শিরোনাম
Passenger Voice | ১২:২৯ পিএম, ২০২৬-০৩-০৭
ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল বিপুল ব্যয়ে নির্মাণ করা হলেও পরিচালনা নিয়ে জটিলতার কারণে তিন বছর ধরে অব্যবহৃত রয়েছে। অবশেষে পরিচালনা-সংক্রান্ত জট খুলতে শুরু করেছে। এ বিষয়ে আলোচনা করতে ঢাকা আসছে জাপানের একটি কারিগরি দল। আগামী ১১ মার্চ তাদের সঙ্গে তৃতীয় টার্মিনাল নিয়ে বৈঠক হবে।
জাপানের প্রতিনিধি দলের সফরের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বেবিচকের সদস্য (পরিচালনা ও পরিকল্পনা) এয়ার কমডোর আবু সাঈদ মেহবুব খান। তিনি জানান, সফরকালে বৈঠকে তৃতীয় টার্মিনাল দ্রুত চালুর বিষয়টি অগ্রাধিকার পাবে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে সমকালকে বলেন, জাপানকে তৃতীয় টার্মিনাল পরিচালনার জন্য সবুজ সংকেত দেওয়া হয়েছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে বৈঠক করতে তাদের কারিগরি দল ঢাকা আসছে। তবে তারা বিভিন্ন সেবার ফি আদায়ের বিষয়ে আগে যে প্রস্তাব দিয়েছে, তা নিয়ে নতুন করে দরকষাকষি করা হবে। তাদের দেওয়া আগের প্রস্তাবে যাত্রীদের খরচ বাড়বে এবং সরকারেরও বাড়তি খরচ হবে।
ওই কর্মকর্তা জানান, বর্তমান সরকার শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা আন্তর্জাতিক সমুদ্রবন্দরের মডেল অনুসরণ করতে চাচ্ছে। অর্থাৎ জাপান সুনির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত এ টার্মিনাল পরিচালনা করে ঋণের অর্থ তুলে নেবে। এতে সরকারকে এর পেছনে আলাদা করে ব্যয় করতে হবে না।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময় জিটুজি ভিত্তিতে জাপানের কাছে এই টার্মিনাল পরিচালনার কাজ দেওয়ার পরিকল্পনা হয়েছিল। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সরকার পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার তা বাতিল করে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব (পিপিপি) মডেলে পরিচালন প্রতিষ্ঠান নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু একের পর এক বৈঠক ও সিদ্ধান্ত বদল হলেও এটি চালু করতে পারেনি।
সূত্র জানায়, বৈঠকে অংশ নিতে প্রতিনিধি দল নিয়ে ঢাকায় আসছেন জাপানের ভূমি, অবকাঠামো, পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সহকারী উপমন্ত্রী এবং দেশটির আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলবিষয়ক মহাপরিচালক রিকো নাকায়ামা।
সরকারের উচ্চ পর্যায়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে সমকালকে বলেন, তৃতীয় টার্মিনাল পরিচালনা নিয়ে জাপানের পক্ষ থেকে যে তিনটি প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, তা বাস্তবসম্মত নয়। এটি শুধু বাংলাদেশ বলছে না। এ নিয়ে বিশ্বব্যাংকের ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশনকে (আইএফসি) পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ দেয় বাংলাদেশ। তারাও একই রকম মত দিয়েছে। বাংলাদেশ তো অবাস্তব কিছুতে সম্মত হতে পারে না।
বেবিচকের সদস্য এয়ার কমডোর আবু সাঈদ মেহবুব খান জানান, গত বছর ডিসেম্বরে তৃতীয় টার্মিনাল পরিচালনা নিয়ে জাপানের সুমিতোমো করপোরেশন থেকে সর্বশেষ প্রস্তাব নেওয়া হয়েছিল। দেশের বাইরে ভ্রমণের ক্ষেত্রে যাত্রীদের প্রতিবার এম্বারকেশন ফি বর্তমানে ৫০০ টাকার (৪ ডলার) পরিবর্তে ১২ ডলার নিতে প্রস্তাব করেছে তারা। এ ছাড়া টার্মিনাল পরিচালনা এবং রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটি কোনো অর্থ ব্যয় করবে না। তাদের দেওয়া ওই প্রস্তাবনা বেবিচকের পক্ষে মানা সম্ভব হয়নি।
গতকাল বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম (রিতা) এবং প্রতিমন্ত্রী এম. রশিদুজ্জামান মিল্লাত তৃতীয় টার্মিনাল পরিদর্শন করেন বলে বিজ্ঞপ্তিতে জানায় বেবিচক। তারা টার্মিনালের কার্যক্রম বাস্তবায়ন অগ্রগতি পর্যালোচনা করেন। দ্রুত এটি চালু করার ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা কামনা করেন।
তৃতীয় টার্মিনাল প্রকল্পটি ২১ হাজার ৩০০ কোটি টাকার। এর মধ্যে বাংলাদেশ সরকার প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করেছে। বাকি অর্থ ঋণ হিসেবে দিয়েছে জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা)। দুই লাখ ৩০ হাজার বর্গমিটার আয়তনের এই টার্মিনালে রয়েছে ১১৫টি চেক-ইন কাউন্টার, ৬৬টি ডিপারচার ইমিগ্রেশন ডেস্ক, ৫৯টি অ্যারাইভাল ইমিগ্রেশন ডেস্ক ও তিনটি ভিআইপি ডেস্ক। টার্মিনালটি চালু হলে যাত্রীসেবায় সক্ষমতা বছরে ৮০ লাখ থেকে বেড়ে দুই কোটি ৪০ লাখে উন্নীত হবে। কার্গো হ্যান্ডলিং সক্ষমতা দ্বিগুণ হয়ে বছরে ১০ লাখ টনে পৌঁছাবে। টার্মিনালের কাজ ৯৯ শতাংশ শেষ হলেও অপারেটর নিয়োগ ও প্রয়োজনীয় জনবল সংকটের কারণে কার্যক্রম শুরু হয়নি।
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর তৃতীয় টার্মিনালের সীমিত পরিসরে ব্যবহারের জন্য উদ্বোধন করা (সফট ওপেনিং) হয়। তবে অপারেটর নিয়োগ না হওয়ায় অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বিকল্প হিসেবে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বানের অনুমতি চেয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে চিঠি পাঠায় বেবিচক। গত ৯ ফেব্রুয়ারি বেবিচক থেকে পাঠানো চিঠিতে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) মডেলের আওতায় ‘তৃতীয় টার্মিনাল অপারেশন অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স’ প্রকল্প বাস্তবায়নের বিকল্প প্রস্তাব অনুমোদনের কথা উল্লেখ করা হয়। তবে সে পরিকল্পনা থেকে সরে এসেছে বর্তমান সরকার।
এর আগে তৃতীয় টার্মিনাল পরিচালনার জন্য জাপানের সুমিতোমো করপোরেশন নেতৃত্বাধীন একটি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে একাধিক দফায় আলোচনা হয়। তবে রাজস্ব বণ্টন, অপারেশনাল নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত শর্তে মতপার্থক্যের কারণে চুক্তি চূড়ান্ত হয়নি। বেবিচক কর্মকর্তারা জানান, কনসোর্টিয়ামের কিছু দাবি রাষ্ট্রের কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে গ্রহণযোগ্য ছিল না।
এর মধ্যেই টার্মিনাল নির্মাণকাজের অর্থ পরিশোধ নিয়ে নতুন জটিলতা তৈরি হয়েছে। বেবিচক ও বিদেশি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘এভিয়েশন ঢাকা কনসোর্টিয়াম (এডিসি)’-এর মধ্যে দেনা-পাওনাসংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তিতে গঠিত আন্তর্জাতিক সালিশি বোর্ডে পরাজয় হয় বেবিচকের। সালিশি বোর্ড বেবিচককে প্রায় এক হাজার ৬৫০ কোটি টাকা সমপরিমাণ অর্থ পরিশোধের নির্দেশ দিয়েছে। মালয়েশিয়া, যুক্তরাজ্য ও জার্মানির তিন বিচারকের সমন্বয়ে গঠিত বোর্ডের রায়ে বলা হয়েছে, বিভিন্ন কাজের বিল, রিটেনশন মানি এবং বিলম্বজনিত অর্থায়ন চার্জ বাবদ এই অর্থ পরিশোধ করতে হবে। তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণে ‘এভিয়েশন ঢাকা কনসোর্টিয়াম (এডিসি)’ নামে একটি যৌথ কনসোর্টিয়াম কাজ করছে। এতে জাপানের মিতসুবিশি করপোরেশন, ফুজিটা করপোরেশন এবং দক্ষিণ কোরিয়ার স্যামসাং সিঅ্যান্ডটি করপোরেশন অংশীদার রয়েছে।
প্রকল্পটি ঘিরে দুর্নীতির অভিযোগও উঠেছে। টার্মিনাল নির্মাণে প্রায় চার হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ তদন্ত করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। পাশাপাশি নকশাগত ত্রুটির কারণে সিলিং ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং টার্মিনালের ভেতরে মোবাইল নেটওয়ার্ক কাভারেজ না থাকার বিষয়টিও উদ্বেগ তৈরি করেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নকশাগত সীমাবদ্ধতার কারণে টার্মিনালের ভেতরে পর্যাপ্ত মোবাইল নেটওয়ার্ক অবকাঠামো স্থাপন করা হয়নি। বর্তমানে জরুরি ভিত্তিতে এ অবকাঠামো স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত 2019 - 2026 PassengerVoice | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Developed By Muktodhara Technology Limited.
পাবলিক মতামত