শিরোনাম
Passenger Voice | ০৪:৪৪ পিএম, ২০২৬-০২-০৩
২৩ জানুয়ারি সকাল সাড়ে ১০টা। নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের মেঘনা টোলপ্লাজা এলাকা। ঢাকা থেকে মোটরসাইকেল চালিয়ে কুমিল্লা যাচ্ছিলেন অপূর্ব ইব্রাহীম নামে এক গণমাধ্যমকর্মী। টোলবক্সের লেনে তার সামনে দুটি গাড়ি। মানিব্যাগ থেকে টোলের টাকা বের করছিলেন। এ সময় কলাপাতা রঙের ভেস্ট পরা এক তরুণ এগিয়ে এলেন। জানালেন, টোলের টাকা তাকে দিয়ে সিরিয়াল ভেঙে চলে যাওয়া যাবে। এ জন্য তাকে দিতে হবে ২০ টাকা। কিন্তু তিনি কোনো রশিদ দেবেন না।
মোটরসাইকেল আরোহী অপূর্ব ইব্রাহীম বলেন, ‘মেঘনা টোলপ্লাজায় মোটরসাইকেলের জন্য ১৫ টাকা দিতে হয়। কিন্তু ওই তরুণ আমার কাছে ২০ টাকা চায়। আবার কোনো রিসিটও দেবে না। আমি তাকে সাফ বলে দিই, আপনাকে টাকা দেব না। এরপর টোলবক্সের টিকিট সরবরাহ করা ব্যক্তিকে ওই তরুণ সম্পর্কে জানতে চাই। তিনি জানান, ওরা স্বেচ্ছাসেবী। রিসিট ছাড়া টাকা চাওয়ার কথা জানালে তাকে চুপ থাকতে দেখা যায়।’
মোটরসাইকেল আরোহীর কাছ থেকে টোলবক্সের বাইরে টাকা চাওয়া কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ মেঘনা টোলপ্লাজায় প্রতিদিনই ছোট-বড় সব ধরনের গাড়ি থেকে এভাবে টাকা তুলতে দেখা যায়। গাড়ির চালকরা টোল দিচ্ছেন ভেবে তাদের হাতে টাকা তুলে দেন। কিন্তু মানি রিসিট না দেওয়ায় ওই টাকা তাদের পকেটে চলে যায়। এতে টোল বাবদ আদায় হওয়া রাজস্বের একটি অংশ থেকে সরকার বঞ্চিত হয়, যার পরিমাণ আড়াই কোটি টাকারও বেশি।
স্থানীয়রা বলছেন, কর্তৃপক্ষের দুর্বল নজরদারির সুযোগকে কাজে লাগিয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, নিরাপত্তাকর্মী ও লাইনম্যানরা এখানে শক্তিশালী একটি সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছে। তারা বিভিন্ন গাড়ি বিশেষ করে মোটরসাইকেল ও প্রাইভেটকার থেকে প্রকাশ্যে টোলের টাকা নিয়ে নিজেদের পকেট ভারী করছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, মেঘনা টোলপ্লাজায় ‘সুরক্ষা সিকিউরিটি ও লজিস্টিক লিমিটেডের পোশাক (ভেস্ট) পরা মনির, আলিম খানসহ ৪/৫ জন লাইনম্যান প্রকাশ্যে মোটরসাইকেল আরোহীদের কাছ থেকে রশিদ ছাড়াই টাকা আদায় করছেন। হাতেনাতে ধরা পড়ার পর প্রথমে তারা বিষয়টি ‘চা খাওয়ার টাকা’ বলে জানানোর চেষ্টা করেন। পরে অবশ্য খবরের কাগজের প্রতিবেদকের কাছে দুর্নীতির বিষয়টি স্বীকার করেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক টোলপ্লাজার এক কর্মকর্তা বলেন, ‘এই দুর্নীতি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকেই একটি সংঘবদ্ধ চক্রের মাধ্যমে এমনটি হয়ে আসছে। লাইনম্যানরা শুধু সামনের মুখ। তাদের পেছনে রয়েছে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা থেকে শুরু করে ঊর্ধ্বতন পর্যায়ের লোকজন।’ তিনি বলেন, ‘প্রতিদিন এই প্রক্রিয়ায় গড়ে অর্ধলক্ষ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। সে হিসেবে মাসে প্রায় ১৫ লাখ টাকা।’ এই কর্মকর্তার দেওয়া হিসেব অনুযায়ী, গত ১৭ মাসের হিসেবে আদায় করা টাকার পরিমাণ আড়াই কোটি টাকারও বেশি, যা সরকারের রাজস্ব খাতে জমা হয়নি।
মেঘনা টোলপ্লাজায় কথা হয় আরেক মোটরসাইকেল আরোহী রাজীব হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘রশিদ ছাড়া টাকা আদায় এখানকার নিত্যদিনের ঘটনা। রশিদ চাইলে নানা অজুহাত দেখানো হয়, কখনো ভয়ভীতি দেখানো, কখনো আবার অপমান করা হয়। বাধ্য হয়ে সাধারণ মানুষ টাকা দিয়ে চলে যান।’ তিনি বলেন, ‘এটা টোল নয়, এটা খোলা চাঁদাবাজি। সরকার যেখানে রাজস্ব সংকটে, সেখানে প্রকাশ্যে এমন লুটপাট চলা খুবই লজ্জাজনক।’
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সোনারগাঁয়ের সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান মামুন বলেন, মেঘনা টোলপ্লাজায় সরকারি রাজস্ব ফাঁকির ঘটনা দুঃখজনক। এ ঘটনায় যারা জড়িত তাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।
এ বিষয়ে টোলপ্লাজার সুপারভাইজার মো. ফয়সাল বলেন, লাইনম্যানদের টোল আদায়ের কোনো এখতিয়ার নেই। কেন এই টাকা নেওয়া হয়েছে, তা খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি।
নারায়ণগঞ্জ সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী আবদুর রহিম বলেন, ‘রশিদ ছাড়া টোল আদায় বেআইনি। প্রমাণ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
প্যা.ভ.ম
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত 2019 - 2026 PassengerVoice | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Developed By Muktodhara Technology Limited.
পাবলিক মতামত