শিরোনাম
Passenger Voice | ১০:৩১ এএম, ২০২৬-০৩-০৬
বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহে বড় সংকট তৈরির পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে। এমন অবস্থায় বাংলাদেশকেও সামনের দিনে জ্বালানি সংকট মোকাবেলা করতে হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এরই মধ্যে সরকারিভাবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ে বৈদ্যুতিক বাতি, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত যন্ত্রাংশ (এসি) ব্যবহার কমিয়ে আনা, আলোকসজ্জা পরিহারসহ নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। সেই সঙ্গে গ্যাস সাশ্রয়ের লক্ষ্যে পাঁচটি সার কারখানা সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। জাতীয় গ্রিডে এরই মধ্যে এলএনজির সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে পেট্রোবাংলা। সেই সঙ্গে বিদ্যুৎ কেন্দ্রেও গ্যাসের সরবরাহ কিছুটা কমানো হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে জ্বালানি আমদানিতে সংকট তৈরি হওয়ায় জ্বালানি পণ্যে রেশনিং করার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) ও পেট্রোবাংলার কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
দেশে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ের লক্ষ্যে গতকাল মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। জারি করা নির্দেশনাপত্রে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় জাতীয়ভাবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয় প্রয়োজন। এজন্য সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, সংবিধিবদ্ধ সংস্থা ও করপোরেশনসহ সব অফিসে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্বশীল আচরণ করার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের ওই নির্দেশনায় দায়িত্বশীল আচরণের অংশ হিসেবে দিনের বেলায় পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক আলো থাকলে বৈদ্যুতিক বাতির ব্যবহার পরিহার করা, এসির তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার ওপরে রাখা, অফিসে অতিরিক্ত ফ্যান ও অন্যান্য বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার কমিয়ে ফেলাসহ সব ধরনের আলোকসজ্জা পরিহারের কথা বলা হয়েছে। এছাড়া গাড়ির ব্যবহার সীমিত করার পাশাপাশি জ্বালানি খরচ হয় এমন যানবাহন ও যন্ত্রাংশ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়ার কথা তুলে ধরা হয়েছে।
দেশে গ্যাসের ৬০ শতাংশের বেশি ব্যবহার হয় বিদ্যুৎ ও সার কারখানায়। এরই মধ্যে আটটি সার কারখানার পাঁচটি বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। কারখানাগুলোর কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মূলত গ্যাসের ব্যবহার কমাতে সরকারের পক্ষ থেকে সাময়িকভাবে এসব কারখানা বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে।
জানা গেছে, জ্বালানি সংকটের কারণে পাঁচটি ইউরিয়া সার কারখানার মধ্যে চারটি এবং কাফকো বন্ধ করা হয়েছে। বর্তমানে শাহজালাল ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড, টিএসপি কমপ্লেক্স লিমিটিড ও ডিএপি ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড চালু রয়েছে।
বিষয়টি নিশ্চিত করে বিসিআইসির উৎপাদন ও গবেষণা বিভাগের পরিচালক (যুগ্ম সচিব) মো. মনিরুজ্জামান বলেন, ‘শাহজালাল ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেডটি চালু আছে। বাকি ইউরিয়া সার কারখানাগুলো বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে ডিএপি এবং টিএসপি কারখানা দুটি চালু রয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে সার কারখানা বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে। আমরা বন্ধ রেখেছি। আপাতত ১৫ দিনের কথা বলা হয়েছে।’
বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়ার জন্য অনুরোধ জানিয়ে জনগণের সহযোগিতা কামনা করেছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়। ৪ মার্চ মন্ত্রণালয়ের পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অস্থিরতার কারণে সারা বিশ্বে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটছে। এর ফলে অনিবার্যভাবে দেশের জ্বালানি খাতেও সাময়িক সংকট তৈরির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। জ্বালানি সংকটের কারণে রোজার মাসে জনদুর্ভোগ এড়াতে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনে কয়েক দফা নির্দেশনা দিয়েছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়। এতে বলা হয়, সব ধরনের আলোকসজ্জা পরিহার এবং ব্যক্তিগত যানবাহন ব্যবহার কমিয়ে গণপরিবহন ব্যবহারের অনুরোধ জানানো হচ্ছে।
বিজ্ঞপ্তিতে আরো বলা হয়, খোলাবাজারে ডিজেল, পেট্রল বিক্রি না করার জন্য ব্যবসায়ীসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে তৎপর হতে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশকে জ্বালানি পাচার রোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য এরই মধ্যে অনুরোধ জানানো হয়েছে।
জ্বালানি সংকট পরিস্থিতি মোকাবেলায় গত ৪ মার্চ শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে জরুরি সভা করেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। সভায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতও উপস্থিত ছিলেন। সভা শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে বিদ্যুৎ মন্ত্রী জানান, বর্তমান পরিস্থিতি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের চেয়ে বড়। সবাই সহযোগিতা না করলে বিরাট সংকট থেকে উত্তরণ করা কঠিন। যা আছে, তার সাশ্রয়ী ব্যবহার করতে হবে। খোলাবাজার থেকে বাড়তি জ্বালানি কেনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তবে তেমন সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। তাই সংকটের ব্যবস্থাপনা এখন প্রধান কাজ। সাশ্রয়ী ব্যবস্থাপনা করা গেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে। ঈদের ছুটির সময়ে শিল্প-কারখানার কার্যক্রম কমে গেলে বিদ্যুতের চাহিদাও কমবে, ফলে চাপ কিছুটা হ্রাস পাবে।
দেশের জ্বালানি তেল চাহিদার পুরোটাই প্রায় আমদানিনির্ভর। মধ্যপ্রাচ্য, চীন, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া থেকে জ্বালানি তেল সংগ্রহ করে বাংলাদেশ। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে জ্বালানি রফতানিকারক বড় দেশগুলোও সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি তেল সংগ্রহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় চীন পরিশোধিত জ্বালানি তেল ডিজেল ও পেট্রলের রফতানি কার্যক্রম স্থগিত করেছে। ব্লুমবার্গের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে সংকটের আশঙ্কা দেখা দেয়ায় চীন তার বৃহত্তম তেল শোধনাগারগুলোকে ডিজেল ও পেট্রল রফতানি সাময়িকভাবে স্থগিত করার নির্দেশ দিয়েছে।
চীন মূলত তেল আমদানির ওপর নির্ভরশীল একটি দেশ এবং এশিয়ার অন্যান্য বড় অর্থনীতির মতোই জ্বালানি সরবরাহের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিকে ব্যবহার করে। বর্তমানে এ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ থাকায় জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে বলে ব্লুমবার্গের প্রতিবেদনে জানানো হয়। জ্বালানি বাজার বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সমুদ্রপথে চীনের আমদানি করা অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৫৭ শতাংশই এসেছে মধ্যপ্রাচ্য থেকে।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে দেশের জ্বালানি সরবরাহে প্রভাব পড়বে এটা সহজেই অনুমেয়। এমনকি এ যুদ্ধ দীর্ঘমেয়াদে চললে বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাপনা ঝুঁকির মধ্যে পড়বে তাতে কোনো সন্দেহ নেই বলে মনে করেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা। তবে এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় জরুরি ভিত্তিতে পদক্ষেপও নিতে হবে বলে জানান তারা।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, ‘জ্বালানি আমদানির উৎসগুলোতে যেহেতু সরবরাহ সংকট তৈরি হয়েছে, সে কারণে বিকল্প উৎসগুলোর সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রেখে পণ্য পাওয়ার চেষ্টা চালাতে হবে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ে এখন থেকেই কাজ শুরু করতে হবে। প্রয়োজনে এখন থেকেই কিছুটা লোডশেডিং করা যেতে পারে।’
দেশে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট। সেখানে বর্তমানে সরবরাহ দেয়া হয় ২৬৫ কোটি ঘনফুটের কিছু বেশি। এর মধ্যে এলএনজি সরবরাহ ৯৫ কোটি ঘনফুট। দীর্ঘমেয়াদে কাতার ও ওমান ছাড়াও স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কার্গো এনে গ্রিডে সরবরাহ দেয়া হয়। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে বৃহৎ এলএনজি সরবরাহকারী দেশ কাতারের উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। এতে বিশ্বব্যাপী এলএনজির দামে উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে। স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কার্গো আমদানি বাড়িয়ে সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা যাবে—এমন পরিস্থিতিও নেই এ মুহূর্তে।
দেশে জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে সাধারণ মানুষের উদ্বেগের চিত্র দেখা গেছে রাজধানীর পেট্রল পাম্পগুলোতে। জ্বালানি তেলের ডিপোতে পাম্প থেকে তেল নিতে আসা ট্রাকের দীর্ঘ সারি তৈরি হয়েছে। এ কারণে পাম্পগুলোতে যথাসময়ে তেল পৌঁছাতে পারছে না বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা। সাধারণ মানুষ এক ধরনের আতঙ্ক থেকে পাম্পে জ্বালানি তেল নিতে আসছে এবং বাড়তি তেল কিনছেন। এজন্য পাম্পগুলোতে মজুদ দ্রুত খালি হয়ে যাচ্ছে। রাজধানীর নীলক্ষেত, তেজগাঁও, আসাদগেট, পরীবাগ, গুলিস্তান ও মতিঝিলের বেশ কয়েকটি পাম্প ঘুরে দেখা গেছে সেখানে ব্যক্তিগত গাড়ি, মোটরসাইকেলের দীর্ঘ সারি তৈরি হয়েছে। অনেক পাম্প জ্বালানি তেল না থাকায় সেবা বন্ধ রেখেছে।
রাজধানীর নীলক্ষেতের কিউজিএস সামদানি পেট্রল পাম্পের ম্যানেজার বিশ্বপল বলেন, ‘জ্বালানি তেলের অতিরিক্ত চাহিদার কারণে আমাদের পাম্পের দুই দিনের মজুদ একদিনেই শেষ হয়ে গেছে। এখন জ্বালানি তেলের পরবর্তী চালান না আসা পর্যন্ত সরবরাহ দেয়া সম্ভব নয়।’ গত রাতে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত জ্বালানি তেল না থাকার কারণে পাম্পটি বন্ধ রাখে কর্তৃপক্ষ।
বিশ্বের ২০ শতাংশ জ্বালানি পণ্য সরবরাহ কার্যক্রমে ব্যবহার হয় হরমুজ প্রণালি। বর্তমানে এ জলপথ বন্ধ করে দিয়েছে ইরান। এতে শত শত জ্বালানিবাহী ট্যাংকার আটকে পড়েছে প্রণালিতে। দেশের গ্যাস সরবরাহের ৪৫ শতাংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। এছাড়া জ্বালানি তেলের বড় সরবরাহকারীও মধ্যপ্রাচ্য। সংঘাত ও যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি পণ্য আমদানিতে বড় প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছে। সূত্র বণিক বার্তা
প্যা/ভ/ম
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত 2019 - 2026 PassengerVoice | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Developed By Muktodhara Technology Limited.
পাবলিক মতামত