শিরোনাম
Passenger Voice | ১০:৫৪ এএম, ২০২৬-০২-২০
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরবে—এমন প্রত্যাশায় দেশের ব্যবসায়ী সমাজে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে। বিশেষ করে বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার গঠনের পর নীতিগত পূর্বানুমানযোগ্যতা ও নীতি-স্থিতিশীলতার প্রত্যাশা তৈরি হওয়ায় বিনিয়োগ সিদ্ধান্তে ধীরে ধীরে গতি আসছে। এরই প্রাথমিক প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে মূলধনি যন্ত্রপাতি বা ক্যাপিটাল মেশিনারি আমদানিতে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, আগের যেকোনও সময়ের চেয়ে সাম্প্রতিক সময়ে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি বেড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথমার্ধে (জুলাই-ডিসেম্বর) মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য ঋণপত্র (এলসি) খোলার পরিমাণ আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৪ শতাংশ বেড়ে ১ হাজার ৭৯ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। গত দুই বছরের মধ্যে এটি সর্বোচ্চ। দীর্ঘদিনের স্থবিরতার পর এ বৃদ্ধি ব্যবসায়িক আস্থার পুনরুদ্ধারের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিদ্যমান শিল্পে আধুনিকায়নেই বেশি জোর
ব্যবসায়ী নেতাদের মতে, নতুন শিল্প স্থাপনের চেয়ে বর্তমানে বিদ্যমান কারখানাগুলোর আধুনিকায়ন, পুনর্বাসন ও সম্প্রসারণ (বিএমআরই) কার্যক্রমেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কারণ গ্যাস ও জ্বালানি সরবরাহ সংকট এখনও নতুন বড় শিল্প স্থাপনের পথে বড় বাধা।
ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বারস অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) সাবেক সভাপতি মীর নাসির হোসাইন বলেন, ‘‘নির্বাচনের পর রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় এলে পরিস্থিতি উন্নত হবে—এই প্রত্যাশায় অনেক উদ্যোক্তা আগে থেকে স্থগিত রাখা বিনিয়োগ পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনা করছেন। তার মতে, বেশিরভাগ মেশিনারি বিদ্যমান শিল্পের সক্ষমতা বাড়ানো ও প্রযুক্তি হালনাগাদে ব্যবহৃত হবে।
খাতভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের জুলাই-নভেম্বর সময়ে চামড়া, ওষুধ, প্যাকেজিংসহ কয়েকটি খাতে মূলধনি যন্ত্রপাতির এলসি খোলা বেড়েছে। তবে দেশের প্রধান রফতানি খাত—তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাতে মূলধনি পণ্য আমদানিতে এখনও ধীরগতি রয়েছে। সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারা আশা করছেন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা দীর্ঘস্থায়ী হলে এ খাতেও নতুন করে বিনিয়োগ বাড়বে।
এলসি খোলা বাড়লেও নিষ্পত্তি কম
তবে পুরো চিত্র একেবারে একমুখী নয়। একই সময়ে এলসি নিষ্পত্তির পরিমাণ ১৬ শতাংশ কমে ৯০৪ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ নতুন এলসি খোলার প্রবণতা বাড়লেও বাস্তব আমদানির গতি এখনও পুরোপুরি ফিরে আসেনি। মধ্যবর্তী পণ্য আমদানিও কমেছে, যা শিল্প উৎপাদনের পূর্ণমাত্রায় গতি ফেরেনি—এমন ইঙ্গিত দেয়।
নীতিগত গবেষক ও অর্থনীতিবিদ এম. মাসরুর রিয়াজ বলেন, আগস্টে নির্বাচনের ঘোষণা এবং ডিসেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে ভোটের তারিখ নির্ধারণের পর থেকেই ব্যবসায়ীদের মধ্যে কিছুটা আত্মবিশ্বাস ফিরে আসে। একটি নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসায় নীতিগত ধারাবাহিকতা ও পূর্বানুমানযোগ্যতা তৈরি হয়েছে, যা বিনিয়োগের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে এই আস্থার ধারাবাহিকতা নির্ভর করবে সরকারের সংস্কার বাস্তবায়ন, জ্বালানি সরবরাহ ও আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতার ওপর।
বেসরকারি খাতের মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের (এমটিবি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও সৈয়দ মাহবুবুর রহমান জানান, ফেব্রুয়ারির নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে ব্যবসায়ীদের মধ্যে এক ধরনের স্বস্তি ও আস্থার পরিবেশ তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে আমদানিতে, বিশেষ করে কিছু মূলধনি যন্ত্রপাতি আনার ক্ষেত্রে। তবে তিনি বলেন, রমজানকেন্দ্রিক ভোগ্যপণ্যের চাহিদাও আমদানি বৃদ্ধির একটি বড় কারণ।
জানুয়ারিতে ১১ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ এলসি
নতুন বছরের শুরুতেই আমদানিতে উল্লেখযোগ্য গতি দেখা গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারিতে এলসি খোলার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ৬১ বিলিয়ন ডলার—যা গত ১১ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। একই সময়ে এলসি নিষ্পত্তি হয়েছে ৬ দশমিক ১৬ বিলিয়ন ডলার।
ব্যাংকারদের মতে, এ বৃদ্ধির পেছনে দুটি প্রধান কারণ রয়েছে। প্রথমত, রমজান সামনে রেখে ভোগ্যপণ্যের আমদানি বৃদ্ধি। দ্বিতীয়ত, নির্বাচন-পরবর্তী রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রত্যাশায় মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির নতুন উদ্যোগ।
একটি শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানান, বর্তমানে ব্যাংকিং খাতে ডলারের সরবরাহ তুলনামূলক স্বস্তিদায়ক। ফলে এলসি খোলায় তেমন কোনও বড় সংকট নেই। তবে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি এখনও নিম্নমুখী, যা বিনিয়োগের পূর্ণাঙ্গ পুনরুদ্ধারকে সীমিত করছে।
রমজানকে ঘিরে আমদানি তৎপরতা বাড়ায় চলতি সময়ে এলসি খোলার পরিমাণ বেড়েছে বলে জানিয়েছেন পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলী। তার ভাষ্য, রমজান সামনে রেখে চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, খেজুরসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি বাড়াতে ব্যবসায়ীরা সক্রিয় হয়েছেন। প্রতি বছরই পবিত্র এই মাসকে কেন্দ্র করে এলসি খোলার প্রবণতা বাড়ে—এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
ঋণ প্রবৃদ্ধিতে শ্লথগতি
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বরে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ১০ শতাংশ। টানা সাত মাস ধরে এই হার ৭ শতাংশের নিচে রয়েছে। ২০২৪ সালের আগস্টের পর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও বিনিয়োগ স্থবিরতার কারণে নতুন ঋণ চাহিদা কমে যায়। নতুন শিল্প স্থাপন বা বড় সম্প্রসারণ না হলে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানিও স্বাভাবিকভাবেই সীমিত থাকে।
রমজানকেন্দ্রিক আমদানি বেড়েছে
রমজান সামনে রেখে ভোগ্যপণ্যের আমদানিও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, রমজান মাসে দেশে সয়াবিন তেলের চাহিদা প্রায় ৩ লাখ টন, চিনির ৩ লাখ টন, পেঁয়াজের ৫ লাখ টন, ছোলার ১ লাখ ৫০ হাজার থেকে ২ লাখ টন এবং খেজুরের ৬০ থেকে ৮০ হাজার টন।
অপরদিকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য বলছে, গত চার মাসে ৪ লাখ টন অপরিশোধিত সয়াবিন তেল, ৩ লাখ ৭০ হাজার টন চিনি, ২ লাখ ২৫ হাজার টন পেঁয়াজ, ২ লাখ ৫ হাজার টন মসুর ডাল, ১৪ লাখ টন গম এবং ৪৭ হাজার টন খেজুর আমদানি হয়েছে।
গত বছরের একই সময়ের তুলনায় সয়াবিন তেল আমদানি বেড়েছে ৩৬ শতাংশ, চিনি ১১ শতাংশ, মসুর ডাল ৮৭ শতাংশ, ছোলা ২৭ শতাংশ, মটর ডাল ২৯৪ শতাংশ এবং খেজুর ২৩১ শতাংশ। বাজারে সরবরাহ নিশ্চিত ও মূল্যস্থিতি বজায় রাখতে বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলো আগাম আমদানিতে সক্রিয় হয়েছে।
সামনের চ্যালেঞ্জ
সার্বিকভাবে নির্বাচন-পরবর্তী আস্থা এবং রমজানকেন্দ্রিক চাহিদা—এই দুই প্রভাবে বছরের শুরুতেই আমদানিতে যে গতি ফিরেছে, তা অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক সংকেত। তবে কেবল এলসি খোলা বাড়লেই বিনিয়োগ টেকসই হবে না। জ্বালানি সরবরাহ, আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা, ঋণপ্রবাহ বৃদ্ধি এবং নীতিগত সংস্কারের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে না পারলে এই গতি সাময়িক হয়ে পড়তে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বিনিয়োগের পূর্বশর্ত হলেও একে কার্যকর ফলাফলে রূপ দিতে হলে দ্রুত নীতিগত সিদ্ধান্ত, বাস্তবায়ন সক্ষমতা এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। তবেই মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানে বাস্তব অবদান রাখবে।
প্যা.ভ.ম
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত 2019 - 2026 PassengerVoice | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Developed By Muktodhara Technology Limited.
পাবলিক মতামত