রমজানে মাতুয়াইলে পুড়ছে বর্জ্যধোঁয়ায় আক্রান্ত লাখ লাখ মানুষ

Passenger Voice    |    ১১:০৪ এএম, ২০২৬-০২-২৮


রমজানে মাতুয়াইলে পুড়ছে বর্জ্যধোঁয়ায় আক্রান্ত লাখ লাখ মানুষ

রমজান মাস চলছে। সন্ধ্যা হলেই যাত্রাবাড়ীর মাতুয়াইলসহ আশপাশের কয়েক কিলোমিটার এলাকা কুয়াশাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। প্রথম প্রথম মানুষ মনে করেছিল, শীতের কারণে কুয়াশা পড়েছে। কিন্তু রাত যত গভীর হয়, কুয়াশারূপী সাদা-কালো ধোঁয়া মানুষের ঘরে ঘরে ঢুকে পড়ে। তাতে পোড়া উৎকট গন্ধ। সেই সাথে ধোঁয়ার তীব্রতা এতটাই যে, নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। চোখ জ্বালাপোড়া তরে। ঘরে ঘরে এই ধোঁয়া নিয়ে অস্বস্তিকর পরিবেশে মানুষ ইফতারি করছে। রাতে আবার সাহরি খেতে হয়। ঠিক তখনই মানুষ ধোঁয়ার জ্বালায় অস্বস্তিকর পরিবেশে সাহরি করছে। রমজান মাসে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) আওতাধীন মাতুয়াইল ল্যান্ডফিলে আগুন লাগিয়ে বর্জ্য পোড়াচ্ছে। সন্ধ্যার পর বিশালাকার বর্জ্যরে স্তূপে জ্বালিয়ে দেয়া হয় আগুন। রাত যত গভীর হয়, ধোঁয়ার তীব্রতা ততই বাড়তে থাকে। এলাকাবাসী জানান, এই ধোঁয়া ডেমরা, কোনাপাড়া, যাত্রাবাড়ী, জুরাইনসহ পার্শ্ববর্তী এলাকা ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়ে রাজধানীর মতিঝিল পর্যন্ত। এতে শ্বাস-প্রশ্বাসের কষ্টে ভুগছে ওইসব এলাকার বাসিন্দারা। বিশেষ করে শিশু, বৃদ্ধ, শ্বাসকষ্টের রোগী ও অসুস্থ ব্যক্তিদের জন্য এটি এতটাই ভয়ঙ্কর যে, অনেকে ঘর থেকে বেরিয়ে ছাদে অথবা খোলা রাস্তায় গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন।

এদিকে, রাজধানী ঢাকা আবারো বিশ্বে বায়ুদূষণের শহরের তালিকায় শীর্ষে ঊঠে এসেছে। বায়ুর মান পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্সের (আইকিউএয়ার) সূচক অনুযায়ী, গতকাল শুক্রবার ২৯৮ স্কোর নিয়ে ঢাকা দূষণের শহর হিসেবে প্রথম স্থানে রয়েছে। দূষণের এ মান খুবই অস্বাস্থ্যকর। পাকিস্তানের লাহোরের দূষণ স্কোর ২১১ নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। এরপর রয়েছে ভারতের দিল্লি। এই শহরটির দূষণ স্কোর ১৮৬, অর্থাৎ সেখানকার বায়ু খুবই অস্বাস্থ্যকর পর্যায়ে রয়েছে।

বর্জ্যরে স্তূপের ধোঁয়ার ভোগান্তি ডেমরা ও যাত্রাবাড়ীএলাকার কমপক্ষে ১৫ লাখ মানুষের অস্বস্তিতে ফেলেছে। তাদের মতে, এর একটা সুরাহা হওয়া দরকার। দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ইতোমধ্যে প্রশাসক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। তিনি হয়তো এখনো এই দূষণের কথা জানেন না। আবার বর্জ্য কর্মকর্তাও এর কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। ঢাকা-৪ ও ঢাকা-৫ এলাকার অন্তর্ভুক্ত ডেমরা-যাত্রাবাড়ী এলাকায় প্রায় আট কোটি ভোটারের বসবাস। এর সাথে পরিবারের অন্যান্য সদস্যও মিলে জনসংখ্যা হবে কমপক্ষে ১৫ লাখ। এই ১৫ কোটি মানুষের দুর্ভোগ দেখার যেন কেউ নেই। দনিয়া এলাকার বাসিন্দা মোজাম্মেল হক বলেন, কয়েক দিন ধরে অবস্থা খুবই খারাপ। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। অক্সিজেন পাওয়া যাচ্ছে না ঠিকমতো। সারাক্ষণ নাকে পোড়া গন্ধ লাগে। আসলে আমরা সাধারণ নাগরিকরা বিষে তিলে তিলে মরে যাচ্ছি, আমাদের কথা কোনো সরকারই ভাবছে না।

ল্যান্ডফিলে কর্মরত শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কয়েক দিন ধরে অল্প অল্প করে ল্যান্ডফিলের বর্জ্যে আগুন লাগা শুরু হয়। গত শুক্রবার থেকে আগুনের তীব্রতা বাড়ে। এতে ধোঁয়ার পরিমাণও বেড়ে যায়। আশপাশ এলাকাগুলোতে তা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। মাতুয়াইল ল্যান্ডফিলে ময়লার স্তূপের ওপর ভারী ধোঁয়ার কু-লী। এর মধ্যেই অল্প অল্প করে আগুন জ্বলছে। রাত গভীর হলে এর তীব্রতা বাড়ে। মানুষ যখন ঘুমাতে যাবে ঠিক তখনই ধোঁয়ার তীব্রতা বাড়ে। মাতুয়াইল মা ও শিশু হাসপাতালের একজন আবাসিক নার্স জানান, রাতে ধোঁয়ার কারণে হাসপাতালে ভর্তি নবজাতক বা প্রসূতিদের কষ্ট হচ্ছে। ইতোমধ্যে অনেকেই হাসপাতাল ছেড়ে চলে গেছেন। যাদের চিকিৎসা চলছে তাদের মধ্যে যাদের অবস্থা আশঙ্কাজনক তাদেরকে কেবিনে স্থানান্তর করা হয়েছে। এসি চালিয়ে তাদের চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।

ল্যান্ডফিলের ভেতরে থাকা একজন বলেন, আমরা এখানে ময়লা টোকাই। তিন দিন ধরে কাজে আসতে পারিনি। চোখ প্রচ- জ্বালা করে। আজকে বাধ্য হয়ে কাজে এসেছি। একদিন কাজে না এলেই তো খাওয়ার মতো পয়সা জোগাড় হয় না। ল্যান্ডফিলে বর্জ্য পোড়ানোর ধোঁয়া মাতুয়াইল, যাত্রাবাড়ী, ডেমরা, কোনাপাড়া, স্টাফ কোয়ার্টার, সাইনবোর্ড, মুগদা, মা-া, মানিকনগর, সায়েদাবাদ, মুরাদপুর, সরাইল, নূরপুর ও জুরাইন পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এলাকাবাসী সূত্রে জানা যায়, গত শনি ও রেবাবার রাতে আগুনের তীব্রতা অনেক বেড়ে যায়। ১০-২০ কিলোমিটার দূর থেকেও মাতুয়াইল ল্যান্ডফিলের বর্জ্যরে দাউ দাউ আগুনের লেলিহান শিখা দেখা যাচ্ছিল।

এদিকে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আগুনের ছবি ও এলাকাবাসীর দুর্ভোগের কথা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন জন তাদের পোস্ট ও মন্তব্যে জানান, তাদের নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বকুল নামে একজন ফেসবুক পোস্টে লেখেন, পুরো যাত্রাবাড়ী এলাকা ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন। ঘরের ভেতর বসেও শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।

পরিবেশবিদদের মতে, ল্যান্ডফিলে নিজ থেকে আগুন লাগার সুযোগ তেমন নেই। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্ট লোকেরা প্রথমে নিজেরা আগুন দেয় বর্জ্য পোড়ানোর জন্য। তারপর সেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে। আর এ বিষয়ে তাদের কিছু জিজ্ঞেস করলে তারা বলেন, আগুন নিজ থেকে লেগে গেছে। এটি অসম্ভব কথা। আমাদের দেশে ল্যান্ডফিলে পচনশীল আর শুকনো সব ধরনের বর্জ্য একসঙ্গে জমা হয়। সেখানে মিথেন গ্যাস উৎপন্ন হয়। কোনো সভ্য দেশে এভাবে জগাখিচুড়ি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নেই। ওই দেশগুলোতে বাসা থেকে বর্জ্য সংগ্রহের সময়ই পচনশীল আর অপচনশীল বর্জ্য আলাদা করে ফেলা হয়। এটি বর্জ্য ব্যবস্থাপনার প্রাথমিক কাজ। আজ এত বছরেও এ কাজটিও করতে পারছে না সরকার। কোনো উদ্যোগই নেয়া হয়নি।

নগর পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, সরকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ফেল করার কারণে সাধারণ মানুষ এখন ভুগছে। তারা ল্যান্ডফিলের আগুনের ধোঁয়ায় নিঃশ্বাস নিতে পারছে না। কিন্তু এ বর্জ্যরে মধু খাওয়ার জন্য তো রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা, কাউন্সিলররা, সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা কাড়াকাড়ি করেন। এ বর্জ্য দিয়েই তো সবার পকেট ভরে। কিন্তু জনগণকে কেন সেবা দেয়া হচ্ছে না, এটি আমাদের প্রশ্ন। সঠিকভাবে যদি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করা যেত, যদি এখানে দুর্নীতি, লুটপাট না হতো, তাহলে কিন্তু আমাদের বর্জ্য সম্পদে রূপান্তরিত হতো অনেক আগেই। নতুন সরকার এসেছে। আমরা আশা করব তারা জনস্বাস্থ্য বিবেচনায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনার প্রতি বিশেষ নজর দেবে। ল্যান্ডফিলে আগুন ও ধোঁয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, ল্যান্ডফিলের আগুন নেভানো হয়েছে, ধোঁয়া এখনো আছে, আমরা কাজ করছি।

অন্যদিকে, গত কয়েক বছর যাবত ঢাকার বায়ুদূষণ ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। ঘুমের মধ্যেও বিশুদ্ধ বাতাসে শ্বাস নিতে পারে না রাজধানীবাসী। ধোঁয়া-ধূলিকণায় ভারী হয়ে থাকে ঢাকার আকাশ-বাতাস। বায়ুমান সূচকে বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত বাতাসের শহরের তালিকায় নিয়মিত শীর্ষ দশে থাকে ঢাকার নাম। বায়ুমানের ধরনে বলা হয় ‘অস্বাস্থ্যকর’ কিংবা ‘খুবই অস্বাস্থ্যকর’।

শিল্প-কারখানার নির্গমন, যানবাহনের ধোঁয়া, নির্মাণকাজের বালু-ধুলা আর অধিক জনসংখ্যার ফলে ভয়াবহ হয়ে উঠেছে দেশের বায়ুমান। ঢাকায় যা অসহনীয় পর্যায়ে। এতে শ্বাসকষ্ট, ক্যান্সার, হৃদরোগসহ নানান জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে সব বয়সী মানুষ। সঠিক পরিকল্পনা ও সমন্বয়ের অভাবে দূষিত বাতাসে শ্বাস নিচ্ছে কোটি মানুষ।

বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় এক লাখ ৭৩ হাজার মানুষ বায়ুদূষণজনিত কারণে অকালে মৃত্যুবরণ করেন। এর মধ্যে মৃত্যু বেশি ঢাকায়। আন্তর্জাতিক বায়ুমান সূচক অনুযায়ী, শুষ্ক মৌসুমে ঢাকার বাতাসের মান ‘অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর’ থাকছে প্রতিনিয়ত।

দূষণ বিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান বায়ুম-লীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসের বায়ুদূষণ আগের আট বছরের জানুয়ারি মাসের গড় মানের তুলনায় ২৪ দশমিক ৫২ শতাংশ বেশি। আট বছরের (২০১৭-২৪) জানুয়ারি মাসের গড় দূষণের মান ছিল ২৫৫ দশমিক ৪৮। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে তা ছিল ৩১৮। আগের বছরের জানুয়ারিতে এটি ছিল ৩০২। বিগত ৯ বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাস বায়ুদূষণের দিক থেকে ছিল শীর্ষে। এছাড়া ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের বায়ুদূষণ আগের আট বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের গড় মানের তুলনায় ১৪ দশমিক ৭৪ শতাংশ বেশি ছিল। ফেব্রুয়ারিতে ঢাকার বায়ুর মান ছিল ২৬২। এটি ৯ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে এর মান ছিল ২৫৮। জানা যায়, বায়ুদূষণের প্রাকৃতিক কারণগুলোর মধ্যে আবহাওয়াজনিত ও ভৌগোলিক কারণগুলো অন্যতম। পাশাপাশি মানবসৃষ্ট কারণগুলোর মধ্যে নগর পরিকল্পনায় ঘাটতি, আইনের দুর্বলতা, আইন প্রয়োগের সীমাবদ্ধতা ও আন্তঃমন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ের অভাবকে অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করছেন পরিবেশবিদরা।