শিরোনাম
Passenger Voice | ০৩:০৪ পিএম, ২০২৬-০৩-০৩
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক বা একীভূত করা ৫ ব্যাংকের আমানতকারীরা অতিপ্রয়োজনেও টাকা না তুলতে পারাসহ নানা ধরনের সংকটে ভুগছেন। দুই বছর ধরেই তারা এমন ভোগান্তির মধ্যে রয়েছেন। সবশেষ ভোগান্তি হিসেবে এসব ব্যাংকের আমানতকারীদের হিসাব থেকে আগে দেওয়া মুনাফা কেটে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। পরে আমানতকারীদের আন্দোলনের চাপে বাংলাদেশ ব্যাংকের সদ্য বিদায়ী গভর্নর আহসান এইচ মনসুর ৪ শতাংশ মুনাফা দেওয়ার ঘোষণা দেন। ফলে এসব ব্যাংকের আমানতকারীরা ২০২৪ ও ২০২৫ সালে তাদের স্থিতির ওপর ৪ শতাংশ হারে মুনাফা পাবেন। যদিও তারা ১২-১৪ শতাংশ মুনাফা পাবেন–এমন চুক্তিতেই আমানত রেখেছিলেন। এসব ব্যাংকের ৭৫ লাখ গ্রাহক হেয়ার কাট বাতিলের দাবি জানিয়ে এলেও তা এখনো কার্যকর হয়নি।
এমন বাস্তবতায় তারা নতুন সরকারের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছেন। যদিও নতুন সরকারের পক্ষ থেকে বিষয়টি নিয়ে এখনো কোনো কিছু বলা হয়নি। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান গত রবিবার অনুষ্ঠিত ব্যাংকার্স মিটিংয়ে বলেছেন, আগের গভর্নরের নেওয়া সংস্কার কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। এদিকে হেয়ার কাট সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাহার এবং এসব ব্যাংকে স্বাভাবিক লেনদেনের দাবিতে ৫ ব্যাংকের ভুক্তভোগী আমানতকারীরা আগামী বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দিয়েছেন।
যে ৫টি ব্যাংক একীভূত হয়েছে, সেগুলো হলো ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক। এই পাঁচ ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক নামে নতুন ব্যাংক গঠন করা হয়েছে।
আমানতকারীরা প্রত্যাশা করছেন, নিরঙ্কুশ বিজয়ের মাধ্যমে দেশে নতুন সরকার গঠিত হয়েছে। আগের গভর্নরকে সরিয়ে নতুন গভর্নরও নিয়োগ দিয়েছে সরকার। ফলে আগের গভর্নর যে অন্যায় সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, নতুন সরকার বা নতুন গভর্নর নিশ্চয়ই সেই অন্যায় মেনে নেবেন না। তারা বলেন, ব্যাংকে আমানত রাখাই পাপ হয়েছে। তারা তো বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদিত ব্যাংকেই আমানত রেখেছিলেন।
তারা বলেন, নতুন সরকার দায়িত্ব নিলেও এখন পর্যন্ত হেয়ার কাট বাতিলের ঘোষণা দেয়নি। জয়েন্ট অ্যাকাউন্টের মুনাফার টাকাও তারা তুলতে পারছেন না। তারা একসঙ্গে সব টাকা তুলে ফেলতে চাচ্ছেন না। শুধু স্বাভাবিক লেনদেন চাইছেন।
এ বিষয়ে এক্সিম ব্যাংকের গ্রাহক শাহানুর রহমান বলেন, ‘আমরা তো বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে জিম্মি হয়ে গেছি। এখন নতুন গভর্নর কাজে যোগ দিয়েছেন। তিনি নিশ্চয়ই আমাদের যৌক্তিক দাবি মেনে নেবেন।’
একই ব্যাংকের অন্য গ্রাহক মেহনাজ বেগম বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংক ধীরে ধীরে আমাদের মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আমার টাকা ব্যাংকে রেখেও আমি বাবার চিকিৎসার জন্য টাকা তুলতে পারছি না। তারা এখন বলছে আমি ঋণ নিতে পারব। আমি কেন আমার টাকা না তুলে ব্যাংকের ঋণ নেব?’
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ভুক্তভোগী ব্যাংক আমানতকারী অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যসচিব আলিফ রেজা বলেন, ‘বিদায়ী গভর্নর অন্যায়ভাবে আমাদের মুনাফার একটা অংশ কেটে রাখতে চাইছেন। যদিও এমন সিদ্ধান্তকে অর্থনীতিবিদ এবং শরিয়াহ আইন বিশেষজ্ঞরা অযৌক্তিক এবং আইনবহির্ভূত বলে মন্তব্য করেছেন। আমরা আশা করছি, নতুন গভর্নর বিষয়টি বিবেচনা করবেন এবং হেয়ার কাট পদ্ধতি বাতিল করবেন। এই লক্ষ্যে আমরা আগামী বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধনের আয়োজনের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’
আমানতকারীদের হিসাব থেকে হেয়ার কাটের নামে মুনাফা কাটার বিষয়টিকে অনৈতিক উল্লেখ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, ‘নৈতিকতার দিক থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা উচিত। কেননা যদি বাংলাদেশ ব্যাংকের বিবেচনায় ব্যাংকগুলো লস করার পরও মুনাফা দেয়, তাহলে এর দায় তো সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের পরিচালকদের, কোনোভাবেই তা বিনিয়োগকারীদের ওপর বর্তায় না। এটা একটা অনৈতিক সিদ্ধান্ত। এটা অনেকটা উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপানোর মতো অবস্থা। এই সিদ্ধান্ত বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বড় ধরনের বৈষম্য সৃষ্টি করবে। কারণ ব্যাংক হয়তো সব বিনিয়োগকারীকেই মুনাফা দিয়েছিল। এর মধ্যে যারা টাকাটা উঠিয়ে নিয়েছেন অথবা বন্ধ করে দিয়েছেন তাদের কাছ থেকে তো আর কাটার সুযোগ নেই। আর যারা নানাভাবে এখনো বিনিয়োগ বহাল রেখেছেন, তারা জরিমানার শিকার হবেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘যেহেতু ব্যাংকগুলো পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত, তাই এই দুই বছরে ব্যাংকগুলো মুনাফার ভিত্তিতে সরকারকে করও দিয়েছে। তাহলে সরকার কি সেটা ফেরত দেবে?’
এমন বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে নতুন গভর্নরকে বিষয়টি প্রত্যাহারের মাধ্যমে আমানতকারীদের ভোগান্তি কমানোর পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
একই বিষয়ে জানতে চাইলে অভিজ্ঞ ব্যাংকার ও গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান মো. নুরুল আমিন বলেন, ‘এতে বড় ধরনের বৈষম্য তৈরি হচ্ছে। এমনিতেই অনেক আমানতকারী নিজেদের জমাকৃত অর্থ নিজেদের প্রয়োজনে তুলতে পারছেন না। তার ওপর তাদের আমানত থেকে ২০২৪ ও ২০২৫ সালের মুনাফার একটা অংশ কেটে নেওয়া হবে। ফলে তারা মুনাফা থেকেও বঞ্চিত হবেন। আর যারা ইতোমধ্যে আমানত তুলে নিয়েছেন, তাদের মুনাফা তো আর কাটা সম্ভব হবে না। তারা সুবিধাপ্রাপ্ত হলেন। এখানে বড় ধরনের বৈষম্য তৈরি হচ্ছে। সব আমানতকারীর জন্য সমান বিচার হচ্ছে না। ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশের বাইরে গিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্ষমতাবলে অনেক সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। রেজল্যুশনে বলা আছে, বাংলাদেশ ব্যাংক সময়ে সময়ে বিভিন্ন বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে পারবে। সেই ক্ষমতাবলেই তারা নানা ধরনের বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে ব্যাংক পাঁচটি বড় অঙ্কের লোকসান করেছে। এ জন্য আমানতকারীরা এই দুই বছরের জন্য তাদের আমানতের বিপরীতে ৪ শতাংশ হারে মুনাফা পাবেন। যদিও ব্যাংকগুলোতে ৭ থেকে ৯ শতাংশ মুনাফার আমানত রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ৫ ব্যাংকে বর্তমানে ৭৫ লাখ আমানতকারীর প্রায় ১ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা জমা রয়েছে। তার বিপরীতে এসব ব্যাংকের ঋণ রয়েছে ১ লাখ ৯৩ হাজার কোটি টাকা, যার বড় অংশ ইতোমধ্যে খেলাপি হয়ে গেছে।
প্যা.ভ.ম
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত 2019 - 2026 PassengerVoice | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Developed By Muktodhara Technology Limited.
পাবলিক মতামত