রমজান ও গরমে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহই চ্যালেঞ্জ

Passenger Voice    |    ১১:৪০ এএম, ২০২৬-০২-১৮


রমজান ও গরমে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহই চ্যালেঞ্জ

বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ২৮ হাজার মেগাওয়াট হলেও অর্থের জোগান ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করাসহ নানামুখী চ্যালেঞ্জের মুখে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত। নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের দুই দিনের মাথায় পবিত্র রমজান শুরু হতে যাওয়ায় লোডশেডিংয়ের দুশ্চিন্তায় নতুন সরকার। ফলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে এই খাতের সার্বিক দিক তুলে ধরতে আজ বিকালে সচিবালয়ে এক বৈঠকের আয়োজন করা হয়েছে। এতে বিভাগের সিনিয়র কর্মকতারা উপস্থিত থাকবেন এবং সেখানে এই খাতের চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা হবে। জ্বালানি সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম মঙ্গলবার যুগান্তরকে বলেছেন, জ্বালানি খাতের সমস্যা এবং সম্ভাবনা প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরা হবে। তবে তিনি এ ব্যাপারে বিস্তারিত কিছু জানাতে রাজি হননি।

জানা গেছে, রমজানে বিশেষ করে বিদ্যুৎ, এলপিজি এবং গ্যাস সরবরাহ নিয়ে বিস্তারিত জানানো হবে নতুন প্রধানমন্ত্রীকে। নবনিযুক্ত বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেছেন, বুধবার সকালে মন্ত্রণালয়ে গিয়ে সবার সঙ্গে কথা বলে তারপর বিকালে প্রধানমন্ত্রীকে এ খাত নিয়ে জানাব।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানান, এই রমজানে কোনোভাবে লোডশেডিং করা যাবে না। কারণ নতুন সরকারের জন্য এটি হবে বিব্রতকর। তাছাড়া গরম এবং সেচের জন্য বিদ্যুতের চাহিদা আছে বেশ। সেই চাহিদা মেটানোর মতো সক্ষমতা বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড-পিডিবির আছে। কিন্তু রমজান, গ্রীষ্মকাল এবং সেচকে লোডশেডিংমুক্ত করতে হলে কী ধরনের চ্যালেঞ্জ আছে তা জানানো হবে সরকারপ্রধানের কাছে। পিডিবির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এবারের রমজানের প্রথম ১৫-২০ দিন বেশ ভালোভাবে কাটানো যাবে। কারণ এ সময়ে বিদ্যুতের চাহিদা থাকবে কম। বিশেষ করে দুপুরে এবং তারাবির নামাজের সময়কে পিক আওয়ার ধরে বিদ্যুতের চাহিদা ১৬ হাজার থেকে ১৬ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট থাকতে পারে। দেশের সবকটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এখন উৎপাদনে আছে। আদানি এবং এসএস পাওয়ার, মাতারবাড়ী, পায়রা, বরিশাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন যোগ হচ্ছে এখন জাতীয় গ্রিডে। যার কারণে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে পাওয়া যাচ্ছে ৫ হাজার মেগাওয়াটের মতো। এর বাইরে গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্র থেকে ৫ হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। তবে রমজানের শেষ সময়ে, গরম এবং সেচ ব্যবস্থাকে লোডশেডিংমুক্ত রাখার বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহ বৃদ্ধি এবং পিডিবির কাছে বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলোর বিপুল অঙ্কের পাওনা বিল পরিশোধ করা। রমজানে বিদ্যুৎ খাতে দৈনিক ৯০ কোটি ঘনফুট গ্যাস দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে পেট্রোবাংলা। তবে বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, এই গ্যাসে বিদ্যুতের লোডশেডিং কাটানো যাবে না। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ দিতে হলে দৈনিক ১১০ কোটি ঘনফুট গ্যাস বিদ্যুৎ খাতকে বরাদ্দ দিতে হবে।

এ বিষয়টিই আজ নতুন প্রধানমন্ত্রীকে জানানো হবে। অন্যদিকে এবারের গরমে বিদ্যুতের চাহিদা হবে ১৮ হাজার থেকে ১৮ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট। বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষমতা ২৮ হাজার হলেও ১৮ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট চাহিদা মেটাতে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পিক আওয়ারে চালাতে হবে। কিন্তু বেরসকারি তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পিডিবির কাছে বকেয়া পাওনা আছে ১৪ হাজার কোটি টাকার বেশি। সেই টাকা পরিশোধ না করলে তাদের কাছ থেকে বিদ্যুৎ পাওয়া কঠিন বলে মন্তব্য করেছেন পিডিবির কর্মকর্তারা। এ ব্যাপারে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সমিতি বাংলাদেশ ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসারস অ্যাসোসিয়েশন-বিপ্পার সভাপতি ডেভিড হাসনাত সাংবাদিকদের বলেছেন, পিডিবির বকেয়া অর্থ পরিশোধ না করলে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মালিকরা একেবারে ঋণখেলাপি হয়ে যাবে। প্রায় ১০ মাসের বেশি সময় ধরে বিদ্যুতের বিল দিচ্ছে না পিডিবি।

এদিকে গ্যাস খাত নিয়েও একটি পেপার উপস্থাপন করা হবে প্রধানমন্ত্রীর সামনে। বর্তমানে দিনে গ্যাসের চাহিদা ৪০০ কোটি হলেও সরবরাহ করা হচ্ছে সর্বোচ্চ ২৬০ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে আবার আমদানি করা এলএনজি হচ্ছে ৯০-১০০ কোটি ঘনফুট। এর মানে দেশে উৎপাদিত গ্যাস একেবারে কমে যাচ্ছে। বিগত সরকার ১০০-এর বেশি কূপ খননের কর্মসূচি নিলেও এখন পর্যন্ত খনন করা হয়েছে ১৫টির মতো কূপ। সেখান থেকে জাতীয় গ্রিডে যোগ হয়েছে মাত্র ১০ থেকে ১৫ কোটি ঘনফুট। অথচ স্থানীয় গ্যাস ফিল্ডস থেকে দৈনিক গ্যাসের উৎপাদন কমছে ৫ লাখ ঘনফুট। জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীকে মূলত এসব চ্যালেঞ্জই তুলে ধরা হবে। গ্যাসের তীব্র চাহিদা মেটাতে শিগগির আরও একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল-এফএসআরইউ বসানোর সুপারিশ করা হবে। এছাড়া তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে ভূমি (অনশোর) এবং সমুদ্রে (অফশোর) টেন্ডার করে দেশি-বিদেশি কোম্পানিকে ব্লক বা এলাকা বরাদ্দ দেওয়ার সুপারিশও করতে পারে জ্বালানি বিভাগ। এজন্য মডেল পিএসসি (উৎপাদন বণ্টন চুক্তি) অনেকটা চূড়ান্ত করে গেছে অন্তর্বর্তী সরকার। জ্বালানি তেল নিয়েও অবহিত করা হবে প্রধানমন্ত্রীকে। তবে রমজানে সবচেয়ে স্পর্শকাতর হচ্ছে রান্নার গ্যাস তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস-এলপিজি। দুই মাস ধরে বাজারে এলপিজির সংকট চলছে। এই রমজানেও এই সংকট না কমায় সাধারণ মানুষ বেশ ক্ষুব্ধ। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন-বিইআরসি ১২ কেজির এলপিজির গ্যাসের দাম ১ হাজার ৩৬৫ টাকা নির্ধারণ করলেও বাজারে বিক্রি হচ্ছে ১৮০০ থেকে ২ হাজার টাকা। বেশি দামে গ্যাস বিক্রি হওয়ায় রমজানে অস্বস্তিতে জনগণ। বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ মঙ্গলবার যুগান্তরকে বলেছেন, রমজানে এই মাসে এলপিজির চাহিদা আছে (ফেব্রুয়ারি) ১ লাখ ৫০ থেকে ১ লাখ ৬০ হাজার টন। সেখানে ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এলপিজি আমদানি করা হয়েছে ৭৪ হাজার টন। ফলে এই রমজানে খুব বেশি সংকট হবে না বলে আশা করা হচ্ছে।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মাত্র ক্ষমতা নিয়েছেন। প্রথম বৈঠকে তাকে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের পাহাড়সম সমস্যার কথা বলা ঠিক হবে না। তাই স্বল্পকালীন সংকট মোকাবিলার সুপারিশ করা হবে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, দেশের অর্থনীতিকে সামনের দিকে নিয়ে যেতে হলে জ্বালানি খাতের উন্নয়ন, বিশেষ করে গ্যাসের সরবরাহ অনেক বাড়াতে হবে।