শিরোনাম
Passenger Voice | ১২:৩৮ পিএম, ২০২৬-০২-২৪
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলে লোকোমোটিভ (ইঞ্জিন) সংকট দিন দিন ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। যাত্রী ও পণ্যবাহী ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক রাখতে যেখানে প্রতিদিন প্রয়োজন ১১৯টি ইঞ্জিন, সেখানে পাওয়া যাচ্ছে ৭৫ থেকে ৭৬টি। এই সংকটের কারণে একদিকে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও বিশ্রামের সুযোগ না পেয়ে দ্রুত নষ্ট হয়ে যাচ্ছে ইঞ্জিনগুলো, অন্যদিকে যাত্রী ও পণ্য পরিবহন ব্যবস্থায় সৃষ্টি হয়েছে বিপর্যয়।
ইঞ্জিন সংকটের প্রভাবে গত কয়েক বছরে চট্টগ্রাম-দোহাজারী, চট্টগ্রাম-নাজিরহাট, চট্টগ্রাম-কুমিল্লা ও চট্টগ্রাম-সিলেট রুটসহ একাধিক লাইনে লোকাল ও মেইল ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। এই ধারাবাহিকতায় এবার বন্ধের মুখে চট্টগ্রাম-জামালপুরগামী নাসিরাবাদ এক্সপ্রেস। ট্রেনটির প্রতি মাসে সাত-আট দিন করে যাত্রা বাতিল হচ্ছে। দিন দিন যাত্রা বাতিল বাড়ছে। রেলওয়ে নিয়ন্ত্রণ কক্ষ সূত্র জানায়, ইঞ্জিনের অভাবে ট্রেনটির যাত্রা সবচেয়ে বেশি বাতিল হচ্ছে। নতুন ইঞ্জিন না পাওয়া পর্যন্ত এ অবস্থা থেকে উত্তরণের উপায় নেই।
যাত্রী পরিবহন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার শঙ্কা
ইঞ্জিন সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়ছে সময়সূচিতে। প্রতিদিনই একাধিক ট্রেন এক থেকে দেড় ঘণ্টা দেরিতে ছাড়ছে। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে বিভিন্ন স্টেশনে যাত্রীরা বিক্ষোভ করছেন।
রেলওয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে পূর্বাঞ্চল রেলের যাত্রী পরিবহন ব্যবস্থা আরও ভেঙে পড়বে। পণ্য পরিবহনে যেখানে প্রতিদিন ১৫টি ইঞ্জন প্রয়োজন, সেখানে মিলছে পাঁচটি। একই সমস্যার কারণে প্রতিদিন একাধিক ট্রেন ছাড়ছে এক থেকে দেড় ঘণ্টা দেরিতে। এতে ক্ষুব্ধ যাত্রীরা।
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, একটি ইঞ্জিন ট্রিপ শেষ করার পর স্বাভাবিকভাবে ৪৫ মিনিট ফুয়েল ও মেইনটেনেন্স চেক, এরপর আরও ৪৫ মিনিট এলএম চেকিং এবং ৭২ ঘণ্টার পর ছয় ঘণ্টা পূর্ণ শাটডাউন রেখে পরীক্ষা করার নিয়ম থাকলেও তা মানা যাচ্ছে না। ফলে যেসব ইঞ্জিন আছে সেগুলোর আয়ুষ্কাল দ্রুত ফুরিয়ে আসছে।
কখনও ট্রেন ছাড়তে দেরি, কখনও যাত্রা বাতিল
ভোগান্তির কথা জানিয়ে কক্সবাজারের বাসিন্দা মো. গিয়াস উদ্দিন বলেন, ‘কক্সবাজার-চট্টগ্রাম রুটে চলাচল করা সৈকত এক্সপ্রেস ট্রেনটি রাত ৮টা কক্সবাজার থেকে ছাড়ার কথা থাকলেও বেশিরভাগ সময় দেরিতে ছাড়ে। কখনও এক থেকে তিন ঘণ্টা দেরিতেও ছাড়ছে। একইভাবে চট্টগ্রাম কক্সবাজার রুটে চলাচল করা প্রবাল এক্সপ্রেস বেশিরভাগ সময়ে দেরিতে ছাড়ছে। কখনও কখনও যাত্রা বাতিল করছে। ইঞ্জিন সংকটের কারণে এমনটাই হচ্ছে বলে জানিয়েছেন রেলওয়ে কর্মকর্তারা। এতে ভোগান্তি পোহাতে হয় যাত্রীদের।’
সংকট সমাধান না হলে যাত্রী পরিবহনে বড় প্রভাব পড়বে
চট্টগ্রাম রেলস্টেশনের ম্যানেজার আবু বকর সিদ্দিক বলেন, ‘পূর্বাঞ্চল ট্রেনে ইঞ্জিন সংকট আছে। এ কারণে চট্টগ্রাম-সিলেটসহ অন্যান্য রুটে ট্রেন ছাড়তে প্রায় সময়ই বিলম্ব হয়। অনেক সময় ট্রেনের যাত্রাও বাতিল করতে হয়। ইঞ্জিন সংকটের কারণে চট্টগ্রাম-জামালপুরগামী নাসিরাবাদ এক্সপ্রেস ট্রেনের যাত্রা সবচেয়ে বেশি বাতিল হচ্ছে। এতে যাত্রীরা ক্ষুব্ধ হলেও আমাদের কিছু করার নেই। কারণ ইঞ্জিন সংকট।’
এ ব্যাপারে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান যন্ত্র প্রকৌশলী সাদেকুর রহমান বলেন, ‘পূর্বাঞ্চলে প্রতিদিন ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক রাখতে ১১৯টির মতো ইঞ্জিন দরকার। কিন্তু এখন আমরা প্রতিদিন গড়ে ৭৫ থেকে ৭৬টি ইঞ্জিন পাই। মালবাহী ট্রেন থেকে ইঞ্জিন এনে কোনোরকমে সামাল দেওয়া হচ্ছে। ইঞ্জিন বেশি ব্যবহারের কারণে দ্রুত স্থায়িত্ব হারাচ্ছে। ইঞ্জিন সংকট সমাধান না হলে যাত্রী পরিবহনে বড় প্রভাব পড়বে।’
তিনি আরও বলেন, ‘যাত্রীবাহী ট্রেনে যতগুলো ইঞ্জিন চলছে, তার ৫০ শতাংশের বেশির আয়ুষ্কাল ফুরিয়ে গেছে। অর্থাৎ ২০ বছরের আয়ুষ্কাল পেরিয়ে গেছে। যে কারণে ইঞ্জিনে যান্ত্রিক ত্রুটি বেশি দেখা দিচ্ছে।’
একাধিক রুটে ট্রেন চলাচল বন্ধ
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল সূত্রে জানা গেছে, ইঞ্জিন সংকটের কারণে গত কয়েক বছর চট্টগ্রাম-দোহাজারী রুটে চলাচল করা দুই জোড়া লোকাল ট্রেন, চট্টগ্রাম-নাজিরহাট রুটে চলাচল করা দুই জোড়া লোকাল ট্রেন, চট্টগ্রাম-কুমিল্লা পর্যন্ত চলাচল করা ট্রেন ও চট্টগ্রাম-সিলেট রুটে চলাচল করা জালালাবাদ এক্সপ্রেসসহ একাধিক লাইনে লোকাল ও মেইল ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। যাত্রীবাহীর পাশাপাশি কনটেইনার ও তেলবাহী ট্রেন চলাচলেও দেখা দিয়েছে বিপর্যয়। প্রতিদিন যেখানে পণ্য পরিবহনে প্রয়োজন ১৩টি ইঞ্জিন, সেখানে মিলছে পাঁচটি। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ঢাকার কমলাপুর আইসিডিতে কনটেইনার পরিবহনের জন্য দরকার পাঁচটি, অথচ মিলছে একটি কিংবা দুটি ইঞ্জিন। একই সমস্যা দেখা দিয়েছে তেল পরিবহনেও।
বন্দরে কনটেইনারের স্তূপ
এদিকে, চট্টগ্রাম বন্দরে ঢাকার আইসিটিগামী কনটেইনারের জট আগের চেয়ে বেড়েছে। বর্তমানে এক হাজার ৩০০ কনটেইনারের স্তূপ জমে আছে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের পরিচালক (প্রশাসন) মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দর থেকে কনটেইনার আনা-নেওয়ার জন্য চাহিদামতো ট্রেনের ইঞ্জিন পাওয়া যাচ্ছে না। এ কারণে ঢাকার আইসিডিগামী কনটেইনারে জট সৃষ্টি হয়েছে। চট্টগ্রাম থেকে যেমন পাঠাতে দেরি হচ্ছে তেমনি ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে আনতেও দেরি হচ্ছে। প্রতিদিন অন্তত চার-পাঁচটি ইঞ্জিন প্রয়োজন। অথচ আমরা পাচ্ছি মাত্র এক থেকে দুটি। ইঞ্জিন বাড়ানোর জন্য রেলওয়ে কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার চিঠি দিয়েছি।’
ইঞ্জিনের বিশ্রাম নেই
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) মো. সুবক্তগীন বলেন, ‘পূর্বাঞ্চল রেলে চাহিদা অনুযায়ী ইঞ্জিন নেই। যেগুলো আছে সেগুলোকে যতটুকু সময় বিশ্রাম দেওয়া প্রয়োজন, তা দেওয়া যাচ্ছে না। কেননা একটি ট্রেন ট্রিপ শেষ করে আসার পর ওই ইঞ্জিন আরেকটি ট্রেনে লাগানো হচ্ছে। এভাবেই চলছে। ইঞ্জিন সংকটের কারণে নতুন করে ট্রেন বাড়ানো যাচ্ছে না। মন্ত্রণালয়ে ইঞ্জিনের চাহিদা দেওয়া হয়েছে। ইঞ্জিন কেনার বিষয়টি সরকারের উচ্চ মহলের ওপর নির্ভর করছে। ইঞ্জিন না বাড়লে সমাধান নেই।’
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত 2019 - 2026 PassengerVoice | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Developed By Muktodhara Technology Limited.
পাবলিক মতামত