নির্বাচন ঘিরে মোটরসাইকেলের রমরমা ব্যবসা

Passenger Voice    |    ১২:১৬ পিএম, ২০২৬-০২-১০


নির্বাচন ঘিরে মোটরসাইকেলের রমরমা ব্যবসা

গণপরিবহনের নাজুক অবস্থা ও যানজট এড়িয়ে স্বস্তিতে যাতায়াতের জন্য দেশে দিন দিন বাড়ছে মোটরসাইকেলের জনপ্রিয়তা। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের মোটরসাইকেল বাজারে আবারও চাঙাভাব ফিরে এসেছে। গত কয়েক মাসে রাজধানী ঢাকাসহ বড় শহর ও জেলা পর্যায়ে মোটরসাইকেলের বিক্রি উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। রাজনৈতিক কর্মসূচি, নির্বাচনি প্রচার, ব্যক্তিগত যাতায়াত এবং নিরাপদ চলাচলের প্রয়োজনীয়তার কারণে দুই চাকার এই বাহনের চাহিদা বাড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সোনারগাঁও মোটরসাইকেলের ডিলার বলেছেন, নির্বাচন ঘনিয়ে এলে সাধারণত পরিবহন খাতে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। এ সময় গণপরিবহন সংকট, যানজট ও হরতাল-অবরোধের আশঙ্কায় অনেকেই ব্যক্তিগত বাহনের দিকে ঝুঁকেন। এর মধ্যে মোটরসাইকেল তুলনামূলকভাবে কম খরচে সহজ যাতায়াতের মাধ্যম হওয়ায় ক্রেতাদের প্রথম পছন্দে পরিণত হয়েছে।

নির্বাচন সামনে রেখে বিক্রি বেড়েছে। সাধারণত ১২০ থেকে ১৫০ সিসি মোটরসাইকেলের চাহিদা বেশি। সুজুকি, বাজাজ, হিরো, হোন্ডা ও ইয়ামাহা–এই কোম্পানিগুলোর চাহিদা সব থেকে বেশি। তারা আশাবাদী যে নির্বাচনের পরও এমন বেচাকেনা থাকবে।

বাংলাদেশে সাধারণত দৈনন্দিন চলাচলের জন্য সচরাচর ১০০-১২৫ সিসির মোটরসাইকেলগুলোর দাম প্রায় ৯৫ হাজার থেকে ১ লাখ ৬৫ হাজার টাকা পর্যন্ত। মাঝারি-স্পোর্টস মোটরসাইকেলগুলোর (১৫০-১৬০ সিসি) দাম ১ লাখ ৯০ হাজার থেকে ২ লাখ ৯০ হাজার পর্যন্ত। প্রিমিয়াম উচ্চ ক্ষমতার বা স্টাইলিশ মডেলের দাম ৬ লাখ ৭ হাজার থেকে ৬ লাখ ৭৮ হাজার পর্যন্ত।

রাজধানী শাহবাগের রানার শোরুমের ম্যানেজার রফিকুল ইসলাম ও অন্য মোটরসাইকেল ব্যবসায়ীরা জানান, দীর্ঘদিন ধরে মোটরসাইকেলের বিক্রিতে খরা ছিল, কিন্তু নির্বাচনের আভাস ও প্রচার শুরু হওয়ায় নতুন করে ক্রেতাদের আগ্রহ বেড়েছে। অনেক মানুষ এখন নতুন বা ব্যবহার করা মোটরসাইকেল কিনছেন–এর মধ্যে অনেকেই নির্বাচনি প্রচার, যাত্রা-যান বা অন্যান্য রাজনৈতিক কার্যক্রমের জন্য মোটরসাইকেল চাচ্ছেন।

মোটরসাইকেল বিক্রেতারা বলেন, ‘দিন দিন বড় হচ্ছে মোটরসাইকেলের বাজার। এর সঙ্গে নতুন যোগ হয়েছে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রচারের বিষয়টি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের পর মোটরসাইকেল বিক্রিতে খরা নামলেও এখন ভোটের হাওয়াকে কেন্দ্র করে ঘুরে দাঁড়িয়েছে এই শিল্প। অনেকেই নতুন মোটরসাইকেল কিনছেন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।’

রাজধানীর বংশাল এলাকার মোটরসাইকেল ব্যবসায়ী আবদুর রহমান বলেন, ‘নির্বাচন সামনে রেখে মাঠপর্যায়ে চলাচল বেড়েছে। এর প্রভাব সরাসরি মোটরসাইকেল বিক্রি বেড়েছে। গত কয়েক সপ্তাহে বিক্রি আগের তুলনায় বেশ ভালো। বিশেষ করে কম দামের ও মাইলেজ ভালো মডেলগুলোর বিক্রি বেশি হচ্ছে। আগামী কয়েক সপ্তাহে এই ধারা বজায় থাকবে বলে আশা করছি।’

দেশে মোটরসাইকেল বিক্রির তথ্য রাখে এ শিল্পের উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ও বিপণন কোম্পানিগুলো। তাদের তথ্যমতে, ২০২৫ সালের নভেম্বর-ডিসেম্বর পর্যন্ত মোটরসাইকেল বিক্রি হয়েছে সোয়া চার লাখের বেশি। এটি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৮১ হাজার বেশি। 

বিক্রি ও প্রবৃদ্ধির চিত্র:
২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ১১ মাসে ৪ লাখ ২৭ হাজার ৮০টি মোটরসাইকেল বিক্রি হয়েছে। ২০২৪ সালের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ৩ লাখ ৪৬ হাজার ৩২টি। প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২৪ শতাংশ। গত নভেম্বর মাসে ৩৩ হাজার ৭২৭টি মোটরসাইকেল বিক্রি হয়েছে, যেখানে আগের বছর একই মাসে বিক্রি হয়েছিল ৩১ হাজার ২৮৮টি। প্রবৃদ্ধির পরিমাণ ৭ দশমিক ৮ শতাংশ। অর্থবছরের হিসাবে ২০২৫-২৬ সালের প্রথম পাঁচ মাসে (জুলাই-নভেম্বর) বিক্রির পরিমাণ ১ লাখ ৭৭ হাজার ৯১৭টি, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ১ লাখ ৪৭ হাজার ৯০৪টি। প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ২১ শতাংশে।

ব্যবসায়ীরা সামনের দিনগুলোতে মোটরসাইকেলের চাহিদা বৃদ্ধির প্রত্যাশা করলেও পরিবহন বিশেষজ্ঞরা দেশে বাহনটির সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার বিষয়টিতে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। তারা বলছেন, চালকদের অদক্ষতা, আইন না মানার প্রবণতা, মানহীন হেলমেট ব্যবহার, বেপরোয়া মনোভাব পরিবহন ব্যবস্থায় যেমন বিশৃঙ্খলা বাড়িয়ে দিচ্ছে, তেমনি দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির কারণ হচ্ছে। সড়কে মৃত্যুর অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা। স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ২ হাজার ৬৭১ জন নিহত হয়েছেন, যা সড়কে মোট মৃত্যুর ৩৬ শতাংশের বেশি।

বিআরটিএ তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, দেশে এ যাবৎকালের মধ্যে এক বছরে সর্বোচ্চ মোটরসাইকেল নিবন্ধিত হয়েছিল ২০২২ সালে। ওই বছর সারা দেশে পাঁচ লাখের বেশি মোটরসাইকেল নিবন্ধন দেয় সংস্থাটি। যদিও এরপর ধারাবাহিকভাবে কমতে থাকে নিবন্ধন। ২০২৩ সালে বিআরটিএ থেকে নিবন্ধন পায় ৩ লাখ ১০ হাজারের বেশি মোটরসাইকেল। ২০২৪ সালে তা আরও কমে দাঁড়ায় ২ লাখ ৬২ হাজার ৭১৫টিতে।

দেশের মোটরসাইকেল বিপণনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তারা জানান, ২০২৩ সালে দেশের অর্থনৈতিক সংকট এবং ২০২৪ সালে রাজনৈতিক অস্থিতিশীল পরিবেশ মোটরসাইকেল বিক্রিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। আবার এ সময়ে কম দামের মোটরসাইকেলের বদলে বাজারে উচ্চ দাম ও উন্নত প্রযুক্তির মোটরসাইকেলের চাহিদা বেড়ে যায়। এ কারণে ইউনিট হিসেবে মোটরসাইকেলের বিক্রি কমলেও টাকার অঙ্কে বাহনটির বাজার প্রসারিত হয়েছে। ২০২৫ সালেও এ ধারা অব্যাহত আছে এবং এর সঙ্গে মোটরসাইকেল বিক্রিতেও প্রবৃদ্ধি হয়েছে।

দেশে মোটরসাইকেল উৎপাদনের অন্তত ৯টি কারখানা রয়েছে। জাপানের ইয়ামাহা, হোন্ডা ও সুজুকি, ভারতের হিরো, বাজাজ ও টিভিএস এবং চৌদ্দগ্রামে রয়্যাল এনফিল্ডের সংযোজন কারখানা রয়েছে। দেশীয় ব্র্যান্ড হিসেবে আছে রানার অটোমোবাইলস। সরকার ২০১৮ সালে মোটরসাইকেল শিল্প উন্নয়ন নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। নীতির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলো দেশে কারখানা স্থাপন করেছে। লক্ষ্য ছিল ২০২৭ সালের মধ্যে বার্ষিক উৎপাদন ১০ লাখ।

দেশে উৎপাদিত মোটরসাইকেলের অংশ বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে। স্থাপিত কারখানাগুলোতে ১৫০ সিসি পর্যন্ত বাইক উৎপাদন হয়। ভবিষ্যতে পুরো যন্ত্রপাতি স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশাবাদী।

অর্থনীতির উন্নতি, রাইড-শেয়ারিং খাত ও শহর-গ্রামের চলাচলের প্রয়োজনীয়তা বৃদ্ধির ফলে মোটরসাইকেল শিল্পে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পেয়েছে। ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড ও মালেশিয়ায় যেমন মোটরসাইকেল শিল্প অর্থনীতিতে অবদান রাখছে, বাংলাদেশেও একইভাবে শিল্পের অবদান বাড়ছে।

মূলত, দেশীয় ও বৈদেশিক সংস্থাগুলোর যৌথ প্রচেষ্টায় মোটরসাইকেল শিল্প দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। সামনের দিনগুলোতে রপ্তানি, স্থানীয় উৎপাদন ও বিক্রিতে আরও উন্নতি আশা করা যাচ্ছে। মোটরসাইকেলের জনপ্রিয়তা, সাশ্রয়ী মূল্য এবং নির্বাচনের প্রভাবের কারণে বাজারে ইতিবাচক প্রবণতা অব্যাহত থাকবে।

ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা:
বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পরিসংখ্যান থেকে বলা যায়, ২০২৬ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের মোটরসাইকেল বাজার বার্ষিক ৮ দশমিক ৫ শতাংশ হারে বাড়বে। চলতি বছর রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা থাকলে এ খাতের বাজার উল্লেখযোগ্য আকারে বাড়বে। উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, ২০২১ সালের শেষে মোটরসাইকেলের ইঞ্জিন ক্ষমতা ৩৫০ সিসি থেকে ৫০০ সিসি পর্যন্ত বাড়ানোর পর বিক্রি দ্রুত বাড়ছে। গত বছর এ খাতের বিক্রিতে প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ১৯ শতাংশ। তাদের মতে, গড়ে প্রতিটি মোটরসাইকেলের দাম ২ লাখ হলেও বর্তমান বাজারের আকার প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, নগরায়ণ, রাইড-শেয়ারিং এবং ব্যক্তিগত যাতায়াতের চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে বিক্রির বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সাল নাগাদ বিক্রি বেড়ে ৮ লাখ ইউনিট হতে পারে। তাতে বাজারের আকার দাঁড়াবে প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকায়।


প্যা.ভ.ম