শিরোনাম
Passenger Voice | ০২:৫০ পিএম, ২০২৬-০২-২৮
বিশ্বব্যাংকের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের (আইডিএ) ঋণ সহায়তায় জরুরি সেবা দিতে একটি নতুন প্রকল্প হাতে নিতে যাচ্ছে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ। প্রকল্পে নানা ধরনের পরামর্শক-সেমিনার-গবেষণা-প্রশিক্ষণ-সার্ভে খাত দেখিয়ে ব্যয় চাওয়া হয়েছে। পাশাপাশি গাড়ি ভাড়া খাতে ৪০ কোটি এবং ভ্রমণে ১২০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে পরিকল্পনা কমিশনের আর্থসামাজিক অবকাঠামো বিভাগ।
স্ট্রেনদেনিং হেলথ ইমার্জেন্সি প্রিভেনশন, প্রিপেয়ার্ডনেস, রেসপন্স অ্যান্ড রেজিলেন্স উইথ ওয়ান হেলথ অ্যাপ্রোচ’ শীর্ষক প্রস্তাবিত প্রকল্পে এ ব্যয় চাওয়া হয়েছে। প্রকল্পের ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা) নিয়ে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা করবে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হবে আইডিএ ঋণ সহায়তায়। আইডিএ তুলনামূলক কম সুদে ঋণ দেয়, যেখানে সার্ভিস চার্জ প্রায় শূন্য দশমিক ৭৫ শতাংশ এবং সুদহার প্রায় ১ দশমিক ২৫ শতাংশ। সব মিলিয়ে মোট সুদের হার প্রায় ২ শতাংশ। এছাড়া উত্তোলন না হওয়া অর্থের ওপর বছরে শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ কমিটমেন্ট ফি দিতে হয়। ঋণের গ্রেস পিরিয়ড পাঁচ বছর এবং পরিশোধের সময়সীমা ৩০ বছর।
তবে সম্প্রতি বিশ্বব্যাংকের পক্ষ থেকে সুদের হার ২ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যা প্রকল্প ব্যয় ও পরিশোধের চাপ বাড়াতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। প্রকল্পে বিশ্বব্যাংকের মোট ঋণ প্রস্তাব ধরা হয়েছে প্রায় ২ হাজার ৭৪৫ কোটি টাকা।
আর্থসামাজিক অবকাঠামো বিভাগের স্বাস্থ্য উইংয়ের যুগ্মপ্রধান মানস মিত্র বলেন, মাত্র প্রকল্পটির প্রস্তাবনা এসেছে পরিকল্পনা কমিশনে। এখনো পিইসি সভা হয়নি। তবে সামনে সভা হবে এজন্য একটি ওয়ার্কিং পেপার তৈরি করেছি। প্রকল্পে গাড়ি ভাড়া ব্যয় বাবদ ৪০ কোটি, এছাড়া ভ্রমণ ব্যয়সহ সব কিছু নিয়ে আলোচনা হবে। আমরা এটা জানতে চাইবো। তবে প্রকল্পটি একেবারে প্রাথমিক ধাপে আছে। এটা নিয়ে আলাপ-আলোচনা হবে। প্রকল্পটি নিয়ে আমরা প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ করেছি। সব ব্যয় নিয়ে আলোচনা হবে।’
প্রকল্পে গাড়ি ভাড়া খাতে ৪০ কোটি ও ভ্রমণ ব্যয়ে ১২০ কোটি টাকা প্রস্তাবের সমালোচনা করে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরি বলেন, ‘দেশে অনেক প্রকল্পেই মূল কাজের চেয়ে আনুষঙ্গিক খাতে ব্যয় বেশি হয়, যা নতুন কিছু নয়।’
তিনি বলেন, ‘অতীতে এমন প্রকল্পও দেখা গেছে যেখানে পরামর্শক, সেমিনার ও অন্যান্য খাতে ব্যয় থাকলেও মূল কার্যক্রমে গুরুত্ব কম ছিল। এসব ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাই বিভিন্নভাবে সুবিধাভোগী হন। প্রকল্পটি যেহেতু পরিকল্পনা কমিশনে গেছে, তাই সরকারের উচিত বিষয়টি কঠোরভাবে তদারকি করা, যাতে অযৌক্তিক ব্যয় অনুমোদন না পায়। যৌক্তিকভাবে সব কিছু ব্যয় করা উচিত।’
মুজেরি আরও বলেন, ‘এ ধরনের ভুল বারবার হলেও দায় নির্ধারণ বা শাস্তির নজির খুব কম। প্রকল্পের অর্থ যথাযথভাবে জনগণের কল্যাণে ব্যয় নিশ্চিত না হলে উন্নয়ন প্রচেষ্টা প্রশ্নবিদ্ধ হবে।’
প্রকল্পের মূল কার্যক্রম
প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে সংক্রামক ব্যাধির প্রাথমিক সতর্কতা ও নজরদারি ব্যবস্থার সহায়ক হবে। অগ্রাধিকারমূলক স্বাস্থ্য হুমকি প্রতিরোধ, স্থিতিস্থাপকতা ও প্রতিক্রিয়া উন্নত করা, স্বাস্থ্যের জরুরি অবস্থায় আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদার করা, কার্যকর প্রকল্প ব্যবস্থাপনা ও জ্ঞান ব্যবস্থাপনা বাস্তবায়নে সহায়তা করবে প্রকল্পটি। এছাড়া তিনটি মন্ত্রণালয়কে সহজতর পদ্ধতি ও দ্রুত তহবিল বরাদ্দের মাধ্যমে দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানাতে সক্ষম করবে।
প্রকল্পের উদ্দেশ্য
প্রকল্পটির উদ্দেশ্য একটি সহনশীল স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমে মহামারি প্রতিরোধ, প্রস্তুতির জাতীয় সক্ষমতা বাড়ানো ও প্রতিক্রিয়ার জন্য জাতীয় ক্ষমতা উন্নত করা।
মোট ব্যয়
প্রকল্পের মোট প্রস্তাবিত ব্যয় ২ হাজার ৯২৯ কোটি টাকা। প্রকল্পটি অনুমোদনের পরে চার বছর মেয়াদে বাস্তবায়িত হবে। প্রকল্পে বিশ্বব্যাংকের ঋণ ২ হাজার ৭৪৫ কোটি টাকা। প্রকল্পটি সারাদেশে বাস্তবায়িত হবে।
কোন খাতে কত ব্যয়
পরিকল্পনা কমিশন থেকে জানা যায়, প্রকল্পের পরামর্শক খাতে ব্যয় চাওয়া হয়েছে ৩২২ কোটি ৪৯ লাখ টাকা, যা মোট প্রকল্প ব্যয়ের ১১ শতাংশ। ৩৯৭ কোটি ৫ লাখ টাকার স্থানীয় আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণ খাতে ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে, যা মোট প্রকল্প ব্যয়ের ১৩ শতাংশ। এছাড়া ১২৭ কোটি ৬৯ লাখ টাকার সেমিনার ওয়ার্কশপ ব্যয় চাওয়া হয়েছে, যা মোট প্রকল্প ব্যয়ের ৪ দশমিক ২ শতাংশ। ৩০৯ কোটি টাকা আদার বিল্ডিং স্ট্রাকচার খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে। এর মাধ্যমে ওয়ান হেলথ অ্যাপ্রোচের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে দৃশ্যমান কি উপকার হবে, তা প্রকল্প প্রস্তাবনায় সুস্পষ্ট নয়, এ বিষয় বিস্তারিত ব্যাখ্যা চেয়েছে কমিশন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট ইউনিটের (পিএমইউ) ৮০ কোটি ৮৬ লাখ টাকার পরামর্শক, ৪৫ কোটি ৭০ লাখ টাকার প্রশিক্ষণ, ১০ কোটি ৯৮ লাখ টাকার সেমিনার ব্যয়, ২ কোটি টাকার গবেষণা এবং ২ কোটি টাকার সার্ভে ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে। অথচ কীভাবে ওয়ান হেলথ অ্যাপ্রোচ কার্যকর বাস্তবায়নে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে তার কোনো ব্যাখ্যা প্রকল্পে নেই। একইভাবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রজেক্ট ইমপ্লিমেন্টেশন ইউনিটে ১৩৪ কোটি টাকার পরামর্শক, ১৬৩ কোটি ৫৬ লাখ টাকার প্রশিক্ষণ, ১০২ কোটি ৪০ লাখ টাকার সেমিনার, ২৭ কোটি টাকার গবেষণা এবং ১২ দশমিক ৬৭ কোটি টাকার সার্ভে' ব্যয় ধরা হয়েছে। এ ব্যয় প্রস্তাবের যথার্থতা নিয়ে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে।
আরও একটি অংশে ৫৪ কোটি ৭১ লাখ টাকার পরামর্শক ব্যয়, ১৩২ কোটি ৪৬ লাখ টাকার প্রশিক্ষণ, ৯ কোটি ৬৮ লাখ টাকার সেমিনার এবং ৭৩ কোটি ৬৪ লাখ টাকার সার্ভে ব্যয় চাওয়া হয়েছে। এ ব্যয় প্রস্তাবের যৌক্তিকতা খুঁজে পাচ্ছে না কমিশন। ফলে এই বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাছে। প্রকল্পের বন অধিদপ্তর অংশে ৫২ কোটি ৯১ লাখ টাকার পরামর্শক ব্যয়, ৫৫ কোটি ৭৮ লাখ টাকার স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণ, ৩ কোটি ৬৬ লাখ টাকার পিএইচডি প্রোগ্রাম, আড়াই কোটি টাকার পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ডিপ্লোমা, ৪ কোটি ৬৩ লাখ টাকার ওয়ার্কশপ, ৪ কোটি ৬৮ লাখ টাকার সার্ভে ইত্যাদি খাতের ব্যয় চাওয়া হয়েছে। যার কোন যৌক্তিকতা খুঁজে পাচ্ছে না কমিশন। প্রকল্পে ক্রস বর্ডার সার্ভিলেন্স প্রিভেনশন বাস্তবায়নে ৪৬ কোটি ৩৬ লাখ টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে, এর আওতায় কি কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে তার ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় মেডিসিন অ্যান্ড ভ্যাকসিন খাতে ১২৩ কোটি ৫২ লাখ টাকা, আদার বিল্ডিং অ্যান্ড স্ট্রাকচার খাতে ১২৮ কোটি ৮৬ লাখ, ল্যাবরেটরি ইকুইপমেন্ট খাতে ২৬০ কোটি টাকা চাওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানায়, প্রকল্পের কার্যক্রম বাংলাদেশের বিভিন্ন ভৌগোলিক অঞ্চলকে অন্তর্ভুক্ত করবে এবং এর প্রভাব দেশজুড়ে তথা প্রতিবেশী দেশগুলোতেও বিস্তৃত হবে। তবে, মহামারি প্রতিরোধ, প্রস্তুতি এবং প্রতিক্রিয়ার জন্য প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য জরুরি সেবা দেওয়ার উদ্দেশে তিনটি খাতের (মানব, প্রাণী ও পরিবেশ) জরুরি ল্যাবরেটরি সক্ষমতা স্থাপন উন্নয়ন আধুনিকায়ন উন্নীতকরণ এবং একটি কার্যকর ল্যাবরেটরি নেটওয়ার্ক গঠনের লক্ষ্যে কিছু নির্দিষ্ট স্থানে প্রকল্পের কার্যক্রম বাস্তবায়িত হবে। তবে প্রকল্পের সমীক্ষা প্রতিবেদন কোনো সংস্থার মাধ্যমে করা হয়েছে তা সুস্পষ্ট নয়, সমীক্ষণ প্রতিবেদনে প্রকল্পের যথার্থতা পরিসংখ্যানের মাধ্যমে অথবা তুলনামূলক বিশ্লেষণের মাধ্যমে উপস্থাপন করা জরুরি। বাংলাদেশ ছাড়াও আঞ্চলিক আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নয়ন সহযোগীর প্রকল্প ঋণের মাধ্যমে এ ধরনের প্রকল্প নেওয়া হয়েছে কি না তার তথ্য জানতে চেয়েছে কমিশন।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর
একটি সহনশীল প্রাণিস্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমে মহামারি প্রতিরোধ, প্রস্তুতি ও সাড়া দেওয়ার জাতীয় সক্ষমতা বাড়ানো। প্রধান লক্ষ্য হলো: টেকসই রোগ নির্ণয় সক্ষমতা নিশ্চিত করতে জাতীয় ল্যাবরেটরি নেটওয়ার্কের উন্নয়ন, খাদ্য শৃঙ্খলের সর্বস্তরে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালীকরণ, নজরদারি, আগাম সতর্কতা, মহামারি প্রস্তুতি ও সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা জোরদার করা ও মহামারি প্রতিরোধ, প্রস্তুতি ও সাড়া দেওয়ার আঞ্চলিক সহযোগিতা উন্নয়ন।
বাংলাদেশ বন বিভাগ
প্রাণিজ উৎসজনিত রোগ নির্মূল বা নিয়ন্ত্রণে জাতীয় সক্ষমতা বৃদ্ধি করা। একটি সহনশীল বন্যপ্রাণী স্বাস্থ্য ও নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমে মহামারি প্রতিরোধ, প্রস্তুতি ও সাড়া দেওয়া।
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত 2019 - 2026 PassengerVoice | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Developed By Muktodhara Technology Limited.
পাবলিক মতামত