শিরোনাম
Passenger Voice | ১০:৪৩ এএম, ২০২৬-০২-০৫
বাংলাদেশ ব্যাংকের চাকরিবিধি অনুযায়ী চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ এবং মেয়াদ বাড়াতে হলে অবশ্যই পর্ষদের অনুমোদন লাগবে। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর পর্ষদের অনুমোদনের আগেই তার উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ পাওয়া বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক আহসানউল্লাহর চুক্তির মেয়াদ বাড়িয়েছেন অর্থাৎ তাকে পুনর্নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যা নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।
কর্মকর্তারা বলছেন, গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে যোগ দেওয়ার পর বাংলাদেশ ব্যাংকে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক চুক্তিভিত্তিক উপদেষ্টা ও পরামর্শক নিয়োগ দিয়েছেন। যার বড় অংশই অপ্রয়োজনীয় এবং এর মাধ্যমে অভিজ্ঞ ও নিবেদিত বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মকর্তাদের অবমূল্যায়ন করা হয়। শুধু তাই নয়, অনেকের মেয়াদ শেষ হলে অবৈধভাবে তা বাড়ানোও হয়েছে।
তাদের মতে, বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক উপদেষ্টা ও পরামর্শক চুক্তিভিত্তিক নিয়োজিত রয়েছেন, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ইতিহাসে নজিরবিহীন। এসব অতিরিক্ত ও অপ্রয়োজনীয় উপদেষ্টা ও পরামর্শক নিয়োগের ফলে একদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মধ্যে হতাশা দেখা দেওয়ার পাশাপাশি কর্মপরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত এবং অভ্যন্তরীণ প্রশাসনে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
তাদের অভিযোগ, নিয়োগকৃত পরামর্শক এবং উপদেষ্টারা ব্যাংকিং খাতের গুণগত মান উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হলেও ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মস্পৃহা নষ্ট করছেন।
জানা গেছে, বাংলাদেশ ব্যাংক সংস্কার ও শক্তিশালীকরণের জন্য ২০২৫ সালের ৬ জানুয়ারি গভর্নরের উপদেষ্টা পদে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক আহসান উল্লাহকে এক বছরের জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। নিয়মিত অবসরের পর তিনি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উপদেষ্টা পদে কাজ করছেন এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক শক্তিশালীকরণ প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। কিন্তু চলতি বছরের ৫ জানুয়ারি তার মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। ৬ জানুয়ারি গভর্নর একক সিদ্ধান্তে তার মেয়াদ আরও এক বছর বাড়িয়ে দিয়েছেন। পরে গত ২৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে তা উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু পর্ষদ সদস্যরা তার মেয়াদ বাড়ানোর কারণ জানতে চেয়েছেন। সেই সঙ্গে উপদেষ্টার কাজের লিখিত বিবরণও জানতে চেয়েছেন। এই কারণে তার মেয়াদ বৃদ্ধি আটকে যায়। কিন্তু তিনি এখন পর্যন্ত নিয়মিতভাবে অফিস করছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংক সংস্কারে নিয়োগকৃত গভর্নরের উপদেষ্টা মো. আহসান উল্লাহকে ঘিরে কর্মকর্তাদের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ রয়েছে। তাদের মতে, এই উপদেষ্টা নির্ধারিত সংস্কার কার্যক্রমে অগ্রগতি না ঘটিয়ে দৈনন্দিন অপারেশনাল কাজে হস্তক্ষেপ করছেন, নীতিনির্ধারণী বৈঠকে অযাচিতভাবে অংশ নিচ্ছেন এবং নির্বাহী ক্ষমতা প্রয়োগ করছেন।
এমনকি তিনি কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দিচ্ছেন এবং তার কথা না মানলে গভর্নরের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকিও দিচ্ছেন। এতে কর্মকর্তাদের মধ্যে ভয় ও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে এবং প্রশাসনিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে।
গত এক বছরে সংস্কার কার্যক্রমে দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকলেও সংশ্লিষ্ট উপদেষ্টার কার্যক্রমের কোনো মূল্যায়ন ছাড়াই অবৈধভাবে গভর্নরের একক সিদ্ধান্তে তাকে পুনর্নিয়োগ দেওয়ায় কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘নিয়মিত পদগুলোতে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিলে বাংলাদেশ ব্যাংকের যোগ্যতাসম্পন্ন কর্মকর্তারা বঞ্চিত হন, এটা স্বাভাবিক। এতে স্বাভাবিক পদোন্নতিও কিছুটা বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে কর্মকর্তাদের মধ্যে হতাশা তৈরি হতে পারে। এ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানকে অবশ্যই বিবেচনায় নিতে হবে যে, পদোন্নতি কর্মস্পৃহা তৈরির সবচেয়ে বড় উপাদান।’ উপদেষ্টা আহসানউল্লাহ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তিনি নিজেও একসময় বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়মিত কর্মকর্তা ছিলেন। সেই অভিজ্ঞতার জায়গা থেকেই হয়তো তিনি বিভিন্ন বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে থাকতে পারেন। তবে গভর্নর নিশ্চয়ই বিষয়টি বিবেচনায় নেবেন।’
এদিকে, সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকে চুক্তিভিত্তিক উপদেষ্টা ও পরামর্শক নিয়োগ বাতিলের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিল (বিবিওডব্লিউসিডি)। সংগঠনটির অভিযোগ, অতিরিক্ত ও অপ্রয়োজনীয় উপদেষ্টা নিয়োগের ফলে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মপরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং অভ্যন্তরীণ প্রশাসনে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে পাঠানো এক লিখিত চিঠিতে কাউন্সিল এসব অভিযোগ তুলে ধরে সব অপ্রয়োজনীয় চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল এবং ভবিষ্যতে নতুন করে এ ধরনের নিয়োগ না দেওয়ার দাবি জানায় সংগঠনটি। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিবিওডব্লিউসিডির সভাপতি এ কে এম মাসুম বিল্লাহ বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের চাকরিবিধি অনুযায়ী, পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন ছাড়া গভর্নর এককভাবে কোনো চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ ও পুনর্নিয়োগ দিতে পারেন না। কিন্তু এই নিয়ম অমান্য করে গভর্নর আহসান উল্লাহর মেয়াদ এক বছর বাড়িয়ে তাকে পুনর্নিয়োগ দিয়েছেন। পরে তা পর্ষদে অনুমোদনের জন্য উত্থাপন করেছেন। কিন্তু জানতে পেরেছি বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্ষদ তা অনুমোদন করেনি। বরং আগামী পর্ষদ মিটিংয়ে তার কাজের মূল্যায়ন করতে বলেছেন।’
এমন পরিস্থিতিতে কাউন্সিল মনে করছে, কর্মকর্তাদের মধ্যে সৃষ্ট উদ্বেগ ও অসন্তোষ নিরসনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে আজ বৃহস্পতিবার বেলা ১১টায় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে বৈঠক করবে ওয়েলফেয়ার কাউন্সিল। এরপর সাংবাদিকদের সঙ্গে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে তার বিস্তারিত তুলে ধরবে সংগঠনটি।
প্যা/ভ/ম
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত 2019 - 2026 PassengerVoice | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Developed By Muktodhara Technology Limited.
পাবলিক মতামত