চট্টগ্রাম বন্দর অচল, নেতিবাচক প্রভাব পড়বে সমগ্র অর্থনীতিতে

Passenger Voice    |    ১১:১৩ এএম, ২০২৬-০২-০৫


চট্টগ্রাম বন্দর অচল, নেতিবাচক প্রভাব পড়বে সমগ্র অর্থনীতিতে

চট্টগ্রাম বন্দরে শ্রমিক-কর্মচারীদের অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি দেশের অর্থনীতিতে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। বন্দরের কার্যক্রম প্রায় স্থবির হয়ে পড়ায় আমদানি-রপ্তানিনির্ভর ব্যবসা-বাণিজ্য মারাত্মক চাপে পড়েছে। সামনে রমজান থাকায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ ব্যাহত হলে ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়বে। এতে সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ পড়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
 
বেসরকারি ডিপোতে বাণিজ্যিক কার্যক্রমে স্থবিরতা
চট্টগ্রাম বন্দরে সার্বিক অপারেশনাল কার্যক্রম বন্ধ থাকার বন্দরের পাশাপাশি এর প্রভাব বেসরকারি ১৯টি ডিপোর ওপরেও পড়েছে। একদিকে রপ্তানি পণ্যবাহী কনটেইনার চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে জাহাজীকরণ হচ্ছে না। ফলে ডিপোগুলোতে বাড়ছে রপ্তানি পণ্যবাহী কনটেইনারের স্তূপ। অন্যদিকে আমদানি পণ্যবাহী কনটেইনার বন্দর থেকে ডিপোতে আনা সম্ভব হচ্ছে না। এসব কনটেইনারে খেজুর, ছোলা, মসুর ডালসহ রমজানকেন্দ্রিক বিভিন্ন ভোগ্যপণ্য রয়েছে। তাই এসব আমদানি পণ্য খালাস করতে না পারায় রমজানে ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। ফলে খালি কনটেইনার বন্দর থেকে আনা-নেওয়া বন্ধ রয়েছে। 

বাংলাদেশ ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো অ্যাসোসিয়েশনের (বিকডা) জানিয়েছে, চট্টগ্রামের সব কটি বেসরকারি ডিপোতে রপ্তানি পণ্যবাহী কনটেইনারের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। সাধারণত সব কটি ডিপোতে রপ্তানি পণ্যবাহী কনটেইনার থাকে ৮ হাজার টিইইউএস। এখন সে সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১ হাজার টিইইউএসে। 

বিকডার মহাসচিব মো. রুহুল আমিন শিকদার বলেন, ‘গত মঙ্গলবার সকাল থেকে বন্দর ও দেশের ১৯টি বেসরকারি ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোর (আইসিডি) মধ্যে আমদানি, রপ্তানি কিংবা খালি কনটেইনার পরিবহন পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। ফলে ডিপোগুলোতে রপ্তানি পণ্যবাহী কনটেইনারের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনালে অল্প কিছু কাজ হচ্ছে, সেটা ৫ থেকে ৭ শতাংশ। এই অবস্থা যদি দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে কনটেইনারের স্তূপ তীব্র আকার ধারণ করবে। তখন রমজান মাসে আমাদের রপ্তানি পণ্যের ভলিউম হ্যান্ডেল করতে ঝামেলা হবে। তেমনি আমদানি পণ্য ডেলিভারি দিতেও আমরা অনেক বড় সমস্যার মুখোমুখি হতে পারি।’ 

চট্টগ্রাম বন্দরের হালচাল 
চট্টগ্রাম বন্দরের শ্রমিক-কর্মচারীদের অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতির কারণে বহির্নোঙর থেকে জাহাজ জেটিতে আনা সম্ভব হচ্ছে না। অন্যদিকে পণ্যবাহী জাহাজ বন্দর ছেড়ে যেতে পারছে না। চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরেও কার্যক্রমে স্থবিরতা নেমে এসেছে। বর্তমানে বহির্নোঙরে খালাসের অপেক্ষায় রয়েছে ৯৮টি বড় জাহাজ (মাদার ভেসেল)। এর মধ্যে ৩২টি জাহাজে চাল, ডাল, চিনি, ভোজ্যতেল, খেজুরসহ বিভিন্ন ভোগ্যপণ্য রয়েছে। অন্যান্য জাহাজে রয়েছে সার, সিমেন্ট তৈরির কাঁচামাল ক্লিঙ্কারসহ বিভিন্ন পণ্য। চলমান পরিস্থিতির কারণে বহির্নোঙরে জাহাজের অপেক্ষমাণ সময় বাড়ছে। প্রতিটি বড় জাহাজকে দিনে ১৬ লাখ টাকা ডেমারেজ (জরিমানা) গুনতে হচ্ছে। এ কারণে ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। 

স্থবিরতা পোশাক খাতে
বন্দরের সার্বিক কার্যক্রম বন্ধ থাকায় বেসরকারি ডিপোগুলো থেকে রপ্তানি পণ্যবাহী কনটেইনার জাহাজীকরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। রপ্তানি পণ্যের অধিকাংশই গার্মেন্ট পণ্য। পোশাক কারখানা মালিকরা বলছেন, এসব পণ্য যথাসময়ে বিদেশি বায়ারের (ক্রেতা) কাছে না পাঠাতে পারলে একদিকে দেশের সুনাম ক্ষণ্ণ হবে, অন্যদিকে কার্যাদেশ বাতিল বা কমে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। 

বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির পরিচালক রাকিবুল আলম চৌধুরী বলেন, ‘বর্তমানে ব্যবসার পরিস্থিতি খুবই খারাপ। বিদেশি কার্যাদেশ না থাকায় কিছু কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। কিছু বন্ধ হওয়ার উপক্রম। তার ওপর বর্তমান পরিস্থিতি আমাদের হতাশ করছে। সরকারের কাছে আমাদের প্রত্যাশা, এই সমস্যার দ্রুত সমাধান আসবে।’ 

চট্টগ্রামের দেওয়ানহাট এলাকায় ডেলমাস পোশাক কারখানার মালিক মোহাম্মদ হোসেন বলেন, বন্দরে পোশাক কারখানার কাঁচামাল আটকে যাচ্ছে। সুতা, কাপড়, এক্সেসরিজ সময়মতো খালাস না হওয়ায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। অন্যদিকে অনেকে তৈরি পণ্য ডিপোতে পাঠালেও বন্দরে পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না। ফলে জাহাজীকরণ যথাসময়ে করা সম্ভব হচ্ছে না। এভাবে চলতে থাকলে কারখানা বন্ধ করে দেওয়া ছাড়া উপায় থাকবে না। 

ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়ার শঙ্কা
চট্টগ্রামের বড় ভোগ্যপণ্যের বাজার খাতুনগঞ্জে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পাইকারি বাজারটিতে এখন পর্যন্ত ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়েনি। তবে বন্দর পরিস্থিতির উন্নতি না হলে সামনে ভোগ্যপণ্যের সংকট তৈরি হবে। তখন দাম বাড়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা। 

খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের আইনবিষয়ক সম্পাদক ও চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ আড়তদার সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. মহিউদ্দিন খবরের কাগজকে বলেন, পবিত্র রমজান মাসের আর বেশি দিন বাকি নেই। এমন সময়ে চট্টগ্রাম বন্দরে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। তবে খাতুনগঞ্জে এখনো প্রভাব পড়েনি। কর্মবিরতি দীর্ঘায়িত হলে তখন আমদানি করা ভোগ্যপণ্য খালাস করা যাবে না। এতে বাজারে ভোগ্যপণ্যের সংকট তৈরি হবে। তখন রমজান মাসে ভোক্তাদের বাড়তি দাম দিয়ে পণ্য কিনে খেতে হবে। 

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন বলেন, যত দ্রুত সম্ভব বন্দর পরিস্থিতির উন্নতিতে সরকারকে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। সরকার নীরব থাকলে সমস্যা আরও জটিল হবে। রমজানের আর বেশি দিন বাকি নেই। তাই রমজানে যাতে সাধারণ মানুষ ন্যায্যদামে ভোগ্যপণ্য কিনতে পারেন, সে ব্যবস্থা তো করতে হবে।
 
ঋণ পরিশোধে হিমশিম খাচ্ছেন পণ্য পরিবহন মালিকরা 
বাংলাদেশ কাভার্ড ভ্যান ট্রাক প্রাইম মুভার পণ্য পরিবহন মালিক অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব চৌধুরী জাফর আহমেদ বলেন, ‘আমরা বেসরকারি ডিপোতে কিছু চালাতে পারছি। কিন্তু চট্টগ্রাম বন্দরে পাঁচ দিন ধরে পণ্যবাহী গাড়ি চলাচল করছে না। এই সমস্যা সমাধানের কোনো উদ্যোগ এখনো নেওয়া হচ্ছে না। সব মিলিয়ে আমরা খুবই হতাশ। গাড়ি চালাতে না পেরে অনেক পণ্য পরিবহন মালিক ঋণ পরিশোধে হিমশিম খাচ্ছেন।’ 

চট্টগ্রাম বন্দরের সাবেক পরিচালক মাহফুজুল হক শাহ বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দরের বর্তমান অবস্থা নিয়ে আমরা শঙ্কিত। একদিকে ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, অন্যদিকে রমজানে ভোগ্যপণ্যের সংকট দেখা দিতে পারে। আমাদের পোশাকশিল্পের মালিকরা অনেক বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। বাংলাদেশের অর্থনীতিকে জিম্মি করে যা চলছে, এটি সরকারকেই মোকাবিলা করতে হবে। সরকার না পারলে যারা দায়িত্ববান বিশেষ করে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে দায়িত্ব দিতে হবে। তারাও না পারলে তাদের সবাইকে দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়া উচিত। আমাদের চাওয়া, বন্দরের অপারেশন সিস্টেম স্বাভাবিক হোক। পাঁচ দিন ধরে বন্দর অচল করে রাখা হয়েছে। সরকারের নীরব ভূমিকা দেখে আমরা অবাক। সরকার যদি নীরব ভূমিকা পালন করে তাহলে এর দায়ভার সরকার এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়কে নিতে হবে।’ সূত্র খবরের কাগজ

 

 

প্যা.ভ.ম