রপ্তানি কনটেইনার জমেছে ৮৯০০,খালাস কম ৭০%

Passenger Voice    |    ০৩:২৪ পিএম, ২০২৬-০২-০৩


রপ্তানি কনটেইনার জমেছে ৮৯০০,খালাস কম ৭০%

আসছে নির্বাচন ও রমজান। এমন গুরুত্বপূর্ণ সময়ে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চালু রাখা কঠিন হয়ে উঠেছে। চট্টগ্রাম বন্দরে চলছে কর্মবিরতি। কাঁচামাল বন্দরে এলেও তা সময়মতো খালাস করা যাচ্ছে না। পণ্যভর্তি রপ্তানি কনটেইনার নিয়ে বিপাকে পড়েছেন তৈরি পোশাক কারখানার মালিকরা।

বন্দর সূত্রে জানা গেছে, ২১টি বেসরকারি ডিপোতে রপ্তানি কনটেইনার জমেছে আট হাজার ৯০০টি। স্বাভাবিক সময়ে ডিপো থেকে প্রতিদিন গড়ে দুই হাজার ৮০০ রপ্তানি কনটেইনার বন্দরে পাঠানো হলেও সেটি নেমেছে অর্ধেকে। আর পণ্যবাহী কনটেইনার খালাসের কার্যক্রম কমেছে ৭০ শতাংশ। চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে গত তিন দিনে রাজস্ব কমেছে ১৫০ কোটি টাকারও বেশি।

নির্বাচন সামনে থাকায় এবার আগেভাগে রমজানের পণ্য নিয়ে এসেছিলেন আমদানিকারকরা। সেই পণ্য পরিকল্পনা অনুযায়ী খালাস করতে পারছেন না। কর্মবিরতি শুরুর আগের দিন চট্টগ্রাম বন্দর থেকে পণ্যবাহী কনটেইনার খালাস হয়েছে চার হাজার ৯৯টি। কিন্তু ৩১ জানুয়ারি কর্মবিরতি শুরুর প্রথম দিন এটি কমে দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৭৫০টি। কর্মবিরতির পরের দুই দিন এটি আরও কমে দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৬৮৪ ও এক হাজার ২৩০টি। এই হিসাবে গত তিন দিনে পণ্যভর্তি কনটেইনার হয়েছে এক হাজার ৫৫৪টি। অথচ স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন পাঁচ হাজার কনটেইনার খালাস হয়। এর প্রভাব পড়েছে কাস্টম হাউসে। কমেছে রাজস্ব। প্রতিদিন গড়ে ১৭০ কোটি টাকা আদায় করা প্রতিষ্ঠানটির রাজস্ব কমেছে প্রায় ৪০ শতাংশ।

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের কমিশনার মোহাম্মদ শফিউদ্দিন বলেন, ‘এককভাবে দেশের সবচেয়ে বড় রাজস্ব আদায়কারী প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস। চট্টগ্রাম বন্দরে আসা পণ্য শুল্কায়ন করে এই প্রতিষ্ঠানটি। টানা কর্মবিরতির কারণে খালাস কার্যক্রম কমে গেছে বন্দরে। সেটির প্রভাব পড়েছে কাস্টম হাউসে।’

চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালক (প্রশাসন) মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, ‘কর্মবিরতির মাঝেও কাজ চলছে বন্দরে। তবে স্বাভাবিকের তুলনায় কমেছে। আগে যে পরিমাণ পণ্যভর্তি কনটেইনার খালাস হতো, সেটি অনেকটা কমে গেছে। সামনে নির্বাচন ও রমজান। এই সময়টা মাথায় রাখা উচিত আন্দোলনকারীদের।’

ডিপোতে রপ্তানি কনটেইনার জমেছে ৮ হাজার ৯০০

বন্দরে কর্মবিরতি শুরুর আগের দিন (৩০ জানুয়ারি) ২১টি ডিপো থেকে ২০ ফুট এককের রপ্তানি কনটেইনার যায় দুই হাজার ৯৪৭টি। কিন্তু কর্মবিরতি শুরুর প্রথম ও দ্বিতীয় দিন রপ্তানি কনটেইনার গেছে যথাক্রমে এক হাজার ৬১০ ও এক হাজার ৪৭২টি। এই হিসাবে স্বাভাবিকের তুলনায় অর্ধেক কমে গেছে রপ্তানি কনটেইনার।

বেসরকারি ডিপোতে শুল্কায়ন প্রক্রিয়া শেষ করে চট্টগ্রাম বন্দরে পাঠানো হয় রপ্তানি কনটেইনার। চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে প্রতিদিন যে কনটেইনার রপ্তানি হয়, তার শতভাগই যায় ডিপো হয়ে। কর্মবিরতির কারণে এখন সেই ডিপোতে তৈরি হচ্ছে জট। গতকাল পর্যন্ত ডিপোগুলোতে ২০ ফুট এককের রপ্তানি কনটেইনার ছিল আট হাজার ৯০০টি।

সংকট তৈরি হচ্ছে আমদানি পণ্য নিয়েও

চট্টগ্রাম বন্দরে কার্যক্রম পরিচালিত হয় তিন শিফটে (আট ঘণ্টা)। কর্মবিরতির কারণে গত তিন দিন ধরে সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টার শিফটে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। শ্রমিকরা কাজে যোগ না দেওয়ায় তৈরি করা যাচ্ছে না কার্যক্রম পরিচালনার গ্যাং। যন্ত্রপাতি পরিচালনা করা অপারেটররাও সহযোগিতা করেনি কর্তৃপক্ষকে। এ জন্য কি গ্যান্ট্রি ক্রেন, স্ট্যাডল ক্যারিয়ার ও রাবার টায়ার্ড গ্যান্ট্রি ক্রেনের মতো অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি অলস বসে থাকছে আট ঘণ্টা ধরে।

ডিপো মালিক সমিতি বিকডার মহাসচিব রুহুল আমিন শিকদার বিপ্লব বলেন, ‘গত তিন দিন কর্মবিরতি শেষে কিছুটা কাজ করতে পেরেছি আমরা। টানা ২৪ ঘণ্টার কর্মবিরতি হলে সংকট বাড়বে। সময়মতো রপ্তানি কনটেইনার পাঠাতে না পারলে সেটি রেখে বন্দর ত্যাগ করবে বিদেশি জাহাজ। এটি তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য সংকট তৈরি করবে।’

পণ্য খালাসের অপেক্ষায় ৯৮টি জাহাজ

বন্দরের জেটি ও বহির্নোঙরে পণ্য খালাসের অপেক্ষায় আছে ৯৮টি জাহাজ। এসব জাহাজের মধ্যে কনটেইনার জাহাজ আছে ১২টি। জেনারেল কার্গো আছে ২৯টি। খাদ্যসামগ্রী বোঝাই জাহাজ আছে ২২টি। চিনি বোঝাই পাঁচটি ও লবণ বোঝাই জাহাজ আছে দুটি। বাকিগুলো পাথর বা অন্য সামগ্রী বোঝাই। আগামী এক সপ্তাহে আরও এক ডজনের বেশি জাহাজ নোঙর করবে। আন্দোলন কর্মসূচি চলমান থাকলে রমজানের আগে জাহাজ জট তীব্র হবে।

আজ ২৪ ঘণ্টার কর্মবিরতি

৩১ জানুয়ারি থেকে ২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রতিদিন আট ঘণ্টা কর্মবিরতি হলেও আজ মঙ্গলবার থেকে ২৪ ঘণ্টার কর্মবিরতি ঘোষণা করেছে বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ। এই সংগঠনের সমন্বয়ক হুমায়ুন কবির বলেন, ‘ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তির যে প্রক্রিয়া চলছে, সেটি বাতিল করার কোনো উদ্যোগ নেয়নি সরকার। বিডার নির্বাহী পরিচালক আশিক চৌধুরী, বন্দরের চেয়ারম্যান এস এম মনিরুজ্জামান ও পরিচালক (প্রশাসন) ওমর ফারুক উল্টো আন্দোলন দমানোর চেষ্টা করছেন। গণহারে বদলি করছেন। এদের অপসারণ করে আইনের আওতায় আনতে হবে। অন্যথায় এই আন্দোলন আরও কঠোর হবে।’

দুশ্চিন্তায় ব্যবসায়ীরা

চট্টগ্রাম বন্দর ও ২১টি বেসরকারি ডিপোতে অচলাবস্থা তৈরি হলেও সেটি দূর করতে সরকার কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি বলে দাবি করেছেন ব্যবসায়ীরা। টানা তিন দিন ধরে চলা কর্মসূচি এরই মধ্যে ক্ষতির মুখে ফেলেছে তাদের। নির্বাচনকে ঘিরে চার দিনের ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। আসছে রমজানও। এমন সময় পণ্য খালাসে তৈরি হয়েছে সংকট।

বিজিএমইএর সাবেক প্রথম সহসভাপতি নাসির উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বন্দরের অচলাবস্থায়। সামনে নির্বাচনের ছুটি। এর মধ্যে ২৪ ঘণ্টা অবরোধের কর্মসূচি এসেছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে রপ্তানি কনটেইনার রেখে বন্দর ছেড়ে যাবে অনেক বড় জাহাজ। তখন অপূরণীয় ক্ষতির মুখোমুখি হতে হবে আমাদের। এ ব্যাপারে দায়িত্বশীলদের জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।’