শিরোনাম
Passenger Voice | ১১:৪৫ এএম, ২০২৬-০৩-০৭
রাজধানীর লালবাগের বাসিন্দা দিবারুল আলম একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। ঢাকার যানজটের ঝক্কি থেকে রেহাই পেতে ব্যবহার করেন নিজের সুজুকি জিক্সার-১৫০ মডেলের মোটরসাইকেল। বছর না ঘুরতেই দেখলেন মাইলেজ কমে যাচ্ছে। বেশি গরম হচ্ছে ইঞ্জিন।
তার চেয়ে বেশি সমস্যা বাইক হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়। আবার হঠাৎ দেখা যায় স্টার্টই নিচ্ছে না। সমস্যা সমাধানে একাধিকবার মোটরসাইকেল মেকানিকের শরণাপন্ন হয়েছেন। কার্বুরেটর পরিষ্কার করে ফের কিছুদিন একটু স্বাচ্ছন্দ্যে চললেও একই সমস্যা দেখা দেয় কদিন বাদেই।
শেষমেশ মেকানিকের পরামর্শে পাঁচ হাজার টাকা খরচ করে নতুন কার্বুরেটর লাগান বাইকে। এরপরও অভিজ্ঞতা সুখকর হয়নি। মাস তিনেক পর ফের একই সমস্যা দেখা দেয়। তার ভাষ্য, মেকানিকের সঙ্গে কথা বলে জেনেছেন ভেজাল তেল ব্যবহারের কারণেই এ সমস্যা হচ্ছে। তেলে ভেজাল থাকার কারণে কার্বুরেটরে ময়লা জমে যায়। এতে গাড়ি বন্ধ হয়ে যায়।
জং পড়েছে ট্যাংকিতে
দিবারুল বলেন, বাইক নিয়ে খুবই ঝামেলায় আছি। হঠাৎ দেখা যায় রাস্তায় স্টার্ট নিচ্ছে না। আশপাশে মেকানিকের দোকান খুঁজে যেতে হয়। সব সময় মেকানিকও পাওয়া যায় না। আগে যেখানে প্রতি লিটারে ৩২ থেকে ৩৫ কিলোমিটার চলতো এখন ২৮ কিলো চলে। ট্যাংকিতে জং ধরে গেছে। মেকানিক বলছেন, ট্যাংকি খুলে চার-পাঁচ দিন পুডিং দিয়ে রাখতে হবে। না হলে নষ্ট হয়ে যাবে, পরে বাদ দেওয়া ছাড়া উপায় থাকবে না।’
তিনি বলেন, মেকানিক বলছেন তেলে ভেজাল থাকার কারণে এসব সমস্যা হয়েছে। এখন কোন পাম্পের তেল ভালো সেটা বুঝবো কীভাবে। ভেজাল তেলের সরবরাহ বন্ধ হওয়া উচিত। সরকারের উচিত যারা এসবের সঙ্গে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে কঠোর হওয়া।’
রাজবাড়ীর বাসিন্দা শ্রাবণ রাজ। ব্যবহার করতেন টয়োটা করোলা এক্সিও মডেলের গাড়ি। প্রথম অবস্থায় প্রতি লিটার তেলে প্রায় ১৪ কিলোমিটার পথ যেতে পারতেন। তবে কয়েক বছর পর মাইলেজ কমতে শুরু করে। ৮ কিলোমিটারের বেশি চলে না। এছাড়াও গাড়িতে নানান রকম সমস্যা দেখা দিতে থাকে। তিনি বলেন, ‘প্রথমদিকে ভালোই চলতো। পরে মাইলেজ কমতে শুরু করে। নানান সমস্যা দেখা দেয়। গাড়ির ইঞ্জিন মিসফায়ার হতো। থ্রটল বডি ও ইনজেক্টরে কার্বন জমা হতো। আবার ইঞ্জিন ওভারহিট হতো। তেলে ভেজালের কারণেই এ অবস্থা হয়। পরে গাড়ি বিক্রি করে দিয়েছি।’
এমন অনেকেই আছেন যারা ভেজাল তেল ব্যবহারের কারণে ভুগছেন। সবাই হয়তো জানেনও না। যশোরের পারভেজ আলম। শোরুম থেকে নতুন বাইক কেনার সাত-আট মাস পরই ওভার ফ্লো (কার্বুরেটর বা ফুয়েল সিস্টেম থেকে অতিরিক্ত জ্বালানি বের হয়ে যাওয়া বোঝায়) শুরু হয়। সমস্যার সমাধান মেলেনি। মেকানিকের পরামর্শে বাইক বন্ধের সঙ্গে সঙ্গে তেলের চাবিও বন্ধ করে রাখতে হয়।
পারভেজ বলেন, ‘নতুন বাইকে এ সমস্যা দেখা দিয়েছে। সার্ভিসিং করিয়েছি, তাতেও সমাধান হয়নি। ভেজাল তেল ব্যবহার করায় এ সমস্যা শুরু হয়। মেকানিক তাই বলেছেন।’
মেকানিকের কাছে যেসব গাড়ি মেরামতের জন্য আসে সেগুলোর মধ্যে অনেক গাড়ির একই ধরনের সমস্যা থাকে। ভেজাল তেল ব্যবহারের কারণেই হয়েছে এমনটি। ঢাকার কাঁটাবনের মোটরসাইকেল মেকানিক মোজাফফর বলেন, ‘অনেকেই বাইকের ওভার ফ্লো সমস্যা নিয়ে আসে। ঠিক করে দেই, কিছুদিন পরে আবারও একই সমস্যা দেখা যায়। এখন তেলে ভেজাল। এজন্য কার্বুরেটর নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।’
ভেজাল তেলে গাড়ির যেসব ক্ষতি হয়
ভেজাল তেলে মূলত পানি, রাসায়নিক দ্রব্য বা সস্তা তেল মেশানো থাকে। এটি ইঞ্জিনের জ্বালানি জ্বালানোর ক্ষমতা কমিয়ে কর্মক্ষমতা হ্রাস করে। ফলে মাইলেজ কমে যায় এবং শক্তি কমে ইঞ্জিন থ্রটল সঠিকভাবে কাজ করে না।
ইঞ্জিনের বেলন, পিস্টন ও স্পার্ক প্লাগে কালো কার্বন বা কালি জমতে থাকে। ভেজাল তেলে ময়লা ও অপরিষ্কার পদার্থ থাকলে ফুয়েল ইনজেক্টর ব্লক হয়ে যেতে পারে। ইনজেক্টরের ক্ষতি হলে জ্বালানি সঠিকভাবে ইঞ্জিনে পৌঁছায় না এবং স্টার্টিং সমস্যা, ধোঁয়া বা ঝোঁক কমে যাওয়া দেখা দিতে পারে।
ভেজাল তেল ঠিকমতো দহন না হওয়ায় অতিরিক্ত তাপ উৎপন্ন হয়। পানি বা অন্য নোংরা পদার্থ ইঞ্জিনের ধাতব অংশে ক্ষয় ঘটায়। ট্যাংকির ভেতর জং ধরা, পাইপ বা ইঞ্জিনের লুব্রিকেশন সিস্টেমেও ক্ষতি হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে, ভেজাল তেলের কারণে ইঞ্জিনের পারফরম্যান্স ও স্থায়িত্ব কমে যায়। বিশেষ করে মোটরসাইকেলের ক্ষেত্রে কার্বুরেটর নষ্ট হয়ে যাওয়ায় হঠাৎ বন্ধ বা স্টার্ট নিতে সমস্যা হয়। মাঝে মধ্যে কার্বুরেটর খুলে পরিষ্কার করলে গাড়ি চলাচলের উপযোগী হলেও দীর্ঘমেয়াদে কার্বুরেটর পরিবর্তন করার প্রয়োজন হয়।
তেল চুরির পর ঘাটতি পূরণে মেশানো হয় ভেজাল
দেশে জ্বালানি তেল সরবরাহের একমাত্র রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। আমদানির পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি তেল পরিশোধনাগার, গ্যাস ফিল্ডের পরিশোধনাগার থেকে তেল সংগ্রহ করে প্রতিষ্ঠানটি। এসব তেল ডিলারদের মাধ্যমে বাজারে বিক্রি করে বিপিসির অধীন থাকা তিন সরকারি কোম্পানি পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা। সারা দেশে তেল সরবরাহ করতে তিন কোম্পানির সব মিলিয়ে ৪৭টি ডিপো আছে। অভিযোগ আছে, এর মধ্যে কিছু ডিপোয় ভেজাল মিশিয়ে তেল চুরি করা হচ্ছে। বেসরকারি পরিশোধনাগার থেকে নিম্নমানের তেল সংগ্রহ করারও অভিযোগ আছে তেল চুরি চক্রের বিরুদ্ধে। চুরি করা তেলের ঘাটতি পূরণে তেলে ভেজাল মেশায় এই অসাধু চক্র। আর এতেই ভোক্তা সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
দেশে জ্বালানি তেলের ডিলার ও পাম্প মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি মোহাম্মদ নাজমুল হক বলেন, ‘আমরা বিপিসিতে অনেকবার চিঠি দিয়েছি। আমাদের অভিযোগ দেওয়া ছাড়া আর কিছুই করার নেই। সরকার দেখবো, দেখছি কী হয় এই পর্যন্তই। পরে আর কিছু হয় না।’
তিনি বলেন, ‘আমরা ডিপো থেকে তেল সংগ্রহ করি। যেভাবে পাই ওভাবেই বিক্রি করি। ভোক্তা পর্যায়ে আমাদের গালি শুনতে হয়। বিএসটিআই কোয়ালিটি কোনোদিন দেখে না, শুধু মাপ-জোখ দেখে।’
সরকারের যুগ্মসচিব ও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) পরিচালক (অপারেশন্স ও পরিকল্পনা) ড. এ কে এম আজাদুর রহমান বলেন, ‘আমরা মোবাইল কোর্ট চলমান রেখেছি। আমাদের প্রায় আড়াই হাজার পেট্রোল পাম্প। নির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ পেলে স্যাম্পল নিয়ে টেস্ট করবো। দেখবো যে, ঘটনা সত্য কি না। লিখিত অভিযোগ দিলে অবশ্যই দেখবো।’
বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) সার্টিফিকেশন মার্কস উইংয়ের পরিচালক মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘পাম্পের তেলের মান নিয়ে আমরা টেস্ট করি। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ইনসিডেন্ট (ভেজাল) পাওয়া যাচ্ছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে দেখছি পাম্পের তেল ঠিক আছে, আবার কিছু ক্ষেত্রে ভেজাল পাচ্ছি। আমরা শোকজ করেছি, তারা জবাব দিয়েছে। তারা ডিপো থেকে তেল কেনে। কিন্তু ডিপো থেকে তো অনেকেই নেয়। তাহলে তার পাম্পের তেল খারাপ হচ্ছে কেন, অন্য পাম্পের তেল তো ভালো পাচ্ছি।’
তিনি বলেন, ‘এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কোনো অপরিশোধিত তেল আসছে কি না। এটা আমি জানি না। আমরা আবারও স্যাম্পল সংগ্রহ করে কাজ করবো।’
যা বলছেন যন্ত্রকৌশল বিশেষজ্ঞ
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) যন্ত্রকৌশল বিভাগের শিক্ষক ও সেন্টার ফর এনার্জি স্টাডিজের সাবেক পরিচালক প্রফেসর ড. মো. এহসান বলেন, ‘ভেজাল তেলের সমস্যা বাংলাদেশে নতুন না। এটা বহু বছর ধরে চলে আসছে। এখন ভেজাল কী মেশাবে তার ওপর নির্ভর করে। কোনো কোনো জিনিস আছে যেগুলো মেশালে ইঞ্জিনের ক্ষতি হয়।’
এই যন্ত্রকৌশল বিশেষজ্ঞ বলেন, “তেলের স্থানে তেলজাতীয় দ্রব্য, কনডেনসেট বা অন্য কিছু দিয়ে যখন পূরণ করা হয়, ওটা যখন বার্ন করে তখন কার্বনজাতীয় জিনিস জমা হতে থাকে। তখন ইঞ্জিন স্পার্ক করে না বা কাজ করে না। স্পিডে সমস্যা হয়। এজন্য খুলে পরিষ্কার করতে হয়। আবার ‘র’ ফুয়েল পিউরিফিকেশন করে সেটা ব্যবহারযোগ্য করা হয়। ‘র’ কিছু যদি ভেজাল হিসেবে মেশানো হয় তাহলে জং ধরতে পারে।”
তিনি আরও বলেন, ‘সাধারণত যে সব জায়গায় প্রোডাকশন কমে সেখানে ভেজাল মেশানো হয়। সাপ্লাই চেইনের (ডিপো, পরিবহন, খুচরা পর্যায়) বিভিন্ন জায়গায় ঘাটে ঘাটে মেশানো হয়। বিভিন্ন জায়গায় যে তেল চুরি হয় তখন মাপ পূরণের জন্য যা পারে মিশিয়ে দেয়। এটি একটি দীর্ঘ সমস্যা। সরকার এর আগে অনেক কমিটি করেছে। আলটিমেটলি ম্যানেজ করতে পারে না। কিন্তু সরকারও জানে এগুলো ঘটে।’
দিনশেষে ক্ষতিগ্রস্ত ভোক্তা: ক্যাব
কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা প্রফেসর ড. শামসুল আলম বলেন, বাংলাদেশের সেবামূলক কোনো রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানই তার দায়িত্ব ঠিকঠাক পালন করে না। জনগণের করের টাকায় যাদের বেতন হয় তারা কেউই জনগণের স্বার্থ সুরক্ষা করে না। ব্যবসায়ীদের দুর্নীতি, তাদের স্বার্থের কারণেই এগুলো টিকে থাকে। তারাই লাভবান হয়।’
তিনি বলেন, ‘প্রতিষ্ঠান আছে, তাদের প্রভাব নেই। তারা দায়িত্ব পালন করে না। এদের বিচার করার ক্ষমতা যদি রাষ্ট্রের না থাকে, এদের জবাব দিয়ে তার আওতায় আনার ক্ষমতা যদি রাষ্ট্রের না থাকে। প্রত্যেকটা সেক্টরের রেগুলেটর মন্ত্রণালয়। তারা রেগুলেটরি বা নজরদারির কাজ করে না। সুতরাং, যা হওয়ার তাই হচ্ছে।’
ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা আরও বলেন, ‘দিনশেষে ভোক্তাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, খেসারত দিচ্ছেন। দেশের জ্বালানি সংকট যেমন আছে, রাজনৈতিক সংকট তারচেয়েও বেশি। রাজনীতিবিদরা অধিকাংশই ব্যবসায়ী। রাজনীতিবিদরা ব্যবসায়ী হলে আর ব্যবসায়ীরা রাজনীতিবিদ হলে দেশের যে দুর্গতি হয় তাই হচ্ছে।’
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত 2019 - 2026 PassengerVoice | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Developed By Muktodhara Technology Limited.
পাবলিক মতামত