শিরোনাম
Passenger Voice | ১১:০৯ এএম, ২০২৬-০৩-০৪
সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের স্বেচ্ছাচারিতার কারণে দেশে শুরু হয় এলপি গ্যাসের সংকট। পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে তিনি আমদানির জন্য এলসি খোলার অনুমোদন দিতেন। অপছন্দের প্রতিষ্ঠানের এলসি খোলার আবেদন তিনি আটকে রাখতেন। চাহিদা অনুযায়ী এলপি গ্যাসের সরবরাহ নিশ্চত না হওয়ায় আজকের এই সংকট। গুটিকয়েক প্রতিষ্ঠানের হাতে বাজার ছেড়ে দেওয়ায় সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটেছে। তার এই সিদ্ধান্তের উচ্চ মাসুল দিতে হচ্ছে সর্বস্তরের মানুষকে। ব্যাহত হচ্ছে শিল্প উৎপাদনও। পিছিয়ে যাচ্ছে সার্বিক অর্থনীতি।
বাজারে এলপি গ্যাসের সংকট এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, ১২ কেজির গ্যাস সিলিন্ডার সরকার নির্ধারিত ১৩৪১ টাকায় মিলছে না। এখনো সিলিন্ডার প্রতি ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা বেশি গুনতে হচ্ছে ভোক্তাদের।
নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর পরিস্থিতি সামাল দিতে উদ্যোগ নিয়েছে। সেই লক্ষ্যে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির সম্প্রতি আমদানিকারকদের নিয়ে বৈঠক করেছেন। সেখানে আমদানিকারকরা জানিয়েছেন, এলসি খোলার অনুমতি দিলে এলপি গ্যাসের সংকট কেটে যাবে। ভোক্তারাও আগের মতো তা সরকার নির্ধারিত দামে কিনতে পারবেন। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
ডিলার ও খুচরা এলপি গ্যাস বিক্রেতারা জানান, কোম্পানি থেকে জানুয়ারি মাসের তুলনায় এলপি গ্যাসের সরবরাহ বাড়ানো হয়েছে। তবে সরবরাহ এখনো স্বাভাবিক হয়নি। নির্ধারিত দামে ১২ কেজির সিলিন্ডার ১৩৪১ টাকায় পাওয়া যায় না। ভোক্তারা জানান, এখনো তা ১৬০০ থেকে ১৮০০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। গ্যাসের সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়ার ব্যাপারে কোম্পানিগুলো দুষছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুরকে। তার স্বেচ্ছাচারিতায় এলপি গ্যাসসংকট দূর হচ্ছে না। দেশে হইচই পড়লেও ২২টি কোম্পানি এখনো গ্যাস আমদানির জন্য এলসি খুলতে পারছে না। শুধু ৪ থেকে ৫টি কোম্পানি এলপিজি আমদানি করতে পারছে। এ জন্য আমদানিও স্বাভাবিক হচ্ছে না। ডিলাররাও বলছেন, এলপি গ্যাস কোম্পানি থেকে কমিশন না দেওয়ায় বেশি দামেই বেচা-কেনা করতে হচ্ছে।
সমস্যা আসলে কোথায়? কেন সংকট দূর হচ্ছে না? এ ব্যাপারে ইউনিটেক্স এলপি গ্যাস লিমিটেডের পরিচালক সাকিব আহমেদ বলেন, ‘বাংলাদেশে এলপি গ্যাসের চাহিদা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। ২০২৩ সালে দেশে ১২ লাখ ৭০ হাজার মেট্রিক টন এলপি গ্যাস আমদানি ও বাজারজাত করা হয়। ২০২৪ সালে আরও বেড়ে ১৬ লাখ ১০ হাজারে ঠেকে। কিন্তু গত বছর হঠাৎ করে ১৪ লাখ ৬০ হাজার মেট্রিক টনে নেমে যায়। কয়েকটি কারণে এ অবস্থা হয়েছে। একসময় আমদানিতে শীর্ষে থাকা বসুন্ধরা এলপি গ্যাস কোম্পানি, ইউনিটেক্স এলপি গ্যাস কোম্পানি এলসি সংকটে পড়ে। কারণ হচ্ছে সরকার পরিবর্তন হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুর তাদের গ্যাস আমদানি করা বন্ধ করে দেয়। এ সময় মেঘনাসহ কয়েকটা কোম্পানি শীর্ষে চলে আসে। কিন্তু বাজারে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য আমরা মেঘনা গ্রুপ, পেট্রোম্যাক্স ও আইগ্যাস থেকে বেশি দামে কিনে ডিলারের মাধ্যমে তা বাজারে বিক্রি করি। এতে লাভ কমে যায়। আবার চাহিদামতো পাওয়া যাচ্ছে না। এর ফলে আমাদের সরবরাহও অর্ধেকে নেমে যায়। এ সুযোগে একশ্রেণির অসাধু ডিলার সুযোগটি নিচ্ছেন। বেশি দামে বিক্রি করছেন। ভোক্তাদের বেশি দাম গুনতে হচ্ছে।’
এই সংকট কীভাবে দূর হবে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বিএনপি সরকার গঠন করার পরই আমরা সব এলপি গ্যাস কোম্পানি থেকে বাণিজ্যমন্ত্রীর সঙ্গে গত বৃহস্পতিবার দেখা করেছি। তিনি সমস্যা জানতে চেয়েছেন। আমরা বলেছি, বাংলাদেশ ব্যাংক এলসি খোলার সুযোগ দিলে আমরা সবাই এলপি গ্যাস আমদানি করতে পারব। দেশের স্বার্থে, ভোক্তাদের স্বার্থে এটা করা দরকার। এটা করা হলে আগের মতোই সরবরাহ বাড়বে। ভোক্তারা নির্ধারিত দামে তা কিনতে পারবেন। এ ছাড়া কয়েকদিন ধরে ইরানের সঙ্গে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ শুরু হয়েছে। এর প্রভাব আমাদের ওপর পড়তে পারে। এটা ভেবে আমরা অনেকেই বিকল্প এলপি বাজারের খোঁজ শুরু করেছি।
বেক্সিমকো এলপি গ্যাস কোম্পানির মার্কেটিং প্রধান হাসানুল বারিও একই তথ্য জানান। তিনি বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বাংলাদেশ ব্যাংক ১০০ ভাগ ঋণ মার্জিন আরোপ করে। এর ফলে এলসি খোলা কঠিন হয়ে যায়। সরবরাহ একবারে কমে যায়। এতে সংকট দেখা দেয়। তার পরও আমরা বাজারে এলপি গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করিনি। আগের তুলনায় কম হলেও সরবরাহ করা হচ্ছে।’
এ ব্যাপারে লোয়াবের সহসভাপতি ও এনার্জি-প্যাক কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ হুমায়ুন রশিদ বলেন, ‘মাসে এলপিজির চাহিদা ১ লাখ ৩০ হাজার টনের মতো। ডিসেম্বরে আমদানি কম হয়েছে এটা সত্য। জানুয়ারিতে কিছুটা বাড়ে। তবে চাহিদার তুলনায় কম। তাই সংকট দূর করার জন্য এলপিজি অপারেটরস অব বাংলাদেশ (লোয়াব) থেকে বেশি করে আমদানির জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আবেদন করা হলেও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুর এলসি খোলার অনুমতি দেননি। জ্বালানি মন্ত্রণালয় থেকে চিঠি দেওয়ার পরও তার স্বেচ্ছাচারিতার কারণে বেক্সিমকো, বসুন্ধরাসহ ২২টি এলপি গ্যাস কোম্পানি গ্যাস আমদানি করতে পারেনি। তাই সংকট লেগেই আছে। তবে নতুন সরকারের বাণিজ্যমন্ত্রীর সঙ্গে আমরা মিটিং করে সমস্যার কথা জানিয়েছি। তিনি আমাদের সমস্যা শুনেছেন। সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন। তা কার্যকর হলে আশা করি সংকট কেটে যাবে।’
এ ব্যাপারে বাণিজ্যসচিব মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘কয়েক মাস ধরে এলপি গ্যাসের সংকট চলছে। নতুন সরকার দায়িত্ব নিয়েই সমাধানের জন্য এলপি গ্যাস কোম্পানির সঙ্গে বৈঠক করেছে। তাদের কাছে সমস্যার কথা জানতে চাওয়া হয়েছে। প্রায় সবাই বলেছে ব্যাংকে এলসি সমস্যার কথা। তাদের বক্তব্য আমলে নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকে এলসি খোলার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যাতে এলপি গ্যাসের সংকট দূর হয়।’
প্রতি মাসেই এলপি গ্যাস সিলিন্ডারের দাম নির্ধারণ করে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। মার্চ মাসেও ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ১৩৪১ টাকা নির্ধারণ করেছে। লোয়াব ও বিইআরসি বলছে, দেশে বর্তমানে এলপিজির চাহিদা বছরে কমবেশি ১৫ থেকে ১৬ লাখ টন। ডিলার ও খুচরা বিক্রেতারা তা বিক্রি করেন।
প্যা.ভ.ম
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত 2019 - 2026 PassengerVoice | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Developed By Muktodhara Technology Limited.
পাবলিক মতামত