অর্থনীতিতে স্বস্তি আনার চাপে নতুন সরকার

Passenger Voice    |    ১১:২৫ এএম, ২০২৬-০২-১৯


অর্থনীতিতে স্বস্তি আনার চাপে নতুন সরকার

বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার কাজ শুরু করেছে। দায়িত্ব গ্রহণের সময় নতুন সরকার এমন একটি অর্থনীতি পেয়েছে, যেখানে বহুমুখী অস্বস্তি ও চাপ রয়েছে। বিভিন্ন সংকট থেকে উত্তরণের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। নতুন সরকারের ওপর সংস্কারের পাশাপাশি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চাকা সচল করার বড় দায়িত্ব পড়েছে। দীর্ঘ অস্থিরতায় বিনিয়োগ কমেছে। থমকে আছে কর্মসংস্থান। বেড়েছে মূল্যস্ফীতি। অনেকের প্রকৃত আয় কমেছে। বাজারে অস্থিরতা। এসব বিষয়ে মানুষ দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ দেখতে চায়। অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, সরকারের প্রথম কাজ হবে রমজানে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা। এটিই ‘টেস্ট কেস’। 

দেশে দীর্ঘ সময় ধরে মূল্যস্ফীতি ৯ থেকে ১০ শতাংশের মধ্যে ঘুরছে। নিত্যপণ্যের দাম মানুষের আয়কে ক্ষয় করছে। মধ্যবিত্ত চাপে আছে। নিম্নবিত্তের অবস্থা আরও খারাপ। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার মুহূর্তেই রমজান এসে পড়েছে। নতুন সরকারের ওপর বাজার সামাল দেওয়ার চাপ আছে। 

দেশে বিনিয়োগ স্থবির। ব্যবসায়ীরা অনিশ্চয়তায়। জ্বালানি ও বিদ্যুতের নিরাপত্তা না থাকা বিনিয়োগে বড় বাধা। ব্যাংকে সুদের হার বাড়ায় বিনিয়োগের খরচ আরও বেড়েছে। পুরো ব্যবসায় পরিবেশে বিরাজ করছে অনিশ্চয়তা। ফলে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি শ্লথ। পোশাক খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ঝুঁকি বাড়িয়েছে। বাজারে বৈচিত্র্য বাড়েনি। যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা ‘পাল্টা শুল্ক’ ব্যবস্থার চাপ কমাতে অন্তর্বর্তী সরকার সে দেশের সঙ্গে যে বাণিজ্য চুক্তি করে গেছে, তার প্রভাব মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। এলডিসি থেকে উত্তরণের চ্যালেঞ্জ তো আছেই।

এদিকে বিনিয়োগ বাড়াতে দেশের মধ্যে অর্থের সবচেয়ে বড় সরবরাহকারী ব্যাংক ব্যবস্থা নড়বড়ে। দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, সুশাসনের ঘাটতি এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে ব্যাংক খাত বিপর্যস্ত। অনিয়মিত ঋণ, অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি এবং ঋণখেলাপি সংস্কৃতি সমস্যা বাড়িয়েছে। খেলাপি ঋণের পরিমাণ ক্রমবর্ধমান। অনেক ব্যাংক পড়েছে মূলধন সংকটে। ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় আস্থা কমেছে।

খেলাপি ঋণ এখন সবচেয়ে বড় ঝুঁকির একটি। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, খেলাপি ঋণ কমানো ছাড়া ব্যাংক খাত স্বাভাবিক হতে পারবে না। ব্যাংক কমিশন গঠনের দাবিও উঠেছে নতুন করে। এই ইস্যুতে কী করে নতুন সরকার– সে প্রশ্ন এখন গুরুত্বপূর্ণ।

সরকারের সামনে আরেক বড় চ্যালেঞ্জ রাজস্ব সংগ্রহের সংকট। দেশের কর-জিডিপি অনুপাত এখনও মাত্র ৮ শতাংশের মতো। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে কম। বহু বছর ধরে কর সংগ্রহ কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় বাড়ছে না। কর ব্যবস্থাপনায় সুশাসনও দুর্বল। 

শেখ হাসিনা সরকার উচ্চ ব্যয়ে একের পর এক মেগা প্রকল্প করতে গিয়ে দেশের ঘাড়ে বিশাল বৈদেশিক ঋণের বোঝা চাপিয়ে গেছে, যা পরিশোধের চাপ পড়ে নতুন সরকারের ওপর। বর্তমানে সরকারের ঋণ স্থিতি প্রায় ২২ লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকার শেষ সময়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য পে কমিশনের সুপারিশ রেখে গেছে। যার কারণে এক লাখ কোটি টাকার ব্যয় বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। রাজস্ব আয়ের গতি সরকারের পরিচালন ব্যয় মেটাতেই সক্ষম নয়। এ অবস্থায় কী করে উন্নয়ন ব্যয়ের সংস্থান করবে এবং কীভাবে সামাজিক সুরক্ষা খাতে ব্যয় বাড়াবে, তার চাপ সইতে হবে নতুন সরকারকে।  বিএনপি নির্বাচনের আগে চার কোটি পরিবারকে আড়াই হাজার টাকার সুবিধা দিতে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এর বাইরে সামাজিক সুরক্ষা খাতের ব্যয় বরাদ্দ তো আছেই।

দুর্নীতি এখনও বড় সমস্যার নাম। প্রশাসন, প্রকল্প বাস্তবায়ন, ব্যাংক খাতসহ বিভিন্ন জায়গায় দুর্নীতি অগ্রগতির পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। নতুন সরকার দুর্নীতি দমনে কতটা কঠোর হবে– এখন সবাই তাকিয়ে সেদিকে। জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতেও  রয়েছে সংকট। এলএনজি আমদানিনির্ভরতা ব্যয় বাড়াচ্ছে। শিল্পোৎপাদনের খরচ অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। এতে রপ্তানি প্রতিযোগিতা কমছে। স্থানীয় শিল্পও চাপে রয়েছে। বিদ্যুৎ সরবরাহে অনিয়মিত লোডশেডিং উৎপাদন ব্যাহত করছে। পুঁজিবাজারে দীর্ঘদিন ধরে আস্থার সংকট। লেনদেন কমেছে। নতুন বিনিয়োগকারী আসছে না। নতুন সরকারকে বাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে হবে।

অর্থনীতির কিছু জায়গায় অবশ্য স্বস্তি বিরাজমান। বৈদেশিক লেনদেন হিসাবে (ব্যালান্স অব পেমেন্ট) গত ডিসেম্বরে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার উদ্বৃত্ত। এর বড় কারণ উচ্চ রেমিট্যান্স প্রবাহ। তবে বৈদেশিক বাণিজ্য বাড়লে চাপ বাড়বে রিজার্ভে। কৃষি উৎপাদনে এখনও কিছুটা স্বস্তি আছে। ব্যাংক খাতে কিছু সংস্কার দৃশ্যমান। 

ইস্ট কোস্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান আজম জে চৌধুরী মনে করেন, নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ জ্বালানি নিরাপত্তা। তিনি বলেন, ‘গত দেড় বছরে অনেক শিল্প-কারখানা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ব্যবসা প্রায় ৩০ শতাংশ কমে গেছে। উৎপাদন বাড়াতে হলে আগে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। তাহলেই বিনিয়োগ বাড়বে, কর্মসংস্থানও বাড়বে।’ তাঁর মতে, মূল্যস্ফীতি অর্থনীতির বড় সমস্যা। সুদের হার বাড়ছে, কিন্তু পণ্যের দাম কমছে না। কারণ সরবরাহ কম। স্থানীয় উৎপাদন কম, আমদানিও কম। শুধু অভিযান চালালে হবে না; সরবরাহ বাড়াতে হবে। তবেই বাজার হবে স্থিতিশীল।

আজম জে চৌধুরী জ্বালানি খাতে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। স্বল্প মেয়াদে মার্জিনাল গ্যাসফিল্ড থেকে দ্রুত উত্তোলন বাড়ানো, দীর্ঘ মেয়াদে অনুসন্ধান বৃদ্ধি এবং অফশোর বিডিং পুনরায় চালু করার সুপারিশ তাঁর। 

বাংলাদেশ উন্নয়ন অধ্যয়ন প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক অর্থনীতিবিদ ড. এনামুল হক মনে করেন, নতুন সরকারের সামনে প্রধান কাজ হলো সংস্কার, ব্যয় সাশ্রয় এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা। তাঁর মতে, ‘সাধারণ মানুষ যেন মনে করে, তাদের টাকা ব্যাংকে রাখা নিরাপদ– এই আস্থা ফিরিয়ে আনা জরুরি। ব্যাংকিং খাতে সুশাসন না ফিরলে অর্থনীতি ঘুরবে না।’
অগ্রাধিকার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এখন সরকারের প্রধান কাজ রমজানে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ। দাম বাড়বে কিনা, মানুষ সেটিই দেখছে। তারা জানতে চায়, সরকার তাৎক্ষণিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারে কিনা। এতে মানুষের আস্থা তৈরি হবে এবং ঈদের পর অর্থনীতি গতিশীল হবে।

ড. এনামুল হক বলেন, দুর্নীতিবাজকে শাস্তি দিলেই হবে না। যেসব নিয়ম দুর্নীতিকে সুযোগ দেয়, সেগুলো বদলাতে হবে। যেমন রাজউকের কোনো কাজের ডেডলাইন নেই। এতে কর্মকর্তারা সুযোগ নেন। প্রতিটি সরকারি সেবার নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকা উচিত। 

বিদেশি কোম্পানিকে বন্দর পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া নিয়ে যে বিতর্ক হয়েছিল, সে বিষয়ে তিনি বলেন, ‘স্বচ্ছতার অভাব ছিল। বিদেশি কোম্পানি দায়িত্ব নিলে দেশ উপকৃত হবে কিনা– এটা সরকারের ব্যাখ্যা দেওয়া উচিত ছিল। নীতি পরিষ্কার হলে দেশি-বিদেশি যে কেউ অপারেট করতে পারে।’ যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ বাণিজ্য চুক্তি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘প্রথমে দেখতে হবে চুক্তিটির আইনি বৈধতা আছে কিনা। বৈধ না হলে যারা এর পেছনে ছিলেন তাদের জবাবদিহিতে আনতে হবে। আর বৈধ হলে মাথা ঠুকলেও উপায় নেই।’

এলডিসি থেকে উত্তরণ বিষয়ে তাঁর মন্তব্য, ‘সতর্ক পর্যালোচনা করা যেতে পারে। কিন্তু পিছিয়ে যাওয়ার সুযোগ সীমিত। আমাদের উচিত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে আরও এগিয়ে দেওয়া এবং গ্র্যাজুয়েশনের জন্য যে প্রস্তুতি নেওয়ার কথা ছিল, তা নেওয়া।’

পারটেক্স স্টার গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান আজিজ আল কায়সার বলেন, ব্যবসায়ী দীর্ঘ সময় ধরে ব্যবসা ‘থেমে থাকা’ অবস্থায় ছিল। কয়েকটি গোষ্ঠীর বাইরে নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হয়নি। বাজারের গতি থাকলেও ব্যবসার বিস্তার হয়নি। এখন নতুন সরকার এসেছে। বিএনপি ক্ষমতায়, জামায়াত বিরোধী দলে– এটি নতুন রাজনৈতিক ভারসাম্য। যদি ‘চেক অ্যান্ড ব্যালান্স’ বজায় থাকে এবং সরকার ব্যবসাবান্ধব হয়, তাহলে দেশ এগোবে। তাঁর মতে, নীতি তৈরির সময় দেশি বিনিয়োগকারীদের ভুলে গেলে চলবে না। জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে না পারলে কোনো শিল্প চলবে না।