বিতর্কিত ডিজিটাল ব্যাংক: লাইসেন্স দিতে তড়িঘড়ি সভা আহ্বান গভর্নরের

Passenger Voice    |    ১১:১৪ এএম, ২০২৬-০২-১৬


বিতর্কিত ডিজিটাল ব্যাংক: লাইসেন্স দিতে তড়িঘড়ি সভা আহ্বান গভর্নরের

নতুন মন্ত্রিসভা গঠনের ঠিক একদিন আগে তড়িঘড়ি করে বিতর্কিত ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়ার লক্ষ্যে জরুরি পর্ষদ সভা আহ্বান করেছেন গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর। ক্রান্তিকালে জরুরি ভিত্তিতে এ ধরনের লাইসেন্স কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কার্যক্রমের স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে বলে মনে করছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা। 

তাই এ ধরনের পদক্ষেপের প্রতিবাদ জানিয়ে পর্ষদ সভা স্থগিতের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিল। 

এ লক্ষ্যে কাউন্সিলের নেতারা রবিবার (১৫ ফেব্রুয়ারি) বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে একটি চিঠিও দিয়েছেন। 

মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) নতুন সরকারের মন্ত্রীদের শপথ গ্রহণের কথা রয়েছে। সরকার গঠনের চূড়ান্ত প্রক্রিয়া যখন দরজায় কড়া নাড়ছে, ঠিক সেই মুহূর্তে ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়ার উদ্দেশ্যে আজ সোমবার বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্ষদের এক জরুরি পর্ষদ সভা আহ্বান করেছেন গভর্নর। 

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, বিশেষ একটি গোষ্ঠী বা গ্রুপকে এই ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স দিতেই তোড়জোড় চালাচ্ছেন গভর্নর। এর আগে তিনি নিজেও সেই একই গোষ্ঠীর একটি ব্যাংকে চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। কাজেই নিজের পূর্বতন কর্মস্থল বা সংশ্লিষ্ট বাণিজ্যিক গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়ার উদ্দেশ্যে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করে তারা বলেন, বিদ্যমান ‘ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১’ এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ‘কর্পোরেট গভর্ন্যান্স’ এর নীতিমালা অনুযায়ী, গভর্নরের এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ সরাসরি ‘স্বার্থের সংঘাত’। নিজের পূর্বতন কর্মস্থল বা সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীকে অনৈতিক সুবিধা প্রদানের এই প্রচেষ্টা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে।

তারা বলেন, দেশের বর্তমান সামষ্টিক অর্থনীতি এবং ভঙ্গুর ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা রক্ষায় যেখানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পূর্ণ মনোযোগ থাকা প্রয়োজন, সেখানে নতুন করে ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স প্রদানের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। যেখানে বিদ্যমান অনেক ব্যাংকই তারল্যসংকট ও খেলাপি ঋণের ভারে জর্জরিত, সেখানে নতুন লাইসেন্স প্রদান ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেবে। এটি ‘বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার, ১৯৭২’-এর ৫ (ক) অনুচ্ছেদের পরিপন্থি।

তাদের মতে, দেশের ব্যাংকিং খাতের বর্তমান নাজুক পরিস্থিতিতে যেখানে সমস্যাগ্রন্থ কতিপয় ব্যাংক আমানতের সুরক্ষা দিতে হিমশিম খাচ্ছে, সেখানে নতুন করে কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষায় ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স অর্থনীতির জন্য কতটুকু আবশ্যক তা অধিকতর পর্যালোচনার দাবি রাখে। শুধু তাই নয়, নবনির্বাচিত সরকার এসেই এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারত। 

তারা আরও বলেন, নিয়মনীতি ও আইন সংশোধনের মাধ্যমে বিশেষ কোনো গোষ্ঠীর ঋণ বা অনিয়মকে বৈধতা দেওয়ার যেকোনো চেষ্টা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসনকে কলঙ্কিত করবে। এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হলে তা জনগণের আমানতের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। এমন পরিপ্রেক্ষিতে, দেশের আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা ও আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষায় এ ধরনের পদক্ষেপের প্রতিবাদ জানিয়ে জরুরি পর্ষদ সভা স্থগিতের দাবিতে আজ সংবাদ সম্মেলন করবে বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিল। 

এর আগে, গতকাল কাউন্সিলের নেতারা বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে একটি চিঠিও দিয়েছেন। সেখানে তারা বলেছেন, একটি নতুন সরকার যখন রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব গ্রহণের প্রক্রিয়ায় রয়েছে, তখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতো একটি সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘমেয়াদি এবং বিতর্কিত কোনো নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রশাসনিক শিষ্টাচারের চরম লঙ্ঘন। নতুন সরকারের নিজস্ব অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ও সংস্কার এজেন্ডা থাকতে পারে। এমতাবস্থায় তড়িঘড়ি করে ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স প্রদান করার সিদ্ধান্ত হঠকারিতা এবং অগণতান্ত্রিক হিসেবে বিবেচিত হবে। তাই আজকের প্রস্তাবিত পর্ষদ সভা এবং ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স প্রদানের প্রক্রিয়া স্থগিতকরণ, নীতিমালার আলোকে এবং নিরপেক্ষ মূল্যায়নের মাধ্যমে লাইসেন্স প্রদানের যৌক্তিকতা যাচাইকরণ এবং ব্যক্তিগত সংশ্লিষ্টতা রয়েছে এমন কোনো গোষ্ঠী বা প্রতিষ্ঠানের ফাইল অনুমোদন না করার দাবি জানিয়েছেন তারা। অন্যথায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মর্যাদা এবং দেশের অর্থনীতির স্বার্থে অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিল সাধারণ সদস্যদের মতামতের ভিত্তিতে কঠোর কর্মসূচি দিতে বাধ্য হবে। 

প্যা/ভ/ম