এলএনজিবাহী ট্যাংকারের ভাড়া বেড়েছে ৬৫০%

Passenger Voice    |    ১০:৪৫ এএম, ২০২৬-০৩-০৬


এলএনজিবাহী ট্যাংকারের ভাড়া বেড়েছে ৬৫০%

অল্প কয়েক দিনের ব্যবধানে আধুনিক এলএনজিবাহী ট্যাংকারের দৈনিক ভাড়া প্রায় ৬৫০ শতাংশ বেড়ে প্রায় ৩ লাখ ডলারে পৌঁছেছে। আন্তর্জাতিক শিপব্রেকিং প্রতিষ্ঠান ফার্নলেসের সর্বশেষ সাপ্তাহিক এলএনজি বাজার প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহে যেখানে একটি এলএনজি ক্যারিয়ার ভাড়া নিতে দৈনিক প্রায় ৪০ হাজার ডলার খরচ হতো, এখন সেই হার কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এ অস্বাভাবিক উত্থানের সবচেয়ে বড় ধাক্কা দ্রুতই পড়তে পারে এশিয়ার জ্বালানি বাজারে, যার প্রভাব বাংলাদেশেও অনুভূত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ কাতারের মোট এলএনজি রফতানির প্রায় ৮৫ শতাংশই সাধারণত এশিয়ার বাজারে আসে। বাংলাদেশের এলএনজি আমদানির বড় অংশও আসে দেশটি থেকে।

ফার্নলেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে ইউরোপগামী ১ লাখ ৭৪ হাজার ঘনমিটার ধারণক্ষমতার এলএনজিবাহী ট্যাংকারের দৈনিক স্পট চার্টার ভাড়া এখন প্রায় ৩ লাখ ডলারে পৌঁছেছে। মাত্র এক সপ্তাহ আগে এ ভাড়া ছিল প্রায় ৪০ হাজার ডলার। একই ধরনের উল্লম্ফন দেখা গেছে যুক্তরাষ্ট্র উপসাগর থেকে এশিয়ার বাজার, বিশেষ করে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান ও চীনের পথে চলা জাহাজগুলোর ভাড়ায়। গত ২৫ ফেব্রুয়ারি যেখানে এ রুটে ভাড়া ছিল প্রায় ৪২ হাজার ডলার, এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ডলারে। অস্ট্রেলিয়া থেকে এশিয়ার পথে এলএনজি পরিবহনের ভাড়াও বেড়ে প্রায় ২ লাখ ৫৫ হাজার ডলারে পৌঁছেছে।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, হঠাৎ এ উল্লম্ফনের প্রধান কারণ হলো মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা ও সম্ভাব্য সরবরাহ বিঘ্নের আশঙ্কা। বিশেষ করে ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে কাতার সাময়িকভাবে এলএনজি উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে। কিছু ক্রেতার সঙ্গে করা চুক্তির ক্ষেত্রে ‘ফোর্স মেজর’ ঘোষণা করেছে। যার অর্থ হলো মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা সংকটের কারণে তারা সাময়িকভাবে এলএনজি সরবরাহ করতে পারছে না এবং এ পরিস্থিতির কারণে তারা চুক্তিভঙ্গের আইনি দায় এড়াতে চাইছে।

একই সঙ্গে নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগে হরমুজ প্রণালি দিয়ে ট্যাংকার চলাচল কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। অথচ কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত মিলিয়ে বৈশ্বিক এলএনজি সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ জোগান দেয়। ফলে এ অঞ্চলের যেকোনো অচলাবস্থা দ্রুত বৈশ্বিক গ্যাস বাজারে প্রভাব ফেলতে পারে।

হরমুজ প্রণালি দিয়ে স্বাভাবিক জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় এলএনজি ট্যাংকারগুলোকে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্তের কেপ অব গুড হোপ ঘুরে যেতে হতে পারে। এতে ভ্রমণ সময় ও পরিবহন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সম্ভাব্য দীর্ঘ পথের এ প্রস্তুতিও বাজারে অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে। সাধারণত উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে এশিয়ায় এলএনজি সরবরাহ তুলনামূলক স্বল্প দূরত্বের পথেই সম্পন্ন হয়। এছাড়া হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল সীমিত থাকলে এশিয়ার ক্রেতাদের বিকল্প উৎস—যেমন যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া বা পশ্চিম আফ্রিকা—থেকে গ্যাস সংগ্রহ করতে হতে পারে। এতে ভ্রমণপথ দীর্ঘ হবে এবং জাহাজের চাহিদা দ্রুত বেড়ে যাবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এর সবচেয়ে দ্রুত প্রভাব পড়বে এশিয়ার বড় আমদানিকারক দেশগুলোর ওপর। কাতারের মোট এলএনজি রফতানির প্রায় ৮৫ শতাংশই সাধারণত এশিয়ার বাজারে যায়। এর প্রধান ক্রেতাদের মধ্যে রয়েছে চীন, ভারত, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ান। ফলে কাতারের সরবরাহ ব্যাহত হলে এ অঞ্চলের জ্বালানি বাজারে তাৎক্ষণিক চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বাংলাদেশেও এলএনজির বড় সরবরাহকারী দেশ কাতার। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের কারণে আগামী দুই-তিন সপ্তাহ যদি কাতারের এলএনজি উৎপাদন ও রফতানি কার্যক্রম বন্ধ থাকে, তাহলে বিকল্প হিসেবে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি সংগ্রহ করতে গেলে আর্থিকভাবে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

দেশে গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) হিস্যা দৈনিক ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট, যার বড় সরবরাহকারী কাতারের রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা কাতার এনার্জি। দেশে প্রতি বছর যে পরিমাণ এলএনজি আমদানি হয় তার ৪০ শতাংশ সরবরাহ করে এ সংস্থা। দীর্ঘমেয়াদে হরমুজ দিয়ে পরিবহন বন্ধ থাকলে তা দেশের গ্যাস খাত থেকে শুরু করে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থায় বড় প্রভাব ফেলবে বলে জানিয়েছেন জ্বালানিসংশ্লিষ্টরা।

এরই মধ্যে এশিয়ার স্পট এলএনজি বাজারে মূল্যবৃদ্ধির ইঙ্গিতও দেখা যাচ্ছে। ব্লুমবার্গের তথ্য অনুযায়ী, সপ্তাহের শুরুতে এশিয়ায় এলএনজির স্পট মূল্য প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিটে প্রায় ২৫ দশমিক ৪০ ডলারে পৌঁছেছিল। পরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জ্বালানি ট্যাংকারকে রাজনৈতিক ঝুঁকি গ্যারান্টি ও নৌবাহিনীর নিরাপত্তা সহায়তা দেয়ার ঘোষণা দিলে দাম কিছুটা কমে প্রায় ২৩ দশমিক ৮০ ডলারে নেমে আসে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এ সামান্য কমতির পরও এলএনজির বর্তমান দাম সংঘাত শুরুর আগের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ অবস্থানে রয়েছে। ফলে জাহাজের ভাড়া ও গ্যাসের দাম দুই ক্ষেত্রেই অস্বাভাবিক চাপ তৈরি হওয়ায় এশিয়ার জ্বালানি বাজার দ্রুত অস্থির হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।


প্যা.ভ.ম