ভারতনীতি ঢেলে সাজাবে এনসিপি-জামায়াত জোট,আগে সম্মান তারপর আলোচনা

Passenger Voice    |    ০৩:৪৮ পিএম, ২০২৬-০২-১১


ভারতনীতি ঢেলে সাজাবে এনসিপি-জামায়াত জোট,আগে সম্মান তারপর আলোচনা

বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, আসন্ন নির্বাচন এবং ভারতের সাথে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ‘দ্য প্রিন্ট’-এ একটি বিশেষ কলাম লিখেছেন জাতীয় নাগরিক কমিটির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম নেতা নাহিদ ইসলাম। কলামটিতে তিনি মূলত বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের টানাপড়েন, এনসিপি-জামায়াত জোটের কৌশলগত কারণ এবং দিল্লির ‘আঞ্চলিক আধিপত্যবাদী’ নীতির সমালোচনা করেছেন।

নাহিদ ইসলাম তাঁর লেখায় উল্লেখ করেন যে, গত ১৫ বছর ধরে ভারত বাংলাদেশে একটি নির্দিষ্ট দলকে সমর্থন দিয়ে এসেছে, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে ভারত-বিরোধী মনোভাব তৈরি করেছে। তিনি স্পষ্টভাবে জানান, বাংলাদেশে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা দলের ওপর বাজি না ধরে ভারতের উচিত এদেশের সাধারণ মানুষের আকাঙ্ক্ষাকে সম্মান জানানো। সম্পর্ক হতে হবে ‘ন্যায্যতা ও সমমর্যাদার’ ভিত্তিতে, কোনো আধিপত্যের ভিত্তিতে নয়।

নিচের নাহিদ ইসলামের কলামটি তুলে ধরা হলো-

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ সংসদীয় নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশ এক ঐতিহাসিক রায় দিতে যাচ্ছে। এই নির্বাচনই নির্ধারণ করবে দেশ কি শেষ পর্যন্ত দুর্নীতি ও বংশীয় রাজনীতির দুষ্টচক্র ভেঙে বেরিয়ে আসতে পারবে, না কি তাতেই আটকা থাকবে। এটি আসলে 'জুলাইয়ের অঙ্গীকারের' ওপর একটি গণভোট—যে গণঅভ্যুত্থান মানুষের ভয়কে জয় করেছিল এবং পুরনো শাসকগোষ্ঠীর নৈতিক পতনকে উন্মোচিত করেছিল। এখন প্রশ্ন হলো, সেই আকাঙ্ক্ষা কি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাবে, না কি নিভৃতে তার টুঁটি চেপে ধরা হবে?

এই কঠিন পরিস্থিতিতে ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি) এমন একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে যা অনেকের কাছে বিরক্তিকর মনে হলেও ইতিহাস হয়তো একে একটি 'শীতল প্রয়োজনীয়তা' হিসেবে স্বীকৃতি দেবে। সেটি হলো—বাংলাদেশের বৃহত্তম ইসলামি দল জামায়াত-ই-ইসলামীর সঙ্গে নির্বাচনী জোট।

এটি কোনো আদর্শিক আবেগের বিয়ে নয়; বরং ঢাকার ক্ষমতার রূঢ় পাটিগণিত থেকেই এর জন্ম। এনসিপির সামনে দুটি পথ খোলা ছিল: হয় একা থেকে রাজনৈতিকভাবে বিলুপ্ত হওয়ার ঝুঁকি নেওয়া, অথবা সংসদে প্রবেশ করে জুলাইয়ের ম্যান্ডেটকে রক্ষা করা এবং ভেতর থেকে কাঠামোগত সংস্কার নিশ্চিত করা।

বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে ক্ষমতার বাইরে থাকার অর্থ হলো রাষ্ট্রীয়ভাবে মুছে যাওয়া। এখানে 'নিরপেক্ষতা' মানে হলো কৌশলী আত্মসমর্পণ। আসন্ন সংসদই ঠিক করবে জুলাইয়ের সনদ টিকে থাকবে কি না, এবং পাচার হওয়া কোটি কোটি টাকা ফেরত আসবে না কি তা আবার বৈধতা পাবে। এই কক্ষের বাইরে থাকা মানে বিপ্লবের সম্মুখসারির যোদ্ধাদের কণ্ঠস্বরকে স্তব্ধ করে দেওয়া।

সংগঠিত হওয়ার জন্য হাতে এক বছরেরও কম সময় থাকা এনসিপি কোনো শূন্যগর্ভ প্রতীকের ওপর ভিত্তি করে একটি গণআন্দোলনকে বাজি ধরতে পারেনি। বাংলাদেশে ক্ষমতার শূন্যতা সব সময় অলিগার্ক বা অসাধু ব্যবসায়ীরাই পূরণ করে।

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) সঙ্গে জোট করার বিকল্পটি যাচাই করে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। কারণ বিএনপি কোনো সংশোধিত রাজনৈতিক সত্তা নয়; বরং তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন এই দলটি প্রতিশোধ এবং ক্ষমতার পুনরাগমনের অপেক্ষায় থাকা একটি সংস্কারহীন যন্ত্র। ১৯৯০-এর দশকে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ মিলে লুটপাটের যে ব্যবস্থা তৈরি করেছিল, তা আজও অপরিবর্তিত। ২০০৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা নিয়ে বিএনপির কারসাজিই দেশে সামরিক হস্তক্ষেপের পথ প্রশস্ত করেছিল এবং শেষ পর্যন্ত ১৫ বছরের আওয়ামী স্বৈরশাসনের সুযোগ করে দিয়েছিল। সেই ক্ষত থেকে বাংলাদেশ এখনো রক্তক্ষরণ করছে।

গত ১৭ বছরের নির্বাসন তাদের কিছুই শেখাতে পারেনি। ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকেই বিএনপির চাঁদাবাজি নেটওয়ার্ক আবার সক্রিয় হতে শুরু করেছে। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয় নির্বাচনগুলোতেও সাধারণ ছাত্ররা—যাদের মধ্যে সেক্যুলার ও নারী শিক্ষার্থীরাও রয়েছেন—বিএনপির শিকারি মনোভাবের চেয়ে জামায়াত-সমর্থিত প্রার্থীদের ওপর বেশি আস্থা রেখেছেন। তাদের প্রার্থী তালিকায় থাকা ঋণখেলাপিদের আধিক্য এবং হঠাৎ আসা টাকার প্রবাহ প্রমাণ করে যে, পূর্ববর্তী সরকারকে অর্থায়ন করা অলিগার্করাই এখন বিএনপিকে ব্যবহার করে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করতে চাচ্ছে।

সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, বিএনপি আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসন করার এবং দিল্লির কাছে বর্তমান স্থিতাবস্থা বজায় রাখার সংকেত দিচ্ছে। এটি মূলত পুরনো দ্বিদলীয় শাসনেরই একটি রূপ। এনসিপি-জামায়াত জোট এখানে একটি সত্যিকারের ব্যতিক্রমী বিকল্প। এই জোটের কোনো দলই দুর্নীতিবাজ আমলা বা শিল্পপতিদের কাছে দায়বদ্ধ নয়।

সম্পদ পুনরুদ্ধার এবং অস্বাভাবিক অবকাঠামো চুক্তি বাতিল করার যে প্রতিশ্রুতি তারা (জামায়াত জোট) দিচ্ছে, তা বিশ্বাসযোগ্য। কারণ তাদের রক্ষা করার মতো কোনো 'চোর' নেই। সমালোচকরা 'অভিজ্ঞতার অভাব' নিয়ে কথা বললেও তারা ভুলে যাচ্ছেন যে, বাংলাদেশ দুর্নীতিবাজ সরকার চালানোর অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ, অভাব কেবল তা বন্ধ করার সদিচ্ছার।

পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রেও এই জোটের অবস্থান স্পষ্ট। ভারত কোনো নিরপেক্ষ প্রতিবেশী নয়; তারা আওয়ামী লীগকে মদত দিয়েছে এবং এখন তাদের পলাতক নেতৃত্বকে আশ্রয় দিচ্ছে। বিএনপি যখন 'জাতীয় স্বার্থের' কথা বলে নমনীয় হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে, এনসিপি-জামায়াত জোট তখন আগে 'মর্যাদা' এবং পরে 'সংলাপের' ওপর জোর দিচ্ছে।

ভারত কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে বাংলাদেশকে ঘিরে রেখেছে এবং সীমান্তে বেসামরিক নাগরিকদের হত্যাকাণ্ডকে একটি স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত করেছে, অথচ তারা ঠিকই ট্রানজিট সুবিধা দাবি করে যাচ্ছে। আত্মসম্মান বজায় রাখার দাবি না জানিয়ে এই শর্তগুলোর অধীনে আলোচনায় বসা কার্যত অপরাধে অংশ নেওয়ারই শামিল।

শহীদ ছাত্রনেতা ওসমান হাদি যেমনটি উল্লেখ করেছিলেন—পুরানো আমলের শাসনামলে আমরা যা হারিয়েছি, তা হলো আমাদের মর্যাদা। আর এই মর্যাদা ছাড়া জাতীয় 'স্বার্থের' কথা বলা স্রেফ একটি রূপকথা বা কল্পনা ছাড়া আর কিছুই নয়।

ধর্মীয় রাজনীতি এবং সংখ্যালঘু অধিকার নিয়ে উদ্বেগ বাস্তব এবং তা অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে ১৫ বছর ধরে মুসলিম রাজনৈতিক কণ্ঠস্বর দমন করে রাখলে দেশ সেক্যুলার হয়নি, বরং জনমনে ক্ষোভ আরও বেড়েছে। জামায়াত দেশের ইসলামি রাজনীতির মধ্যে সবচেয়ে শৃঙ্খলাবদ্ধ এবং আধুনিক ধারা হিসেবে পরিচিত।

সতর্কতা অবশ্যই প্রয়োজন। তবে অধিকার হরণ আগের দুই আমলেই ঘটেছে। অধিকার রক্ষা পায় আইনের শাসন ও চাঁদাবাজি বন্ধের মাধ্যমে, যারা বিশৃঙ্খলা থেকে মুনাফা লোটে তাদের বাগাড়ম্বরে নয়। এনসিপি-র তরুণ ভিত্তি এবং জুলাই আন্দোলনের শক্তি এই জোটকে একটি আধুনিক রাষ্ট্রের সীমারেখা মেনে চলতে বাধ্য করবে।

এই নির্বাচনে কোনো 'নিখুঁত পছন্দ' নেই, তবে একটি 'প্রকৃত পছন্দ' রয়েছে। একপাশে রয়েছে পরিবারতন্ত্র ও অলিগার্কদের অর্থায়নে পুষ্ট একটি পুরনো ব্যবস্থা, আর অন্যপাশে শৃঙ্খলাবদ্ধ ও নতুনদের একটি জোট, যারা বিচার ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

এনসিপি এই পথটি হালকাভাবে বেছে নেয়নি। তারা এটি বেছে নিয়েছে কারণ সাইডলাইনে বা মাঠের বাইরে দাঁড়িয়ে বিপ্লবকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব নয়, এবং বাংলাদেশ আর কোনো ‘কৃত্রিম ভোর’ বা নতুন করে প্রতারিত হওয়া সহ্য করার সামর্থ্য রাখে না।