স্টে-অর্ডারের সুযোগ নিচ্ছেন খেলাপিরা

Passenger Voice    |    ০১:০০ পিএম, ২০২৬-০২-২২


স্টে-অর্ডারের সুযোগ নিচ্ছেন খেলাপিরা

বিদ্যমান আইনে কোনো ঋণ ছয় মাস পরিশোধ না হলে তা খেলাপি হিসেবে গণ্য হওয়ার কথা। খেলাপি হলে নতুন ঋণ, আমদানি-রপ্তানি সুবিধা, এমনকি ব্যাংকের পরিচালক বা নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পথও বন্ধ থাকার বিধান আছে। কিন্তু উচ্চ আদালত থেকে স্থগিতাদেশ নিয়ে (স্টে-অর্ডার) অনেকেই ঋণ পরিশোধ না করেও নিয়মিত গ্রাহকের সব সুবিধা ভোগ করছেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশের কারণে প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকার ঋণখেলাপি দেখানো যাচ্ছে না। এক হাজারের অধিক গ্রাহক এই সুযোগ নিয়েছেন। এই ঋণ যোগ করলে ব্যাংক খাতে প্রকৃত খেলাপি ঋণ দাঁড়ায় প্রায় ৮ লাখ কোটি টাকা। এমন বাস্তবতায় আদালতের স্টে-অর্ডার নিয়ে এবার প্রাতিষ্ঠানিক সমাধানের পথে হাঁটছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, খেলাপি ঋণের ক্ষেত্রে স্টে-অর্ডার সংক্রান্ত সমস্যার আইনি ও নীতিগত দিক পর্যালোচনায় ‘ল’ কমিশনের সঙ্গে একটি সভা আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হবে। গত ডিসেম্বরে দেশের সব ব্যাংকের সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুষ্ঠিত ব্যাংকার্স সভায় এমন সিদ্ধান্ত হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, যেসব মামলায় উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ রয়েছে, সেগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য ব্যাংকগুলোকে আরও সক্রিয় হতে হবে। দ্রুত আবেদন করলে অনেক ক্ষেত্রে স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করা যায়।

অর্থনীতিবিদসহ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্টে-অর্ডারের আড়ালে থাকা বিপুল অঙ্কের এই ঋণ দেশের ব্যাংক খাতের সবচেয়ে জটিল ও সংবেদনশীল সংকট। দীর্ঘদিন ধরে চলা এই চর্চার ফলে একদিকে খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র আড়ালে থাকছে, অন্যদিকে এসব ঋণগ্রহীতা খেলাপি হয়েও নতুন ঋণ, এলসি সুবিধা ও অন্যান্য ব্যাংকিং সুবিধা পাচ্ছেন, যা সুশাসনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) সাবেক মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমেদ চৌধুরী বলেন, আমাদের দেশের ঋণখেলাপিরা খুব চতুর। দেখা যায়, যারা স্টে-অর্ডার নেন তাদের ঋণ পরিশোধ করার সক্ষমতা রয়েছে। অথচ স্টে-অর্ডারের সুযোগ নিয়ে তারা বছরের পর বছর নিয়মিত থাকছেন। আবার সহজেই ঋণ পুনঃতফসিল করেও নিয়মিত গ্রাহকের সব ধরনের সুবিধা নিচ্ছেন। এই সংস্কৃতির কারণেই ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ কমছে না। এই প্রবণতা রোধে নতুন কোনো

নিয়ম করার কথা ভাবতে হবে। আদালত থেকে স্টে-অর্ডার নিলে ঋণ ফেরত দেওয়ার কোনো কোনো বিধান যুক্ত করা যেতে পারে। কিংবা আদালত থেকে স্টে-অর্ডার নিলেও ব্যাংকের খাতায় ঋণের স্ট্যাটাস পরিবর্তন হবে না- এই বিধানও করা যেতে পারে।

ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী কোনো ঋণ ছয় মাস মেয়াদোত্তীর্ণ হলে তা খেলাপি হিসেবে বিবেচিত হয়। এ জন্য যে কোনো ঋণ বিতরণের আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঋণ তথ্য ব্যুরো (সিআইবি) থেকে যাচাই করতে হয়। তবে অনেকেই উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ নেওয়ার কারণে সিআইবিতে খেলাপি দেখানো হয় না। ফলে ঋণ পরিশোধ না করেও সব ধরনের সুবিধা পাচ্ছেন তারা। এ বিষয়ে গত ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত ব্যাংকার্স সভায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ড. কবির আহমদ জানান, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে যেখানে খেলাপি ঋণ ছিল ২০ দশমিক ২০ শতাংশ, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ। বর্তমানে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা। এর বাইরে আদালত কর্তৃক স্থগিতাদেশ প্রাপ্ত খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১ লাখ ৪৯ হাজার ৮৫৭ কোটি টাকা। তিনি আদালত কর্তৃক স্থগিতাদেশ প্রদানকৃত খেলাপি ঋণের ক্ষেত্রে দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানান।

সভায় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, স্টে-অর্ডারের বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে মহামান্য আদালতের এখতিয়ারাধীন। এই আইনি বাস্তবতার মধ্যেই কীভাবে খেলাপি ঋণ সংকটের টেকসই নিষ্পত্তি করা যায়, সে বিষয়ে সভায় উপস্থিত সবার সুচিন্তিত মতামত আহ্বান করেন তিনি।

গভর্নরের আহ্বানের পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাংকাররা স্টে-অর্ডার ইস্যুতে ‘ল’ কমিশনের সঙ্গে একটি যৌথ সভা করার প্রস্তাব দিলে তা গৃহীত হয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ, ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরো (সিআইবি) ও আইন বিভাগ এবিবির সঙ্গে সমন্বয় করে খেলাপি ঋণের ক্ষেত্রে স্টে-অর্ডার সংক্রান্ত সমস্যার আইনি ও নীতিগত দিক পর্যালোচনায় ‘ল’ কমিশনের সঙ্গে সভা আয়োজনের উদ্যোগ নেবে।

অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও দ্য সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিন  বলেন, খেলাপি ঋণের মামলা ও স্টে-অর্ডার ইস্যু নিয়ে আমরা ‘ল’ কমিশনের সঙ্গে একটি সভা আয়োজনের প্রস্তাব করেছিলাম। গভর্নর তাতে সায় দেন এবং শিগগির এ সংক্রান্ত একটি সভা আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। তবে ওই সভাটি এখনও হয়নি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য আদালতের স্বাধীনতা বা এখতিয়ারে হস্তক্ষেপ নয়; বরং এমন একটি কাঠামো তৈরি করা, যেখানে স্টে-অর্ডার থাকলেও ব্যাংক খাত অযৌক্তিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। কারণ, নিয়মিত দেখানো এসব ঋণ থেকে ব্যাংকের কোনো প্রকৃত আয় আসছে না।

এদিকে খেলাপিদের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা, নাম ও ছবি প্রকাশ, এমনকি ব্যবসায়ী সংগঠনের নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণার মতো কড়া প্রস্তাব দিয়ে গত মাসে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের কাছে চিঠি দিয়েছে এবিবি। চিঠিতে খেলাপি ঋণ কমানো এবং নগদ অর্থ আদায় জোরদার করতে একগুচ্ছ নীতিগত, আইনি ও প্রশাসনিক সংস্কারের প্রস্তাব করা হয়। এর মধ্যে চিঠিতে সিআইবি প্রতিবেদনের বিপরীতে উচ্চ আদালতের স্টে-অর্ডার দেওয়ার সুযোগ সীমিত করা, স্টে-অর্ডারে কিস্তিভিত্তিক উল্লেখযোগ্য অর্থ পরিশোধের শর্ত আরোপ এবং তা মানা না হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্টে বাতিলের বিধান চাওয়া হয়েছে।

বেশি খেলাপি অধ্যুষিত জেলায় পৃথক অর্থঋণ আদালত স্থাপন, আটকাদেশ দ্রুত বাস্তবায়ন এবং অর্থঋণ মামলায় ব্যক্তিগত হাজিরা ছাড়া মামলা পরিচালনার সুযোগ রহিত করার কথাও বলা হয়েছে। দেওয়ানি আটকাদেশের মেয়াদ ছয় মাসের পরিবর্তে ঋণের পরিমাণভেদে সর্বোচ্চ ৭ বছরে উন্নীত করার প্রস্তাবও করা হয়েছে। আইনি প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা খেলাপি ঋণ আদায়ের অন্যতম বড় বাধা বলেও মনে করে এবিবি। তাই খেলাপি ঋণগ্রহীতা ও জামানতদাতাদের ব্যাংক আমানত, সঞ্চয়পত্র, মালিকানাধীন সম্পদ, আয়কর রিটার্ন, ওয়ারিশ সনদ, জন্ম ও মৃত্যুসনদ এবং পাসপোর্ট-সংক্রান্ত তথ্য আদালতের হস্তক্ষেপ ছাড়াই দ্রুত পাওয়ার ব্যবস্থা চাওয়া হয়েছে। ব্যাংক বা আদালতের যে কোনো পদক্ষেপের বিরুদ্ধে আদালতে যাওয়ার আগে নির্দিষ্ট পরিমাণ ডাউনপেমেন্ট বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাবও রয়েছে।