শিরোনাম
Passenger Voice | ০২:০৬ পিএম, ২০২৬-০২-২৭
অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এ শহরের সড়ক-মহাসড়কে এমন চাঁদাবাজির প্রভাব পড়ছে নিত্যপণ্যের দামে। শুধু নারায়ণগঞ্জেই নয়, সারা দেশের সড়ক কিংবা মহাসড়কের ৫৩৩টি স্পটে যানবাহন থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। পুলিশ সদর দপ্তরের প্রতিবেদনে নারায়ণগঞ্জসহ সারা দেশের সড়ক-মহাসড়কে চাঁদাবাজির এমন তথ্য উঠে এসেছে। শ্রমিক কিংবা মালিক সংগঠন, কোথাও পৌরসভার নাম ভাঙিয়ে চলছে এমন চাঁদাবাজি। জানা যায়, ক্ষেত্রবিশেষে এতে স্থানীয় প্রভাবশালীদেরও সমর্থন থাকছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ কালাদি মোড়ে সিএনজিচালিত অটোরিকশা থেকে ২০ টাকা হারে চাঁদা আদায় করা হয়। সাওঘাটায় সিএনজি ও লেগুনা, বরপা বাসস্ট্যান্ডে লেগুনা, তারাব বাজার ও চনপাড়ায় সিএনজিচালিত অটোরিকশা থেকে চাঁদা তোলা হয়। সিদ্ধিরগঞ্জের শিমরাইল আন্তঃজেলা ট্রাক টার্মিনালে ট্রাক, মিনি ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান; সাইলোগে আন্তঃজেলা ট্রাক, মিনি ট্রাক; কাভার্ড ভ্যানচালক শ্রমিক ইউনিয়নের কার্যালয়ের সামনে ট্রাক, মিনি ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান থেকে চাঁদা আদায় করা হয়। এছাড়া চিটাগং রোডে চাঁদা তোলা হয় বাস, লেগুনা, মাইক্রোবাস, সিএনজিচালিত অটোরিকশা থেকে। আদমজি ইপিজেডের সামনে বাস, ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান থেকে তোলা হয় চাঁদা। নারায়ণগঞ্জ সদর থানা এলাকার নিতাইগঞ্জ মোড়, নারায়ণগঞ্জ বাস স্ট্যান্ড, মেট্রো হল মোড়, চাষাঢ়া মোড়ে বিভিন্ন যানবাহন থেকে চাঁদা আদায় করা হয়।
নারায়ণগঞ্জের বন্দর থানা এলাকার দেউলী চৌরাপাড়া, নবীগঞ্জ মোড়, মদনপুর মোড়ে চাঁদা তোলা হয় প্রকাশ্যেই। এছাড়া ফতুল্লা মডেল থানা এলাকার সাইনবোর্ড, পঞ্চবটী মোড়, শিবু মার্কেটের সামনে, পাগলা, আড়াইহাজার চৌরাস্তা, মেঘনা টোল প্লাজা, মোগরাপাড়া চৌরাস্তা ও কাঁচপুরে নিয়মিত প্রকাশ্যে যানবাহনে চাঁদাবাজি হয়।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, শীতলক্ষ্যা নদীর পাড়ের শহর নারায়ণগঞ্জে তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন ধরনের শিল্প-কারখানা রয়েছে। পাশাপাশি জ্বালানি তেলের ডিপোও রয়েছে এ অঞ্চলে। নিয়মিত জাহাজ থেকে খালাস হওয়া পণ্য সংগ্রহ করতে নারায়ণগঞ্জে প্রতিদিন কয়েক হাজার ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান ও মিনি পিকআপ যাতায়াত করে। প্রতিটি যানবাহনকে বিভিন্ন অংকের চাঁদা দিয়ে নারায়ণগঞ্জের ২২ কিলোমিটার সড়ক অতিক্রম করতে হয়। চাঁদা না দিলে হামলা, ভাংচুরের মতো ঘটনা ঘটে। অভিযোগ রয়েছে, এসব ঘটনা মহাসড়কের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা থানা পুলিশ সদস্যদের সামনে হলেও কার্যত তারা ব্যবস্থা নিতে তৎপর থাকেন না। ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেও ফল পান না। বিশ্লেষকরা বলছেন, এভাবে যানবাহনে চাঁদাবাজির সরাসরি প্রভাব পড়ে ভোগ্যপণ্যের দামে। এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ব্যবসায়ী ও ক্রেতারা।
সারা দেশের সড়ক-মহাসড়কে অন্তত ৫৩৩ পয়েন্টে যানবাহন থেকে নিয়মিত চাঁদা তোলা হয়—এ তথ্য পুলিশ সদর দপ্তরের। এর মধ্যে নারায়ণগঞ্জের আলোচিত ৩২টি স্পটের বাইরে ঢাকা বিভাগে ২৯টি স্থানে যানবাহন থেকে চাঁদা আদায় করা হয়। আর ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকায় এমন স্পট ২৭টি।
চট্টগ্রাম বিভাগে ৩২ ও চট্টগ্রাম মহানগরের ৩৪টি স্থানে যানবাহন থেকে প্রকাশ্যে চাঁদাবাজি হয়। সিলেট বিভাগে চাঁদাবাজির তথ্য না থাকলেও মহানগরের ১৫টি স্থানে নিয়মিত যানবাহন থেকে চাঁদা আদায়ের কথা বলা হয়েছে পুলিশ সদর দপ্তরের প্রতিবেদনে। রংপুর বিভাগে ২২টি ও মহানগরে ২০টি পয়েন্টে বিভিন্ন ধরনের যানবাহন থেকে চাঁদা আদায় করা হয়। রাজশাহী বিভাগে ২৪টি ও মহানগরে সাতটি পয়েন্টে এবং বরিশাল বিভাগে ১৬টি ও মহানগরে চারটি স্থানে চাঁদাবাজি হয়। এর বাইরে ময়মনসিংহের চারটি, টাঙ্গাইলে ২৬ ও পাবনায় ২২টি পয়েন্টে নিয়মিত প্রকাশ্যে যানবাহন থেকে চাঁদা তোলা হয়।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, চাঁদাবাজি বা অবৈধ পন্থায় অর্থ আদায় যেকোনো দেশের অর্থনীতির জন্যই ক্ষতিকর। বিশেষ করে পণ্যবাহী পরিবহনে চাঁদাবাজির ফলে ভোগ্যপণ্যের দাম বেড়ে যায়। এর প্রভাব সরাসরি পড়ে বাজার ব্যবস্থাপনায়। পাশাপাশি এ ধরনের চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে স্থানীয় পর্যায়ে প্রতিনিয়ত সংঘাত-সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের মধ্যে চাঁদার অর্থ ভাগাভাগি নিয়ে সংঘাত-সংঘর্ষের ঘটনার কথা জানা যায়। দেশের সড়ক-মহাসড়কে এমন চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কঠোর অবস্থান নিতে হবে বলে মতপ্রকাশ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক। তিনি বলেন, যেকোনো দেশেই চাঁদাবাজি অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের হুমকি। বাণিজ্যিক যানবাহনে চাঁদাবাজির ফলে নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যায়, যার প্রভাব সরাসরি ভোক্তাপর্যায়ে পড়ে। আবার স্থানীয়ভাবেও অপরাধপ্রবণতা বেড়ে যায়। আধিপত্য বিস্তারের প্রবণতাও লক্ষ করা যায়। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কঠোরভাবে এ ধরনের অপরাধ দমনে ভূমিকা রাখতে হবে। চাঁদাবাজদের তালিকা করে নিয়মিত তাদের পর্যবেক্ষণ করতে হবে। পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের মাঝেও সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে।
সব ধরনের চাঁদাবাজি বন্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (গণমাধ্যম ও জনসংযোগ) এএইচএম শাহাদাত হোসাইন। তিনি বলেন, সড়ক-মহাসড়কের পাশাপাশি সারা দেশেই চাঁদাবাজি বন্ধে পুলিশের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ শক্ত অবস্থান নেয়া হয়েছে। এ ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গুরুত্বের সঙ্গে কাজ করছে। এজন্য যানবাহন শ্রমিক ও মালিকদের সঙ্গে নিয়মিত আলোচনা হচ্ছে। সবার সহযোগিতায় চাঁদাবাজির মতো অপরাধ রুখে দেয়া যাবে।
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত 2019 - 2026 PassengerVoice | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Developed By Muktodhara Technology Limited.
পাবলিক মতামত