শিরোনাম
Passenger Voice | ১০:৪৯ এএম, ২০২৬-০২-০৭
সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি করতে কঠোর অবস্থান নিয়েছে সরকার। আন্দোলনকারী ১৫ নেতার সম্পদের তথ্য তলব করতে বন্দর কর্তৃপক্ষ দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) চিঠি পাঠিয়েছে। এই সিদ্ধান্তে আন্দোলনকারীরা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। গতকাল শুক্রবার বন্দর চেয়ারম্যানের কুশপুতুল দাহ করেছেন। শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ) সভা করে রোববার থেকে ফের কর্মবিরতি শুরু হলে তা সমর্থন করার আগাম বার্তা দিয়ে রেখেছে। এদিকে ব্যবসায়ীরা বলছেন, ফের কর্মবিরতি শুরু হলে রমজানের আগে অপূরণীয় ক্ষতির মুখে পড়বেন। আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি সুরাহা করার ওপর জোর দিচ্ছেন তারা।
চট্টগ্রাম বন্দর সূত্রে জানা গেছে, জলসীমায় থাকা ১১৮টি জাহাজে আছে প্রায় ৫০ লাখ টন পণ্য। এর মধ্যে আছে ভোগ্যপণ্য, শিল্পের কাঁচামাল। এর বাইরে জেটিতে জমে আছে ৩৭ হাজার আমদানি কনটেইনার। ২১টি বেসরকারি ডিপোতে রপ্তানি কনটেইনার আছে ১৪ হাজারের বেশি। ভোট ও রমজানের আগে এসব পণ্য খালাসের পরিকল্পনা থাকলেও টানা ছয় দিনের কর্মবিরতিতে তা সম্ভব হয়নি। এ জন্য বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ), বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ), শিপিং এজেন্ট, বার্থ অপারেটর, কাস্টমস, ডিপোসহ বন্দর ব্যবহারকারী অন্তত ২০টি প্রতিষ্ঠানের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ক্ষতি এরই মধ্যে ছাড়িয়ে গেছে ২০ হাজার কোটি টাকার ঘরে। চট্টগ্রাম বন্দর দু’দিনের জন্য সচল হলেও চিন্তা কাটছে না ব্যবসায়ীদের। এই ৪৮ ঘণ্টায় আটকে থাকা পণ্যের ২০ শতাংশও খালাস করা সম্ভব না।
বিজিএমইএর সাবেক প্রথম সহসভাপতি এ এম সালাম বলছেন, ‘বন্দরে পণ্য খালাসের অপেক্ষায় থাকা জাহাজগুলোতে অন্তত ৫০ লাখ টন পণ্য আছে। এগুলোর দাম হবে কয়েক হাজার কোটি টাকা। এসব জাহাজের বেশ কয়েকটিতে কাঁচামাল আছে। আবার শুধু ডিপোতে রপ্তানি কনটেইনার জমেছে ১৪ হাজারের বেশি। বন্দরে আমাদের আটকে থাকা পণ্যের দাম ১৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি। রোববার থেকে যদি আবার কর্মবিরতি শুরু হয়, তাহলে অপূরণীয় ক্ষতির মুখে পড়ব। যে কোনো মূল্যে বন্দর সচল রাখার ওপর মনোযোগ থাকা উচিত সরকারের।’
সি কম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিরুল হক বলেন, ‘বন্দর ও ডিপোর পণ্যজট ছাড়াতে লাগবে অন্তত ১৫ দিন। এর মধ্যে আবার নতুন জাহাজ আসবে। সেগুলো থেকেও পণ্য খালাস করতে হবে। এটি নিয়ে কারও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা আছে বলে মনে হচ্ছে না। যার যার অবস্থান থেকে সে অনড় থাকলে সামনে ভয়াবহ অবস্থা হবে।’
বন্দর ব্যবহারকারী বিভিন্ন পক্ষের গত ছয় দিনে ২০ হাজার কোটি টাকারও বেশি ক্ষতি হয়েছে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা। দুই দিন পর যদি আবার কর্মবিরতি শুরু হয়, তবে এই ক্ষতি আরও কয়েক গুণ বাড়বে বলে তাদের শঙ্কা। শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান শফিকুল আলম জুয়েল জানান, বন্দরে পণ্য খালাস করতে আসা একটি বড় জাহাজ অলস বসে থাকলে দিনে বাড়তি গুনতে হয় ২০ লাখ থেকে ২২ লাখ টাকা। বন্দর সীমানায় ১১৮টি জাহাজ আছে।
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের কর্মকর্তারা বলছেন, গত ছয় দিনে প্রায় ২০০ কোটি টাকার রাজস্ব কম আদায় হয়েছে তাদের। ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সহসভাপতি খায়রুল আলম সুজন বলেন, ‘আর্থিক ক্ষতি ব্যাপক। তবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হচ্ছে ভাবমূর্তির।’
গত ছয় দিনে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ক্ষতির মুখোমুখি হয়েছে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশন, বার্থ অপারেটর, শতাধিক পরিবহন মালিক ও সহস্রাধিক শ্রমিক। চট্টগ্রাম বন্দরে প্রতিদিন অন্তত আট হাজার গাড়ি পণ্য খালাস করে। কর্মবিরতি চলাকালে এক-তৃতীয়াংশে নেমেছে গাড়ির সংখ্যা। দুই দিন একটি গাড়িও পণ্য নিতে ঢোকেনি বন্দরে।
কর্মবিরতি শুরুর আগে বন্দরে পণ্য নিয়ে অপেক্ষমাণ জাহাজ ছিল ৯৭টি। কর্মবিরতির মাঝে একপর্যায়ে এটি বেড়ে দাঁড়ায় ১১৮টিতে। এসব জাহাজের প্রায় অর্ধেক আছে চাল, ডাল, তেল, চিনি, ছোলাসহ বিভিন্ন ধরনের খাদ্যসামগ্রী। রমজানকে সামনে রেখে আমদানিকারকরা এসব পণ্য এনেছিলেন।
আটকে থাকা জাহাজে আছে টিকে গ্রুপের পণ্যও। এই প্রতিষ্ঠানের পরিচালক মো. শফিউল আতাহার তসলিম বলেন, ‘রমজানকে সামনে রেখে আমাদের মতো অনেক ব্যবসায়ী এবার আগেভাগে পণ্য এনেছে। সামনে ভোট থাকায় এমনটি করা হয়েছিল। লাগাতার কর্মবিরতি পথে বসিয়ে দেবে অনেক ব্যবসায়ীকে।’
কর্মবিরতি শুরুর আগে চট্টগ্রাম বন্দরের জেটিতে আমদানি পণ্যবোঝাই কনটেইনার ছিল ৩২ হাজার ১১১টি। কর্মবিরতির একপর্যায়ে সেটি বেড়ে দাঁড়ায় ৩৭ হাজার ৩১২টি। দিনে গড়ে বন্দর থেকে ২০ ফুট এককের (টিইউইউ) পাঁচ হাজার পণ্যবাহী কনটেইনার সরবরাহ হয়। কর্মবিরতির ছয় দিনে মোট সরবরাহ হয়েছে ৮ হাজার ৮৬১ কনটেইনার। এ হিসাবে গড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৪৭৬ কনটেইনার। পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে ব্যবসায়ীরা এই ছয় দিনে পণ্যবোঝাই কনটেইনার সরবরাহ নিতে পারতেন প্রায় ৩০ হাজার। এজন্য জেটিতে ক্রমশ বেড়েছে আমদানি কনটেইনার। দুই দিন কর্মবিরতিতে এসব কনটেইনারের ১০ শতাংশও খালাস হবে না।
২১টি কনটেইনার ডিপোতে গার্মেন্টসের শতভাগ রপ্তানি পণ্য ও ৬৭ ধরনের আমদানি পণ্য ওঠানামার কাজ করা হয়। স্বাভাবিক সময়ে ডিপো থেকে বন্দরে প্রতিদিন রপ্তানি কনটেইনার যায় গড়ে ২ হাজার ৮০০। আমদানি কনটেইনার আসে গড়ে ১ হাজার ২০০। কর্মবিরতি চলাকালে এক পর্যায়ে রপ্তানি কনটেইনার গেছে ১৯৫টি। আমদানি কনটেইনার ডিপোতে এসেছে ১৪টি। কর্মবিরতি শুরুর আগের দিন ডিপোতে রপ্তানি কনটেইনার ছিল ৮ হাজার ১৭টি। আমদানি কনটেইনার ছিল ৯ হাজার ২টি। ৬ দিনের কর্মবিরতির প্রভাবে ডিপোতে একপর্যায়ে রপ্তানি কনটেইনার জমেছে ১৪ হাজার ২৪টি। আমদানি কনটেইনার কমে হয়েছে ৭ হাজার ৩২টি।
ডিপো মালিক সমিতির মহাসচিব রুহুল আমিন সিকদার বলেন, ‘ডিপোতে যে পরিমাণ রপ্তানি কনটেইনার জমেছে তা স্বাভাবিক করতে অন্তত এক সপ্তাহ সময় লাগবে। দুই দিন পর যদি ফের কর্মবিরতি শুরু হয়, তাহলে এ সমস্যার সমাধান হবে না।’
নৌ উপদেষ্টার হস্তক্ষেপে চট্টগ্রাম বন্দরে চলমান কর্মবিরতি দুই দিনের জন্য স্থগিত হওয়াতে কিছুটা চিন্তামুক্ত হয়েছিলেন ব্যবসায়ীরা। স্থায়ী সমাধান না হওয়ায় ফের কর্মবিরতির প্রস্তুতি নিচ্ছেন শ্রমিক-কর্মচারীরা। স্কপ গতকাল বৈঠক করে নৌ মন্ত্রণালয়কে সহজ পথ বেছে নেওয়ার দাবি জানায়। শ্রমিক-কর্মচারীদের দমন করার কৌশল ‘আগুন নিয়ে খেলার সমান’ বলে মন্তব্য করেন স্কপ নেতা এ এম নাজিম উদ্দিন। বন্দর রক্ষা পরিষদের নেতারাও তাদের বক্তব্যে রোববার থেকে ফের কর্মবিরতি শুরু করার ইঙ্গিত দিয়েছেন। এদিকে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে ঘিরে ১০ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হচ্ছে ছুটি। এরপর আসবে রমজান।
চলতি মাসে ১৬ দিনের বেশি কার্যদিবস থাকছে না বলে জানান বিজিএমইএর সাবেক প্রথম সহ-সভাপতি নাসির উদ্দিন চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘বন্দর সচল রাখার চেষ্টাকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। এর জন্য যা করা লাগে, তাই করা উচিত প্রশাসনের। দায়িত্বশীলরা যে প্রক্রিয়ায় হাঁটছে তাতে মনে হচ্ছে না বন্দর অগ্রাধিকারে আছে। রোববার থেকে যদি ফের কর্মবিরতি হয়, তাহলে অপূরণীয় ক্ষতির মুখোমুখি হবে দেশ।
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত 2019 - 2026 PassengerVoice | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Developed By Muktodhara Technology Limited.
পাবলিক মতামত