শিরোনাম
Passenger Voice | ১০:৩৯ এএম, ২০২৬-০২-০৮
ব্যাংক কোম্পানি আইনের প্রস্তাবিত সংশোধনীতে ‘ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি’সংক্রান্ত বিধান বহাল রাখার পাশাপাশি সেটিকে আরও শক্তিশালী করার জোরালো দাবি জানিয়েছেন দেশের ব্যাংকাররা। সেই সঙ্গে ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর বিধিনিষেধ যেমন- ট্রেড লাইসেন্স বাতিল, নতুন কোম্পানি গঠনে বাধা, বিদেশ ভ্রমণ, জমি ও ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রেশন এবং রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ারও দাবি জানানো হয়েছে। বেসরকারি ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) পক্ষ থেকে সম্প্রতি গভর্নরের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে এসব দাবি জানানো হয়।
সংগঠনটি বলছে, আইনে ইচ্ছাকৃত খেলাপির বিধান বাদ দেওয়া হলে খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ আরও দুর্বল হয়ে পড়বে এবং আমানতকারীদের অর্থ ঝুঁকিতে পড়বে। তাই আমানতকারীদের সুরক্ষা ও আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতার স্বার্থে আলোচ্য বিধান বাতিল না করে আরও কার্যকর ও শক্তিশালী করতে তিনটি প্রস্তাব করা হয়েছে। এগুলো হলো- নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পুরো টাকা পরিশোধ করলে সুদ আংশিক বা পুরোপুরি মওকুফের সুযোগ রাখা। ইচ্ছাকৃত খেলাপির বিরুদ্ধে কোন আইনে ও কোন ধারায় মামলা হবে তা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা। এ ছাড়া রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক সুবিধা বাতিলের নিয়ম ও প্রক্রিয়া আইনে পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করা।
গত ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত ব্যাংকার্স সভায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে বিদ্যমান আইন থেকে এ সংক্রান্ত বিধান বাদ দেওয়ার প্রস্তাব উত্থাপন করা হলে ব্যাংক এশিয়া, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক ও ট্রাস্ট ব্যাংকসহ কয়েকটি বেসরকারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকরা সংশ্লিষ্ট বিধান বহাল রাখার পক্ষে মত দেন। তাদের মতে, ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি ঘোষণা খেলাপি ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে কার্যকর চাপ তৈরি করে এবং অনেক ক্ষেত্রেই ঋণগ্রহীতাদের দ্রুত সমঝোতায় আনতে সহায়ক হয়।
এবিবির চেয়ারম্যান ও দ্য সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিন আমাদের সময়কে বলেন, ব্যাংকার্স সভায় ‘ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপির বিধান বাদ দেওয়ার প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়। সেখানে ব্যাংকাররা এই বিধান বাদ না দিয়ে বহাল রাখার দাবি জানালে গভর্নর বিষয়টি পর্যালোচনা করে দেখার আশ^াস দেন এবং এ বিষয়ে লিখিতভাবে চিঠি দেওয়ার কথা বলেন। আমরা সে মোতাবেক ইতোমধ্যে গভর্নরের কাছে চিঠি পাঠিয়েছি।
দেশের ব্যাংক খাতে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো খেলাপি ঋণ। এ সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা, সুশাসন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এ অবস্থায় খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে ২০২৩ সালের সংশোধিত ব্যাংক কোম্পানি আইনে ‘ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি’ ও ‘ঋণখেলাপি’ এই দুটি শ্রেণিতে খেলাপির সংজ্ঞা নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের ব্যাংক খাতে চলমান সংস্কারের প্রেক্ষাপটে ব্যাংক কোম্পানি আইনের প্রস্তাবিত সংশোধনীর খসড়ায় ‘ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি’ শনাক্ত ও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিধানটি বাদ দেওয়া হয়। ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি চিহ্নিতকরণ জটিলতা এবং এর অপব্যবহার রোধে এই ধারা বাদ দেওয়া হয়েছে। তবে অপব্যবহারের আশঙ্কা উড়িয়ে দিয়ে এবিবি বলছে, যারা সামর্থ্য থাকার পরও ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণ ফেরত দেন না, তাদের দমনে ব্যাংক কোম্পানি আইনে বিদ্যমান কঠোর ব্যবস্থাগুলো কোনোভাবেই শিথিল করা উচিত হবে না। দেশের অর্থনীতিবিদরাও মনে করেন, খেলাপি নিয়ন্ত্রণে আইনে ইচ্ছাকৃত খেলাপির বিধান বাদ দেওয়া ঠিক হবে না।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) সাবেক মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমেদ চৌধুরী আমাদের সময়কে বলেন, যাদের পরিশোধ সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণ ফেরত না দেওয়ার প্রবণতা রয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যাংক কোম্পানি আইনের কঠোর বিধান কার্যকর না থাকলে ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফিরবে না। কারণ ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি চিহ্নিত করার আইনি ভিত্তি দুর্বল করা হলে ঋণ ফেরত না দেওয়ার প্রবণতা আরও বাড়বে। তখন খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ অসম্ভব হয়ে পড়বে। তিনি আরও বলেন, কে ইচ্ছাকৃত খেলাপি, আর কে অনিচ্ছাকৃত খেলাপি সেটা চিহ্নিত করার দায়িত্ব ব্যাংকগুলোরই। এখানে জটিলতার কিছু নেই।
গত ৫ ফেব্রুয়ারি গভর্নর বরাবর পাঠানো এবিবির চিঠিতে বলা হয়, ব্যাংকঋণ খেলাপি হওয়ার দুই ধরনের কারণ থাকে। এক ধরনের গ্রাহক আছেন, যারা ব্যবসায়িক ক্ষতি, মন্দা বা কোনো দুর্ঘটনার কারণে অর্থ ফেরত দিতে পারেন না। অর্থাৎ যাদের পরিশোধ সক্ষমতা নেই। অন্যদিকে আরেক ধরনের গ্রাহক রয়েছেন যাদের পরিশোধ সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও ইচ্ছাকৃতভাবে টাকা ফেরত দেন না। তাদেরকেই আমরা ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি বলি। ব্যাংকগুলো খুব সহজেই এই ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের আলাদা করে চিহ্নিত করতে পারে।
এবিবি বলছে, বর্তমান ব্যাংক কোম্পানি আইনের ধারায় ইচ্ছাকৃত খেলাপি চিহ্নিত করার যে সংজ্ঞা ও ভিত্তি রয়েছে যেমন ঋণের অর্থ ভিন্নখাতে ব্যবহার, ভুয়া তথ্য দিয়ে ঋণ গ্রহণ কিংবা ব্যাংকের অগোচরে জামানত সরিয়ে ফেলা ইত্যাদি বাস্তবসম্মত ও কার্যকর। মূলত এই কারণগুলোর জন্যই দেশে বিপুল পরিমাণ ঋণখেলাপি হয়েছে। এই ধারা কার্যকর থাকায় ব্যাংকগুলো এখন অনেক ইচ্ছাকৃত খেলাপিকে শনাক্ত করতে পারছে।
চিঠিতে বলা হয়, বাংলাদেশ ব্যাংকের বিদ্যমান নীতিমালায় ইচ্ছাকৃত খেলাপি ঘোষণার প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও ন্যায্য। প্রমাণসহ আলাদা ইউনিটের মাধ্যমে যাচাই, গ্রাহককে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ, ব্যাংকের শীর্ষ ব্যবস্থাপনার অনুমোদন এবং বাংলাদেশ ব্যাংকে আপিলের সুযোগ থাকায় যথেচ্ছভাবে কাউকে ইচ্ছাকৃত খেলাপি ঘোষণা করার সুযোগ নেই। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, গত বছর সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা, যা মোট ঋণের প্রায় ৩৬ শতাংশ। অর্থঋণ আদালতে মামলার চাপ অনেক বেশি থাকায় ঋণ আদায় প্রক্রিয়া ধীরগতিতে চলছে। এই পরিস্থিতিতে ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা দুর্বল করা হলে ব্যাংকখাত আরও ঝুঁকিতে পড়বে বলে মনে করছে সংগঠনটি। এবিবির মতে, যেসব গ্রাহক যৌক্তিক কারণে খেলাপি হন, তাদের ক্ষেত্রে অর্থঋণ আদালত আইনই যথেষ্ট। কিন্তু যারা সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণ পরিশোধ করেন না, তাদের বিরুদ্ধে ব্যাংক কোম্পানি আইনের কঠোর বিধান শিথিল করা হলে ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ভেঙে পড়বে। আমানতকারীদের অর্থ সুরক্ষা ও ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর বিধিনিষেধ যেমন বিদেশ ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা, ট্রেড লাইসেন্স বাতিল, নতুন কোম্পানি গঠনে বাধা, জমি ও ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রিতে নিষেধাজ্ঞা, রাষ্ট্রীয় সম্মাননা বা অনুষ্ঠানে নিষেধাজ্ঞাসহ বিদ্যমান সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় চাপ বজায় রাখার দাবি জানানো হয় চিঠিতে।
চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়, ভারত, চীন, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা ও সিঙ্গাপুরসহ অনেক দেশেই ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা রয়েছে। বিশেষ করে ভারত ও চীনে ব্যাংকিং সুবিধা বন্ধ এবং জনসমক্ষে নাম প্রকাশের মতো কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত 2019 - 2026 PassengerVoice | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Developed By Muktodhara Technology Limited.
পাবলিক মতামত