জামায়াতের কাছে বিদ্রোহীদের ২১ আসন হারিয়েছে বিএনপি

Passenger Voice    |    ০৪:২৯ পিএম, ২০২৬-০২-১৩


জামায়াতের কাছে বিদ্রোহীদের ২১ আসন হারিয়েছে বিএনপি

দেশের ২৯৯টি আসনের মধ্যে বিএনপির বিদ্রোহী বা স্বতন্ত্র প্রার্থী ছিল ৭৮টিতে। এর মধ্যে দলীয় প্রার্থীরা জিতেছেন ৫০টিতে। আর বিদ্রোহীরা মাত্র ৭টি। জামায়াত ও তাদের জোটের প্রার্থীরা জিতেছেন ২১ আসনে। 

নির্বাচনের আসনভিত্তিক বেসরকারি ফলাফল পর্যালোচনা করে এই চিত্র পাওয়া গেছে। জামায়াতের কাছে সবচেয়ে আসন হারিয়েছে খুলনা বিভাগে- ৮টি। বিএনপির বিদ্রোহীরা সর্বোচ্চ চট্টগ্রাম বিভাগে তিনটি, ঢাকা বিভাগে দুটি, রংপুর ও ময়মনসিংহ বিভাগে একটি করে আসন জিতেছেন। 

আলোচিত বিদ্রোহীদের মধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে ১ লাখ ১৮ হাজার ৫৪৭ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন রুমিন ফারহানা। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি জোটের জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের জুনায়েদ আল হাবিব পেয়েছেন ৮০ হাজার ৪৩৪ ভোট। কুমিল্লা-৭ আসনে বিএনপির দলীয় রেদোয়ান আহমেদ পেয়েছেন ৪৮ হাজার ৫০৯ ভোট। বিপরীতে দলটির বিদ্রোহী আতিকুল আলম শাওনের প্রাপ্ত ভোট সংখ্যা ৯১ হাজার ৬৯০টি। 

এ ছাড়া, কিশোরগঞ্জ-৫ আসনে বিএনপির বিদ্রোহী শেখ মুজিবুর রহমান ইকবাল পেয়েছেন ৭৯ হাজার ২১০ ভোট। আর দলীয় প্রার্থী সৈয়দ এহসানুল হুদা ভোট পেয়েছেন ৬৬ হাজার ১১৮টি। 

জামায়াতের কাছে হারানো আসন
সিলেট-৫ আসনে বিএনপির প্রার্থী ছিল সবশেষ ১৯৯৬ সালে। ২০০১-এ জোটের হয়ে জামায়াত প্রার্থী দেয়। এবারের নির্বাচনে বিএনপির দলীয়র পাশাপাশি বিদ্রোহী প্রার্থীও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। জয়ী হয়েছেন জামায়াত জোটের খেলাফত মজলিসের মোহাম্মদ আবুল হাসান। দ্বিতীয় অবস্থানে বিএনপি জোটের জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের উবায়দুল্লাহ ফারুক। বিএনপির বিদ্রোহী ছিলেন মামুনুর রশীদ।

নীলফামারী-৪ আসনে বেসরকারিভাবে জয়ী হয়েছেন জামায়াতের আবদুল মুনতাকিম। ভোট পেয়েছেন ১ লাখ ২৪ হাজার ৮৬৫টি। বিএনপিদলীয় আবদুল গফুর সরকারের প্রাপ্ত ভোট সংখ্যা- ৮১ হাজার ৫২৬টি। বিদ্রোহী প্রার্থী ছিলেন রিয়াদ আরফান সরকার।

বিদ্রোহী থাকা ময়মনসিংহ-২ আসনটিও বিএনপি বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের কাছে হারিয়েছে। দলীয় প্রার্থী ছিলেন মোতাহার হোসেন তালুকদার। ১৯৯৬ সালের পর এ আসনে বিএনপি জিতেছিল কেবল ২০০১ সালে। 

আলোচিত আসনগুলোর মধ্যে নোয়াখালী-৬-এ জামায়াত জোটের এনসিপির প্রার্থী আবদুল হান্নান মাসউদ জয়ী হয়েছেন। এ ছাড়া, পাবনা-৩ ও ৪, রংপুর-৩, গাইবান্ধা-৫, ঝিনাইদহ-৪, যশোর-২ ও ৫, নড়াইল-২, বাগেরহাট-১, ২ ও ৪, সাতক্ষীরা-৩, শেরপুর-১, ঢাকা-১২, মাদারীপুর-১, চট্টগ্রাম-১৬ এবং ময়মনসিংহ-৬-এ জামায়াত বা তাদের জোটের প্রার্থীরা জিতেছেন।

বিএনপির বিদ্রোহীরা যেসব আসনে জিতেছেন
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২, কুমিল্লা-৫ ও কিশোরগঞ্জ-৫ আসনের পাশাপাশি বিএনপির বিদ্রোহী জিতেছেন ময়মনসিংহ-১ এ। জয়ী মোহাম্মদ সালমান ওমর হালুয়াঘাট উপজেলা শাখার বহিষ্কৃত যুগ্ম আহ্বায়ক। দলীয় প্রার্থী ছিলেন কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ। দুজনই ১ লাখের বেশি ভোট পেয়েছেন। ব্যবধান গড়ে দিয়েছে প্রায় ৭ হাজার ভোট। এ আসনে বিএনপি সবশেষ জিতেছিল ১৯৯৬ সালে।অন্য আসনগুলোর মধ্যে আছে টাঙ্গাইল-৩, দিনাজপুর-৫ এবং চাঁদপুর-৪।  

জামায়াতেরও বিদ্রোহী ছিল যেখানে
ময়মনসিংহ-৬ আসনে বিএনপির পাশাপাশি জামায়াতেরও বিদ্রোহী ছিল। ২০০১ সালের নির্বাচনে এই আসনে বিএনপির নিজস্ব প্রার্থী ছিল না। দলটির নেতৃত্বাধীন জোটের হয়ে মনোনয়ন পেয়েছিলেন জামায়াতের জসিমউদ্দিন। কিন্তু জোটের সিদ্ধান্তের বিপক্ষে গিয়ে প্রার্থী হন বিএনপি নেতা ইঞ্জিনিয়ার শামসুদ্দিন আহমেদ। প্রাপ্ত ভোটের হিসাবে জামায়াতের প্রার্থী তৃতীয় হন, আওয়ামী লীগের মোছলেম উদ্দিন দ্বিতীয় এবং প্রথম হন স্বতন্ত্র বা বিদ্রোহী শামসুদ্দিন।

এবার আসনটিতে বিএনপির দলীয় ও উপজেলা শাখার আহ্বায়ক আখতারুল আলমের বিদ্রোহী হন উপজেলা মহিলা দলের সাবেক সভাপতি আখতার সুলতানা। তিনি সাবেক এমপি ইঞ্জিনিয়ার শামসুদ্দিন আহমেদের স্ত্রী। অপরদিকে জামায়াতের কামরুল হাসানের বিদ্রোহী হন জেলা শাখার বহিষ্কৃত আমির জসিম উদ্দিন। ৭৫ হাজার ৯৪৬ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন জামায়াতের কামরুল হাসান। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির বিদ্রোহী বা স্বতন্ত্র আখতার সুলতানা। প্রাপ্ত ভোট- ৫২ হাজার ৬৬৯টি।

বিদ্রোহীদের চাপে দলীয়দের আমলনামা 
১৯৯৬ সাল থেকে পরের নির্বাচনগুলোতে বিএনপি পটুয়াখালী-৩ আসনে একবারও জিততে পারেনি। এবার দলটি মনোনয়ন দেয় জোটের প্রার্থী ও গণঅধিকার পরিষদের নুরুল হক নুরকে। ট্রাক প্রতীকে নুর পেয়েছেন ৯৭ হাজার ৩২৩ এবং জোটের বিদ্রোহী হাসান মামুন পেয়েছেন ৮১ হাজার ৩৬১ ভোট। 

হবিগঞ্জ-১ আসনে বিদ্রোহী শেখ সুজাত মিয়ার বিপক্ষে জয়ী হয়েছেন বিএনপির রেজা কিবরিয়া। কুমিল্লা-২ আসনে দলীয় প্রার্থী সেলিম ভূঁইয়ার বিপক্ষে বিদ্রোহী এমএ মতিন সুবিধা করতে পারেননি। মানিকগঞ্জ-১ আসনে বিএনপির জিন্নাহ কবীর পেয়েছেন ১ লাখ ৩৭ হাজার ৭৭৬ ভোট। বিপরীতে বিদ্রোহী তোজাম্মেল হক পেয়েছেন ৭৭ হাজার ৮১৮টি। মানিকগঞ্জ-৩ আসনে বিএনপিদলীয় আফরোজা খানম রিতার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বীতা গড়তে পারেননি বিদ্রোহী আতাউর রহমান। ভোটের হিসাবে দ্বিতীয় স্থানে আছেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মুহাম্মদ সাঈদ নূর।

রাজশাহী-৫ আসনে বিএনপি সবশেষ জিতেছিল ২০০১ সালে। এবার দলীয় প্রার্থী নজরুল ইসলাম আসনটি পুনরুদ্ধার করেছেন। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীতা হয়েছে জামায়াতের প্রার্থীর সঙ্গে। 

নারায়ণগঞ্জের চারটি আসনেও বিদ্রোহীরা দলীয় প্রার্থীর বিপরীতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়তে পারেননি। নারায়ণগঞ্জ-১ আসনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে। নারায়ণগঞ্জ-২ আসনেও এই দুই দলের প্রার্থীদের লড়াই হয়েছে। নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে বিএনপি ও জামায়াতের জোটের প্রার্থীদের মধ্যে।

বরিশাল-১ আসনে বিএনপিদলীয় প্রার্থী কেন্দ্রীয় কমিটির উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপন। বিদ্রোহী হিসেবে লড়েন কেন্দ্রের বহিষ্কৃত সদস্য আব্দুস সোবাহান। কিন্তু মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয় স্বপন ও জামায়াত প্রার্থী কামরুল ইসলাম খানের মধ্যে। যদিও কামরুলের চেয়ে স্বপন প্রায় দ্বিগুণ ভোটে এগিয়ে।

বিদ্রোহী থাকা যেসব আসনে বিএনপির দলীয়রা জিতেছেন সেগুলো হলো- ময়মনসিংহ-৩, ৭, ৯, ১০, টাঙ্গাইল-৪ ও ৫, নোয়াখালী-২, কিশোরগঞ্জ-১, কুষ্টিয়া-১, নাটোর-৩, হবিগঞ্জ-৪, পিরোজপুর-২, নেত্রকোনা-৩, পঞ্চগড়-২, নাটোর-১, রাজবাড়ী-২, ঠাকুরগাঁও-২, দিনাজপুর-২, নওগাঁ-১, ৩, ৬, নড়াইল-১, বাগেরহাট-৩, ঝালকাঠি-১, টাঙ্গাইল-১, জামালপুর-৩, ময়মনসিংহ-৮, ১১, নেত্রকোনা-৩, মুন্সিগঞ্জ-১, ৩, ঢাকা-৭, ১৮, নরসিংদী-৫, গোপালগঞ্জ-২, মাদারীপুর-২, সুনামগঞ্জ-৩, ৪, মৌলভীবাজার-৪, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১, ৫, কুমিল্লা-৯ এবং পার্বত্য খাগড়াছড়ি।