স্মার্টফোনের বাজারে সিন্ডিকেটের থাবা

Passenger Voice    |    ১০:৪৫ এএম, ২০২৬-০২-০২


স্মার্টফোনের বাজারে সিন্ডিকেটের থাবা

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী তাসনুভা তানিশা রাজধানীর একটি শফিংমলে পুরোনো মোবাইলের ডিসপ্লে ঠিক করতে যান। কিন্তু তাতে যে টাকা খরচ হয়, এর চেয়ে নতুন মোবাইল কেনাই ভালো মনে করেন। তিনি প্রতারিত হওয়ার ভয়ে স্যামসাংয়ের অফিশিয়াল শোরুমে যান। এ পর্যায়ে তিনি একটি নতুন মডেলের স্যামসাং মোবাইল কেনার জন্য দরদাম করেন।সূত্র- যুগান্তর

এ সময় তিনি জানতে পারেন, এক মাস আগে গ্যালাক্সি এ-২৬ ৫-জি-৮ জিবি (র‌্যাম) ১২৮ জিবি (রম) মডেলের দাম ৩৪ হাজার টাকা চাওয়া হয়েছিল। তখন তার হাতে পুরো টাকা না থাকায় ফিরে আসেন। মোবাইল দোকানিদের ধর্মঘট শেষ হলে মঙ্গলবার তিনি ওই মডেলের মোবাইলটি কিনতে গিয়ে দেখেন ৪ হাজার টাকা বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ ৩৪ হাজার টাকার মোবাইল বিক্রি করছে ৩৮ হাজার টাকা। তাকে ৪ হাজার টাকা বেশি খরচ করতে হয়েছে একটি মোবাইলের পেছনে।

তাসনুভা বলেন, এনইআইআর (ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার) চালু হওয়ায় আন-অফিশিয়াল ফোন কিনতে ভয় হচ্ছে। যদি আবার বন্ধ হয়ে যায়। বাধ্য হয়ে স্যামসাং অফিশিয়াল ফোনটি বেশি দামেই কিনেছি। মনে হচ্ছে মোবাইল বাজার আমাদের জিম্মি করে ফেলেছে। কয়েকটি মোবাইল মার্কেট ঘুরে তাসনুভা তানিশার অভিযোগের সত্যতা মিলেছে। বাজারে থাকা প্রায় সব ফোনেরই দাম এক মাস আগের তুলনায় সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। দাম বৃদ্ধি পাওয়া ব্র্যান্ডগুলোর মধ্যে রয়েছে- ভিভো, শাওমি, ইনফিনিক্স, রিয়েলমি, ওয়ানপ্লাস ও স্যামসাং গ্যালাক্সি।

সরকার মোবাইল ডিভাইসের দাম সব মানুষের হাতের নাগালে রাখতে আমদানি শুল্ক ও সংযোজনকারী উপকরণের ওপর শুল্ক কমিয়ে দেয়। এতে আশা করা হয়েছিল মোবাইলের দাম কমে আসবে। প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমেদ তৈয়বও বলেছিলেন ‘যেহেতু আমদানি শুল্ক কমেছে, মোবাইলের দামও পর্যায়ক্রমে কমে আসবে।’ কিন্তু বাস্তবে ঘটেছে উলটো ঘটনা। দাম কমার পরিবর্তে সব ধরনের স্মার্টফোনের দাম গড়ে বেড়েছে ৫০০ টাকা থেকে ৫০০০ টাকা পর্যন্ত। সূত্র জানায়, দেশে নেটওয়ার্কে যুক্ত হওয়া অবৈধ মোবাইল ফোন বন্ধে এনইআইআর চালুর সুযোগ নিয়ে বাজারে একচেটিয়া সিন্ডিকেট তৈরি করেছে মোবাইল সংযোজনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন ‘মোবাইল ফোন ইন্ডাস্ট্রি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ’ (এমআইওবি)। সরকার শুল্ক কমালেও তারা বাড়িয়েছে স্মার্টফোনের দাম। গ্রাহকরা তাদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে। সরকারের নতুন হ্যান্ডসেট ও যন্ত্রাংশ আমদানিতে শুল্ক কমানোর যে উদ্যোগ তার সুফল পাচ্ছেন না গ্রাহকরা।

মোবাইল সংযোজনকারী ও আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা না নিলে গ্রাহক ভোগান্তি আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমপিসিএ) সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, আমদানিকৃত মোবাইল ফোন এবং দেশীয় সংযোজনকারী প্রতিষ্ঠানের উপকরণের ওপর শুল্ক কমানোর পর বাজারে দাম কমার কথা। বাস্তবে তার উলটো চিত্র দেখা যাচ্ছে। কতিপয় ব্যবসায়ী কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। গ্রাহকদের জিম্মি করে অতিরিক্ত মুনাফা আদায় করছে বিদেশি ব্র্যান্ডগুলো। তিনি আরও বলেন, বিষয়টি কর্তৃপক্ষের নজরে এলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ চোখে পড়ছে না। গ্রাহকের পকেট থেকে বাড়তি অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার বিষয়টি দুঃখজনক।

সম্প্রতি মোবাইল ফোনের আমদানি শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হয়। দেশে সংযোজনকারী প্রতিষ্ঠানের উপকরণ আমদানিতেও শুল্ক কমিয়ে ১০ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশে আনা হয়। এরপরও কেন বাড়ানো হচ্ছে দাম, এর নেপথ্যের কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে জানা গেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। মোবাইল সংযোজনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এনইআইআর প্রকল্পের সিস্টেম ডেভেলপমেন্টের জন্য বিটিআরসিকে ১১ কোটি ৪০ লাখ টাকা দেয়। বেসরকারি খাত থেকে সরকার এভাবে টাকা নিতে পারে কি না তা নিয়ে টিআইবি’র তরফ থেকেও প্রশ্ন তোলা হয়।

অন্যদিকে, এনইআইআর প্রকল্প বাতিলের দাবিতে আন-অফিশিয়াল মার্কেটের ব্যবসায়ীরা প্রায় তিন মাস ধরে আন্দোলন করে। তাদের অভিযোগ, এনইআইআর চালু হলে মোবাইল ফোনের বাজার একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। এতে করে প্রতিযোগিতা কমে গিয়ে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে দাম বাড়ানোর সুযোগ তৈরির শঙ্কাও করেন তারা। মোবাইল বাজারের বর্তমান পরিস্থিতি তাদের সেই আশঙ্কারই ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।

মোবাইল বিজনেস কমিউনিটি বাংলাদেশ’র (এমবিসিবি) শীর্ষ নেতা আজাদ ফয়সাল বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই আমরা সতর্ক করে আসছিলাম একটি নির্দিষ্ট চক্রকে সুবিধা দিতে এনইআইআর প্রকল্পটি নেওয়া হয়। এর মাধ্যমে কৌশলে বাজারে সিন্ডিকেট তৈরি করে ইচ্ছামতো দাম বাড়াবে চক্রটি। এমন আশঙ্কার কথা আগেও জানানো হয়েছিল। তিনি বলেন, এনইআইআর চালুর পর থেকেই বাজারে মোবাইল ফোনের দাম বাড়তে শুরু করে। বর্তমানে বিভিন্ন ক্যাটাগরির স্মার্টফোনের দাম গড়ে ১০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ গ্রাহকের ওপর, যারা বাড়তি দামে ফোন কিনতে বাধ্য হচ্ছেন।

চলতি মাসের মূল্যতালিকা বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৪ জিবি র‌্যাম ও ৬৪ জিবি রমের শাওমি রেডমি এ৫ ফোনটির দাম গত ডিসেম্বরের তুলনায় জানুয়ারিতে ২ হাজার টাকা বেড়েছে। ৮ জিবি র‌্যাম ও ২৫৬-জিবি রমের রেডমি নোট ১৪ প্রো ৪-জি মডেলের দাম বেড়েছে ৫ হাজার টাকা। ৮-জিবি র‌্যাম ও ১২৮-জিবি রমের ভিভো ওয়াই-২১ডি মডেলের দাম বেড়েছে ২ হাজার টাকা। দাম বেড়েছে স্যামসাংয়ের হ্যান্ডসেটেরও। এছাড়া ভিভোর অন্তত চারটি মডেলের দাম এক থেকে দুই হাজার টাকা বাড়ানো হয়েছে। ইনফিনিক্সের স্মার্ট ১০ (৪/৬৪)’ মডেলের দাম ১১ হাজার থেকে ১২ হাজার টাকা করা হয়েছে। হট ৬০-আই (৬/১২৮) মডেলের দাম ১৫ হাজার থেকে ১৬ হাজার আর ৮/২৫৬ ভ্যারিয়েন্টের দাম দুই হাজার টাকা বেড়েছে। রিয়েলমি হ্যান্ডসেটের গড় মূল্যও এক হাজার টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। নোট ৭০ র‌্যাম ৬-জিবি ও ১২৮ রমের মডেলের দাম ১৩ হাজার থেকে ১৪ হাজার, ‘সি৮৫ প্রো ৬-জিবি র‌্যাম ও ১২৮-জিবি রমের মডেলের দাম ২১ হাজার থেকে বেড়ে ২৩ হাজার টাকা হয়েছে। স্যামসাং ডিভাইসেরও দাম বেড়েছে।

সাধারণ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১৭টি প্রতিষ্ঠান দেশে মোবাইল ফোন আমদানি করে থাকে। এই সিন্ডিকেটকে শক্তিশালী করার জন্য এনইআইআর বাস্তবায়ন করছে। এর পরই মোবাইলের দাম বেড়েছে। অথচ মোবাইল হ্যান্ডসেটের দাম জনসাধারণের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখতে আমদানি করা মোবাইল ফোনের ওপর শুল্ক ৬০ শতাংশ কমিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।

১৩ জানুয়ারি এসআরও জারি করে এনবিআর জানায়, ‘ফিনিশড মোবাইল ফোন আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ক বিদ্যমান ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে। আমদানিকৃত হ্যান্ডসেটের শুল্ক কমানোর ফলে স্থানীয় মোবাইল সংযোজনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো যাতে কোনো ধরনের ক্ষতির বা অসম প্রতিযোগিতার মুখে না পড়ে, সেজন্য দেশীয় কারখানায় ব্যবহৃত কাঁচামাল ও উপকরণ আমদানিতেও শুল্ক কমানো হয়েছে। পৃথক একটি প্রজ্ঞাপনে এ ধরনের উপকরণ আমদানির শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে।

এনবিআরের হিসাবে, শুল্ক কমানোর ফলে ৩০ হাজার টাকার বেশি দামের আমদানি করা প্রতিটি মুঠোফোনের দাম সাড়ে পাঁচ হাজার টাকার মতো কমার কথা। আর ৩০ হাজার টাকার কম দামের প্রতিটি মুঠোফোনের দাম কমতে পারে দেড় হাজার টাকার মতো।’

এদিকে মোবাইলের দাম বাড়ানোর কারণ হিসাবে মেমোরি চিপ সংকটকে দায়ী করছেন ব্যবসায়ীরা। তারা বলছেন, ২০২৫ সাল থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে মেমোরি চিপের দাম ধারাবাহিকভাবে বাড়তে শুরু করে। দাম বাড়ার হার ৬০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। এই মূল্যবৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক স্মার্টফোন শিল্পে। বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে ইতোমধ্যেই মেমোরি চিপের বাড়তি দামের কারণে স্মার্টফোনের খুচরা মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে।

সিন্ডিকেট করে বাজারে মোবাইল সেটের দাম বাড়ানোর অভিযোগের বিষয়ে এমআইওবি’র সভাপতি জাকারিয়া শহীদ বলেন, সরকার সব উপকরণে শুল্ক কমায়নি। ফলে আমরা সিন্ডিকেট করে দাম বাড়িয়েছি এমন অভিযোগ ঠিক না। বিশ্ববাজারে মেমোরি চিপের দাম বাড়ার কারণে শুধু বাংলাদেশই নয়, সব দেশেই মোবাইল সেটের দাম বেড়েছে।

শাওমি বাংলাদেশের কান্ট্রি ম্যানেজার ও এমআইওবি’র কার্যনির্বাহী সদস্য জিয়া উদ্দিন চৌধুরী বলেন, স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত স্মার্টফোনে কিছু আমদানিকৃত কম্পোনেন্টের ওপর ৫ শতাংশ শুল্ক হ্রাস করা হলেও তা শুধুমাত্র টেবিল-৩ ও টেবিল-৪ অন্তর্ভুক্ত কম্পোনেন্টের জন্য প্রযোজ্য। যা মোট কম্পোনেন্ট ভ্যালুর মাত্র প্রায় ১৫ শতাংশ। ফলে সামগ্রিক আমদানি শুল্কে এর বাস্তব প্রভাব মাত্র ০.৭৫ শতাংশ। এছাড়া বর্তমান বৈশ্বিক বাজারে র‌্যাম ও ন্যান্ড ফ্ল্যাশ মেমোরির দাম বৃদ্ধি স্মার্টফোনের মূল্যবৃদ্ধির প্রধান কারণ বলেও জানান তিনি।