সরবরাহ পর্যাপ্ত তবু চড়া রমজানের বাজার

Passenger Voice    |    ১১:১৫ এএম, ২০২৬-০২-১৬


সরবরাহ পর্যাপ্ত তবু চড়া রমজানের বাজার

সংযম ও আত্মনিয়ন্ত্রণের বার্তা নিয়ে রমজান এলেও নিত্যপণ্যের বাজারে তার ছাপ নেই। পর্যাপ্ত আমদানি ও উৎপাদন থাকার পরও রোজার আগমুহূর্তে ছোলা, ব্রয়লার মুরগি, লেবু ও ইফতারসামগ্রীর দামে ঊর্ধ্বগতি দেখা দিয়েছে। দুই দিনের ব্যবধানে ছোলার কেজিতে ১০ টাকা ও ব্রয়লারের কেজিতে ২০ টাকা বেড়েছে। এতে নিম্ন ও মধ্যবিত্তদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হয়েছে। সূত্র-সমকাল

ভোক্তারা বলছেন, রমজান যেন ব্যবসায়ীদের মুনাফার মাস। এ সময় ব্যবসায়ীরা কৃত্রিম সংকটসহ নানা অজুহাতে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ান। নির্বাচনের অজুহাতে জেলা প্রশাসন ও ভোক্তা অধিদপ্তরের বাজার তদারকিও সক্রিয় নয়। এ সুযোগে ব্যবসায়ীরা নানা পণ্যের মজুত বাড়িয়ে ও কৃত্রিম সংকট তৈরি করে মানুষের পকেট কাটছেন।

তারা বলছেন, গুটিকয়েক ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষায় দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর স্বার্থকে বারবার উপেক্ষা করা হচ্ছে। নতুন সরকারের কাছে ভোক্তাদের প্রত্যাশা রমজানে দাম সহনীয় রাখতে তারা কার্যকর উদ্যোগ নেবে। 

ইফতারের প্রধান উপকরণ ছোলা। মাস দুয়েক আগে ছোলার দাম কমে ৮০ টাকায় নেমেছিল। এই দামের আশপাশেই এতদিন ঘুরপাক করেছিল। নির্বাচনের পরই এক লাফে কেজিতে ১০ টাকা বাড়ল। গতকাল রাজধানীর কয়েকটি খুচরা বাজারে গিয়ে দেখা গেছে, ছোলার কেজি বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৯০ থেকে ১০০ টাকা দরে। তবে এই দাম গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ২৫ থেকে ৩০ টাকা কম। 

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, দেশে ছোলার চাহিদা বছরে এক লাখ ৫০ হাজার টন। রমজানে লাগে প্রায় লাখ টন। যদিও ছোলা আমদানিকারকরা বলছেন, দেশে প্রতিবছর ছোলার চাহিদা দুই লাখ টনের মতো। এবার পর্যাপ্ত ছোলা আমদানি হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রায় ২৬ কোটি ডলারের ছোলা আমদানি হয়েছে। 

কারওয়ান বাজারের ইয়াসিন জেনারেল স্টোরের মালিক বলেন, নির্বাচনের পর কয়েকটি জিনিসের দাম বিছুটা বেড়েছে পাইকারি বাজারে। এ জন্য খুচরায় বেশি। 

নিম্ন ও মধ্যবিত্তদের ভরসা ব্রয়লার মুরগি। দুই-আড়াই মাস ধরে দেড়শ টাকার কিছু বেশি ছিল ব্রয়লারের কেজি। সপ্তাহ দুয়েক আগে দর বেড়ে ১৮০ টাকার ঘর স্পর্শ করে। গতকাল প্রতি কেজি বিক্রি হয়েছে ১৯০ থেকে ২০০ টাকা দরে। এ ছাড়া সোনালি জাতের মুরগির দর বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩০০ থেকে ৩২০ টাকা। 

ব্যবসায়ীরা জানান, মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে কেজিতে ২০ টাকার মতো বেড়েছে। চাহিদা বাড়ার কারণে দামের উল্লম্ফন হয়েছে বলে জানান তারা। 

রোজার শুরুতে খেজুরের বাজার উত্তপ্ত হয়ে উঠত– এটাই ছিল বিগত দেড় দশকের রীতি। তবে গত বছরের মতো এবারও খেজুরের দাম উল্টো পড়ে গেছে। গত বছরের তুলনায় মানভেদে খেজুর কেজিতে সর্বোচ্চ কমেছে ৩০ থেকে ১৫০ টাকা। চাহিদা বেশি থাকে জায়েদি খেজুরের। খুচরা বাজারে এ মানের খেজুরের কেজি গত বছর ছিল ২৫০ থেকে ৪০০ টাকা, এবার বিক্রি হচ্ছে ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা। প্রতি কেজি মরিয়ম ও আজওয়া ৬০০ থেকে এক হাজার টাকায় এবং ভালো মানের মেডজুল খেজুর এক হাজার থেকে এক হাজার ৩০০ বিক্রি হচ্ছে।

দেশে খেজুরের চাহিদার পুরোটাই আমদানি করে মেটাতে হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত ৩৭ হাজার ৯৩১ টন খেজুর আমদানি হয়েছে।

ইফতারে শরবত অতি গুরুত্বপূর্ণ। যেখানে লেবু আবশ্যক। রোজার আগেই লেবু তিতা হয়ে উঠছে। দুই সপ্তাহ ধরে চড়া লেবুর বাজার। হালিতে বেড়েছে ২০ থেকে ৩০ টাকা। বাজারে এখন মাঝারি আকারের এক হালি লেবু কিনতে খরচ করতে হচ্ছে ৮০ থেকে ১০০ টাকা, যা সপ্তাহ দুয়েক আগে ছিল ৫০ থেকে ৬০ টাকা। কারওয়ান বাজারের লেবু বিক্রেতা আব্দুর রহিম বলেন, এখন লেবুর মৌসুম নয়, সে জন্য দাম বাড়তি।

মালটারও দামও বেশি। মালটার কেজি বিক্রি হচ্ছে ৩১০ থেকে ৩৪০ টাকায়। আপেলের কেজিতে ক্রেতাকে গুনতে হবে ৩৩০ থেকে ৩৪০ টাকা। পাশাপাশি দেশি ফলের দামও কিছুটা চড়েছে। সপ্তাহ দুয়েক আগে পেয়ারার কেজি ১০০ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি হলেও গতকাল দেড়শ ছুঁয়েছে। একইভাবে বিভিন্ন জাতের কলা ডজনে ১০ থেকে ২০ টাকা বাড়তি দেখা গেছে। 

ইফতারের মধ্যে অন্যতম পদ বেগুনি। কোনো কারণ ছাড়াই দুই দিনের ব্যবধানে বেগুন কেজিতে ২০ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ৮০ থেকে ৯০ টাকায়। একইভাবে শসার কেজিতে ১০ টাকা বেড়ে ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। 

তবে সবজির দাম কিছুটা কম। শিমের কেজি বিক্রি হচ্ছে ৪০ থেকে ৫০ টাকা দরে। কাঁচামরিচের কেজি কেনা যাচ্ছে ১০০ থেকে ১৪০ টাকায়। গত বছর এ সময় চিনির কেজি ছিল ১২০ থেকে ১২৫ টাকা। এবার তা কেনা যাচ্ছে ১০০ থেকে ১০৫ টাকায়। 

ফলন বেশি হওয়ায় আলুর কেজি নেমেছে ২০ টাকায়। গত বছর এ সময় আলুর কেজি ছিল ৩০ টাকার মতো। একই পরিস্থিতি পেঁয়াজে। এবার পেঁয়াজের ফলন ৪২ লাখ টন ছাড়িয়েছে। উৎপাদন ভালো হওয়ায় পেঁয়াজের কেজি বিক্রি হচ্ছে ৫৫ থেকে ৬০ টাকায়। 

এবারও তেমন বাড়েনি গরুর মাংসের দাম। কেজি বিক্রি হচ্ছে ৭৩০ থেকে ৭৫০ টাকা দরে। তবে কোথাও কোথাও দেশি গরু বলে কেজি ৮০০ টাকা দরে বিক্রি করছেন কিছু ব্যবসায়ী। 

রমজানে মাসব্যাপী সুলভ মূল্যে দুধ, ডিম, গরুর মাংস ও ব্রয়লার মুরগি (ড্রেসড) বিক্রি করবে সরকার। ব্রয়লার মুরগির মাংসের কেজি ২৪৫ টাকা, পাস্তুরিত দুধ প্রতি লিটার ৮০ টাকা, ডিম প্রতি পিস আট টাকা এবং গরুর মাংস প্রতি কেজি ৬৫০ টাকায় বিক্রি করা হবে। 

এদিকে টিসিবিও নিয়মিত পণ্য ভোজ্যতেল, চিনি ও ডালের সঙ্গে রমজান উপলক্ষে খেজুর ও ছোলা বিক্রি করবে। নির্ধারিত ডিলারের পাশাপাশি ভ্রাম্যমাণ ট্রাকের মাধ্যমেও এসব পণ্য বিক্রি করবে বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির উপপরিচালক শাহাদাত হোসেন।  

ঢাকা ও সিটি করপোরেশন এলাকায় ২৫টি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে এই কার্যক্রম পরিচালিত হবে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. আবু সুফিয়ান জানান, মাংস, ডিম ও দুধের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহসহ বাজারমূল্য স্থিতিশীল রাখতে রমজানের আগের দিন থেকে ২৫ রমজান পর্যন্ত এসব খাদ্যপণ্য সুলভ মূল্যে বিক্রি করা হবে। নির্ধারিত ডিলারের পাশাপাশি ভ্রাম্যমাণ ট্রাকের মাধ্যমেও টিসিবি পণ্য বিক্রি করবে বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির উপপরিচালক শাহাদাত হোসেন। 

কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, প্রতি বছর রমজান এলেই ব্যবসায়ীরা কৃত্রিম সংকটসহ নানা অজুহাতে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ান। নতুন সরকারের কাছে ভোক্তাদের প্রত্যাশা, দ্রুত নিত্যপণ্যের বাজারে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।