বিমানের সাবেক এমডির বাসায় গৃহকর্মীকে নির্যাতন, লোমহর্ষক বর্ননা

Passenger Voice    |    ১০:০৮ এএম, ২০২৬-০২-১১


বিমানের সাবেক এমডির বাসায় গৃহকর্মীকে নির্যাতন, লোমহর্ষক বর্ননা

 

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) শফিকুর রহমান ওরফে সাফিকুর রহমানের বাসার শিশু গৃহকর্মীকে (মোহনা) থাকতে দেওয়া হতো বাথরুমে। বাথরুমের পেস্ট, টিস্যু খেয়ে বেঁচে ছিল সে। দীর্ঘক্ষণ পানির সংস্পর্শে থাকায় তার পায়ের নখগুলোতে পচন ধরেছে।

গৃহকর্মী শিশুকে নির্যাতনের মামলার আসামিদের রিমান্ড শুনানির সময় মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) শিশুটির দেওয়া জবানবন্দি থেকে এই নির্মমতার বর্ণনা তুলে ধরেন আদালত।

ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. জাকির হোসাইন শিশুকে নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরার আগে আদালতে বলেন, ‘বিষয়টি স্পর্শকাতর। চাঞ্চল্যকর। উচ্চপদস্থ একজন সরকারি কর্মকর্তার বাসায় এ ধরনের নির্যাতনের ঘটনা জাতির জানা প্রয়োজন।’

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উত্তরা পশ্চিম থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) রুবেল মিয়া গত ৮ ফেব্রুয়ারি আসামি সাফিকুর রহমান, তার স্ত্রী ও অপর দুই গৃহকর্মীর সাত দিন করে রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করেন। সেই আবেদনের ওপর শুনানির জন্য গতকাল তাদের কারাগার থেকে আদালতে হাজির করা হয়। বিকেলে শুনানির সময় মাথায় হেলমেট, বুকে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরিয়ে চার আসামিকে আদালতের কাঠগড়ায় নেওয়া হয়।

এসআই রুবেল মিয়া প্রথমে বক্তব্য দেন। মোহনাকে আইনি সহায়তা দেওয়া নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের (ডিএমসি) ফাহমিদা আক্তার রিংকিসহ বেশ কয়েকজন আইনজীবী রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন। শতাধিক আইনজীবী আসামিদের রিমান্ডে পাঠানোর পক্ষে সমর্থন জানান।

শুনানিতে ফাহমিদা আক্তার বলেন, ভিকটিমের ওপর চার আসামি পাশবিক নির্যাতন করেছেন। সাফিকুর রহমান কি কারণে নির্যাতন করেছে তা জানার জন্য রিমান্ড প্রয়োজন। ১২ বছরের নিচে শিশুকে নির্যাতন করা অপরাধ। বিথী (সাফিকুরের স্ত্রী) তাকে বাসায় রেখে নির্যাতন করেছেন। প্রথমে তারা শিশুটিকে খাটে রাখতো। পরে নিচে, এরপর বারান্দায় পরে টয়লেটে রাখে। টয়লেটের পেস্ট, টিস্যু খেয়ে বেঁচে ছিল শিশুটি। শীতের মধ্যে শীতের কাপড়ও তাকে দেওয়া হয়নি। 

তিনি বলেন, একটা ঘরের মধ্যে শিশুটির সঙ্গে যে ধরনের নির্যাতন করা হচ্ছে। তারা কাজের লোক হলেও বাইরে এসে প্রকাশ করতে পারতো। কিন্তু তারা তা করেনি। খুন্তি গরম করে তাকে ছ্যাঁকা দিত। সরকারি উচ্চ পর্যায়ের একজন কর্মকর্তার বাসায় এমন শিশু নির্যাতন দেশ ও জাতির জন্য লজ্জাকর। তাকে লোমহর্ষক নির্যাতন করা হয়েছে। এ সময় তাদের সর্বোচ্চ রিমান্ড প্রার্থনা করেন তিনি।

আসামিদের পক্ষে এ কে আজাদ রিমান্ড বাতিল চেয়ে জামিন আবেদন করেন। তিনি বলেন, সাফিকুর রহমান অফিস করতেন। সপ্তাহে মাত্র একটা দিন বাসায় থাকতেন। তিনি এ ঘটনার বিষয়ে অবগত না। তার রিমান্ড নামঞ্জুরের প্রার্থনা করেন তিনি। অপর আসামিদেরও রিমান্ড নামঞ্জুরের প্রার্থনা করেন এ আইনজীবী।

এরপর আদালত অপর ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে দেওয়া জবানবন্দির ভিত্তিতে শিশুটির শারীরিক অবস্থা বর্ণনা করেন।

বর্ণনায় দেখা যায়, ম্যাজিস্ট্রেট ১১ বছরের শিশুর শরীর পরীক্ষা করে দেখেছেন, তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে নির্যাতনের চিহ্ন। মাথা থেকে গলা পর্যন্ত গরম খুন্তি দিয়ে ছ্যাঁকা দেওয়ায় সেখানে ঘা হয়ে গেছে। হাতের বিভিন্ন অংশেও ছ্যাঁকা দেওয়া হয়েছে। লাঠি দিয়ে পেটানো হয়েছে। মসলা পেষার নোড়া দিয়ে তার হাতের আঙুলগুলো থেঁতলে দেওয়া হয়েছে। মাথার চুল টেনে তোলা হয়েছে। উরুতেও গরম খুন্তির ছ্যাঁকা দেওয়া হয়েছে। পায়ের আঙুলের নখে পচন ধরেছে।

আদালত শিশুর জবানবন্দির কিছু অংশ পড়েও শোনান। জবানবন্দিতে শিশু বলেছে, কারণে-অকারণে তাকে মারধর করতেন গৃহকর্ত্রী বীথি। বাসার অন্যরাও তাকে মারধর করতেন। পিঠে খুন্তি দিয়ে আঘাত করা হতো। চোখে মরিচের গুঁড়া দিত। বাথরুমের মধ্যে রাখতো। খাবার দিত না। পানির মধ্যে থাকার কারণে পায়ে পচন ধরে গেছে। পুরো শীতে শীতের পোশাক দেয়নি, খাবার দেয়নি। টয়লেটের পেস্ট, পানি খেয়ে থেকেছে। বাথরুম আর বাথরুমের আশপাশে তাকে আটকে রাখতো।

এ পর্যন্ত বলার পর উপস্থিত আইনজীবীরা আদালতকে জবানবন্দি আর না পড়ার অনুরোধ করেন। তারা বলেন, এই নির্মম নির্যাতনের বর্ণনা সহ্য করা যাচ্ছে না। একপর্যায়ে আদালত সাফিকুর রহমানের স্ত্রী বীথিকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি শিশুটিকে নির্যাতনের কথা আংশিক স্বীকার করেন।

পরে সাফিকুর রহমান ও গৃহকর্মী রুপালী খাতুনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পাঁচ দিন এবং তার স্ত্রী বিথীর সাত দিন এবং আরেক গৃহকর্মী সুফিয়া বেগমের ৬ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে আদালত।

এর আগে গ্রেপ্তারের পর গত ২ ফেব্রুয়ারি এই মামলায় শফিকুর রহমান ওরফে সাফিকুর রহমান ও তার স্ত্রী বিথীসহ চারজনকে কারাগারে পাঠানো হয়।

মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, উত্তরা ৯ নং সেক্টরের শফিকুর রহমানের বাসার নিরাপত্তাকর্মী জাহাঙ্গীর, গোলাম মোস্তফাকে জানায় ওই বাসায় বাচ্চা দেখাশোনার জন্য ছোট মেয়ে খুঁজচ্ছে। পরে তাদের সঙ্গে দেখা করেন মোস্তফা।

তারা জানায়, যাকে রাখবে বিবাহসহ যাবতীয় খরচ বহন করবে। তাতে সম্মত হয়ে গত বছরের জুন মাসে মোহনাকে ওই বাসায় কাজে দেন মোস্তফা। সর্বশেষ গত বছরের ২ নভেম্বর ওই বাসায় মোহনাকে সুস্থ অবস্থায় দেখে আসেন বাবা। তবে এরপর আর মোহনাকে পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে দেননি আসামিরা

গত ৩১ জানুয়ারি বিথী মোস্তফাকে ফোন করে জানান, মোহনা অসুস্থ। তাকে নিয়ে যেতে। পরে মোহনাকে আনতে যান গোলাম মোস্তফা। সন্ধ্যা ৭টার দিকে গোলাম মোস্তফার কাছে মোহনাকে বুঝিয়ে দেন সাথী। তখন মোস্তফা দেখতে পান, মোহনার দুই হাতসহ শরীরের বিভিন্নস্থান গুরুতর জখম।

মোহনা ভালোভাবে কথাও বলতে পারে না। সাথীকে এর কারণ জিজ্ঞাসা করলে সদুত্তর দিতে পারে না। পরে তিনি মোহনাকে গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করান। পরে জিজ্ঞাসাবাদে মোহনা জানায়, ২ নভেম্বর মোস্তফা তার সঙ্গে দেখা করে যাওয়ার পর থেকে বিভিন্ন সময়ে অকারণে শফিকুর রহমান এবং বিথীসহ অজ্ঞাতনামা আসামিরা তাকে মারধরসহ খুন্তি আগুনে গরম করে তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে ছেঁকা দিয়ে গুরুতর জখম করে।

এ ঘটনায় হোটেল কর্মচারী বাবা গোলাম মোস্তফা বাদী হয়ে উত্তরা পশ্চিম থানায় মামলাটি দায়ের করেন।