শিরোনাম
Passenger Voice | ১২:৫১ পিএম, ২০২৬-০২-১৬
নির্বাচন ও সাপ্তাহিক ছুটি শেষে কর্মচঞ্চলতা বেড়েছে চট্টগ্রাম বন্দরে। নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) দুবাইভিত্তিক কোম্পানি ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ইজারা দেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ৭ দিনের ধর্মঘট পালন করেন বন্দরের শ্রমিক-কর্মচারীরা। বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার জন্য ১৫ দিনের আলটিমেটাম দেওয়া হয়। গতকাল শেষ হয়েছে বেঁধে দেওয়া ১৫ দিন। এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত শ্রমিক নেতারা পরবর্তী কর্মসূচি কী হবে, তা নিয়ে আলোচনা করছেন। বর্তমানে কনটেইনার ওঠানামা ও ডেলিভারি কার্যক্রম চলছে পুরোদমে। তবে আর কোনো ধর্মঘট চান না ব্যবসায়ীরা।
এনসিটি বিদেশি কোম্পানিকে ইজারা না দেওয়াসহ বিভিন্ন দাবিতে গত ৩১ জানুয়ারি থেকে ৮ ফেব্রুয়ারি (৬ ও ৭ ফেব্রুয়ারি বাদে) ৭ দিনের ধর্মঘট পালন করেন শ্রমিক-কর্মচারীরা। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও রমজানের পণ্য খালাসের স্বার্থে ৯ থেকে ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ধর্মঘট স্থগিত রাখে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ। পরবর্তী কর্মসূচি নিয়ে গতকাল রবিবার (১৫ ফেব্রুয়ারি) আলোচনায় বসেছে সংগঠনটির নেতারা। তবে তারা (সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা পর্যন্ত) কোনো কর্মসূচি ঘোষণা করেনি।
যা বলছেন শ্রমিক নেতারা
চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক মো. ইব্রাহিম খোকন গতকাল বিকেলে বলেন, ‘আমরা আমাদের সংগঠনের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে আলোচনায় বসেছি। তবে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেইনি। আমরা নির্বাচিত সরকারের দিকে তাকিয়ে আছি কী করবেন তারা। আশা করি ভালো কিছু হবে।’
একই কথা জানিয়ে সংগঠনটির আরেক সমন্বয়ক মো. হুমায়ুন কবীর বলেন, ‘নির্বাচিত সরকারের কাছে দাবি বাস্তবায়নের জন্য আবেদন করেছি। আশা করি নির্বাচিত সরকার আন্দোলনকারীদের কথা শুনবেন।’
ব্যবসায়ীরা যা বলছেন
চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে ভোগ্যপণ্য আমদানিকারক ফারুক আহমেদ বলেন, ‘আমরা ব্যবসায়ীরা চাই সুষ্ঠু ব্যবসায়িক পরিবেশ। এটা ব্যবসায়ী ও দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার জন্য ভালো। কারণ ধর্মঘটের কারণে অচলাবস্থা তৈরি হলে পণ্য খালাস করা যায় না। সামনে রমজান। ভোগ্যপণ্য খালাস না হলে বাজার সরবরাহ চেইন নষ্ট হবে। তখন পণ্যের দাম বাড়ার একটা সুযোগ তৈরি হয়।’
আন্তজিলা মালামাল পরিবহন সংস্থা ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক চৌধুরী জাফর আহম্মদ বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দরে যে পরিমাণ আমদানি ও রপ্তানি পণ্য হ্যান্ডলিং হয়ে থাকে তার ৯০ শতাংশ কাভার্ডভ্যান, ট্রাক, প্রাইম মুভার এর মাধ্যমে পরিবহন করা হয়। বেসরকারি ডিপোগুলোতেও আমাদের গাড়িগুলো পণ্য পরিবহন করে। চট্টগ্রাম বন্দর ও বেসরকারি ডিপোগুলোতে ১২ হাজার পণ্যবাহী গাড়ি চলাচল করে। ধর্মঘটের কারণে চালক, সহযোগীদের বেতন, ঋণ বা কিস্তি পরিশোধে সমস্যা হয়। তাই আমরা কোনো ধর্মঘট চাই না।’
চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক পরিচালক মাহফুজুল হক শাহ বলেন, ‘ধর্মঘটের মাধ্যমে সৃষ্ট অচলাবস্থা কোনো অবস্থাতেই কাম্য নয়। এর কারণে ব্যবসায়ী, বন্দর, কাস্টমস সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর আগেও সাত দিন ধর্মঘট পালন হয়েছে। আর কোনো ধর্মঘট চাই না। নতুন সরকার আসছে। আমরা একটি স্বাভাবিক, সুষ্ঠু ব্যবসায়িক পরিবেশ চাই। এর মাধ্যমে আমাদের অর্থনীতি গতিশীল হবে। তখন দেশে-বিদেশি বিনিয়োগও বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে।’
বন্দরের বর্তমান পরিস্থিতি
চট্টগ্রাম বন্দরে বর্তমানে ৫৯ হাজার কনটেইনার রাখার ধারণক্ষমতা রয়েছে। তবে শ্রমিক-কর্মচারীদের সাত দিনের ধর্মঘটের কারণে পণ্য ডেলিভারিতে ভাটা পড়ে। ইয়ার্ডে বাড়তে থাকে কনটেইনারের সারি। বন্দর ইয়ার্ডে কনটেইনার সংখ্যা ৪১ হাজার টিইইউএস ছাড়িয়ে যায়। গত ৯ ফেব্রুয়ারি থেকে সাত দিনের জন্য ধর্মঘট কর্মসূচি স্থগিত করলে বন্দরের সার্বিক কার্যক্রমে গতি ফেরে। এরপর গত ১১ ফেব্রুয়ারি সকাল ৮টা থেকে ১৩ ফেব্রুয়ারি সকাল ৮টা পর্যন্ত সাধারণ ছুটি থাকে বন্দরে। গত ১৩ ফেব্রুয়ারি বন্দরে কনটেইনার ছিল ৪৩ হাজার ১২৭ টিইইউএস। কিন্তু গত ১৪ ফেব্রুয়ারি সে সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ৪১ হাজার ৫৫১ টিইইউএসে।
অপরদিকে নির্বাচনের পরদিন গত ১৩ ফেব্রুয়ারি বন্দর থেকে ডেলিভারি হয় ৭২ টিইইউএস কনটেইনার। গত ১৪ ফেব্রুয়ারি বন্দর থেকে কনটেইনার ডেলিভারি বাড়ে। সে সংখ্যা দাঁড়ায় ১ হাজার ৩০৮ টিইইউএসে। রমজান মাস ঘনিয়ে আসায় ও স্বাভাবিক পরিস্থিতি বজায় থাকায় বর্তমানে বন্দরের অপারেশনাল কার্যক্রমে গতি ফিরেছে।
জাহাজের তথ্য
চট্টগ্রাম বন্দরে বর্তমানে ১২২টি পণ্যবাহী জাহাজ রয়েছে। এর মধ্যে জেটিতে রয়েছে ১৫টি জাহাজ। বাকি জাহাজগুলো রয়েছে বহির্নোঙরে। কনটেইনারবাহী জাহাজ রয়েছে ৩৮টি। খাদ্যপণ্যবাহী জাহাজ রয়েছে ২১টি। এসব জাহাজে রয়েছে খেজুর, ফল, ছোলা, ডালসহ বিভিন্ন পণ্য রয়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, ‘এসব পণ্য যথাসময়ে খালাস হলে বাজারে সরবরাহ বাড়বে। তখন ভোগ্যপণ্যের বাজারে দাম নিয়ন্ত্রণে থাকবে।’
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন বলেন, ‘রমজানের আর বেশি দিন বাকি নেই। অসাধু ব্যবসায়ীরা সব সময় দাম বাড়ানোর সুযোগ খোঁজে। আমরা চাই না সেই সুযোগ কেউ পাক। বন্দরের কার্যক্রম আরও গতিশীল হোক, রোজার আগে বাজারে পণ্যের সরবরাহ বাড়ুক, ক্রেতা স্বস্তি পাবে- সেটাই আমরা প্রত্যাশা করি।’
গত বছরের ডিসেম্বর থেকে এনসিটি রক্ষার আন্দোলনের গতি কমে আসে। তবে গত ২৯ জানুয়ারি দুপুরে চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি টার্মিনাল পরিচালনায় বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে বন্দর কর্তৃপক্ষের চুক্তি প্রক্রিয়া বৈধ বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। সেদিন বেলা সাড়ে ১১টায় ওই রায়কে কেন্দ্র করে অফিস চলাকালে চট্টগ্রাম বন্দরের কিছু কর্মচারী বন্দর ভবনে এবং বন্দর ভবন এলাকায় মিছিলে অংশ নেন। এরপর থেকে দিনে দিনে বন্দরের শ্রমিক-কর্মচারীদের আন্দোলন আরও চাঙা হয়ে ওঠে।
গত ৩১ জানুয়ারি থেকে ২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত, সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত কর্মবিরতি পালন করেন বন্দরের শ্রমিক-কর্মচারীরা। গত ৩ ফেব্রুয়ারি কর্মবিরতির সময় ৮ ঘণ্টা থেকে বেড়ে ঠেকেছে ২৪ ঘণ্টায়।
পরে তারা মঙ্গলবার সকাল ৮টা থেকে বুধবার সকাল ৮টা পর্যন্ত কর্মবিরতি পালন করেন। এর মধ্যে গত ৩ ফেব্রুয়ারি বিকেলে অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতির ঘোষণা দেয় চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ। সেদিন বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতিতে সমর্থন দেয় শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ)। ৬ ও ৭ ফেব্রুয়ারি বাদ দিয়ে চলে ৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। এরপর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও রমজানের পণ্য খালাসের স্বার্থে ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ধর্মঘট স্থগিত রাখে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ। সূত্র খবেরর কাগজ
প্যা.ভ.ম
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত 2019 - 2026 PassengerVoice | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Developed By Muktodhara Technology Limited.
পাবলিক মতামত