি দেখা গেছে। একটি ফ্লাইটে কেবিন ক্রুদের ইলেকট্রনিক মশা নিধন যন্ত্র ব্যবহার করতে দেখা যাওয়ার ঘটনাও আলোচনায় এসেছে, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে হয় ব্যাপক সমালোচনা।

টার্মিনালে দেখা যায়, বিমানবন্দরের ভেতরে মশা নিয়ন্ত্রণে তদারকির দাবি থাকলেও বাইরে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ বলে অভিযোগ রয়েছে। আগত ও প্রবাসগামী যাত্রীদের স্বজনরা টার্মিনালের বাইরে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েন। বিমানবন্দরের কর্মীদের অনেককে নিজ উদ্যোগে একের পর এক মশার কয়েল জ্বালিয়ে রাখতে দেখা গেছে। আবার অনেকেই মাটির কৌটায় ধূপ জ্বালিয়ে ধোঁয়ার মাধ্যমে মশা তাড়ানোর চেষ্টা করেন। তবে যাত্রী ও তাদের স্বজনদের সুরক্ষায় সমন্বিত বা দৃশ্যমান কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেই বলে অভিযোগ রয়েছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে বিমানবন্দর এলাকায় গাড়ির দরজা খুলতেও দ্বিধায় পড়ছেন অনেক চালক।

গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ে কর্মরতরা জানান, মশার উৎপাত অসহনীয় হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে রাতের বেলায় ডিউটি করা অত্যন্ত কষ্টকর। নিরাপত্তাজনিত কারণে উড়োজাহাজের পাশে যেখানে-সেখানে কয়েল বা ধূপ জ্বালানো সম্ভব নয়। ফলে অনেককে বাধ্য হয়ে মশার কামড় সহ্য করেই কাজ করতে হচ্ছে। কর্মীদের ভাষ্য অনুযায়ী, নভেম্বর মাস থেকে মশার উপদ্রব বাড়তে শুরু করে এবং শীতকালে তা চরমে পৌঁছায়। দিনের বেলাতেও স্বস্তি নেই।

প্রিয়জনদের বিদেশে পাঠাতে এসে অনেক স্বজন ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। এক অভিভাবক বলেন, সন্তানের বিদায়ের আবেগ সামলানোর আগেই মশা তাড়াতে ব্যস্ত থাকতে হচ্ছে। বিদেশি যাত্রীদের সামনেও এমন পরিস্থিতি দেশের ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে বলে মনে করছেন অনেকে।

বিদেশগামী যাত্রী বসির উদ্দীন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বিমানবন্দরের মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় এমন অবস্থা সত্যিই অস্বস্তিকর। বসার ব্যবস্থা নেই, দাঁড়িয়েও থাকা যাচ্ছে না। বারবার মশা তাড়াতে হচ্ছে, বিদেশি যাত্রীদের সামনে এটি দেশের জন্যও বিব্রতকর। যারা দেশের হাল ধরে তাদের অবস্থা দেশে নামার পর বেহাল করে ছেড়ে দেয়!

বিমানবন্দর এলাকায় অপেক্ষা করা গাড়িচালক সজিম বলেন, গাড়ির দরজা একটু খুললেই মশা ঝাঁকে ঝাঁকে ভেতরে ঢুকে পড়ে। যাত্রী নামানো বা ওঠানোর সময়ও দাঁড়িয়ে থাকা মুশকিল হয়ে যায়। কেউ এসব বিষয় দেখেন না।

বিমানবন্দরের পার্কিংয়ে ছোট দোকানের কর্মচারী আফজাল হোসেন বলেন, দিনে-রাতে মশার কামড় খেতে হয়। সন্ধ্যার পর মশার উপদ্রব আরও বেড়ে যায়। অনেক যাত্রী ও স্বজন এসে কয়েল কিনছেন বা ধূপ জ্বালাচ্ছেন। কিন্তু এত মশা যে এগুলোতেও খুব একটা কাজ হচ্ছে না।

মশার উপদ্রব নিয়ে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন পরস্পরকে দোষারোপ করছে। উভয় পক্ষই মশক নিধনে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি করলেও বাস্তবে দৃশ্যমান উন্নতি হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। জরুরি বৈঠক ও বিশেষ অভিযান চালানোর ঘোষণা এলেও এগুলো হয়নি।

বিমানবন্দরে দুর্ভোগের বিষয়টি জানা রয়েছে, তবে মশা নিয়ন্ত্রণে কাজ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন উত্তর সিটি করপোরেশনের উপ-প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মো. ইমদাদুল হক। তিনি  বলেন, ‘এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া বিশেষ কিছু বলা যাবে না। তবে আমাদের কর্মীরা সকাল সাড়ে ৭টা থেকে ৮টার মধ্যে মশক নিধনে কাজ করেন। এত দ্রুত সময়ে এত বড় এলাকায় কীভাবে মশক নিধন করা হয়েছে–জানতে চাইলে তিনি এখন ব্যস্ত বলে এড়িয়ে যান।’

যদিও বিমানবন্দরে গিয়ে সিটি করপোরেশনের মশক নিধনকর্মীদের কাজ করতে দেখা যায়নি। সকাল ৬টা থেকে ৮টার পর পর্যন্ত অপেক্ষা করেও সিটি করপোরেশনের মশক নিধন কার্যক্রম দেখা যায়নি। 

প্যা.ভ.ম