ভোটের আগেই নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল চুক্তি নিয়ে তড়িঘড়ি

Passenger Voice    |    ১২:৩২ পিএম, ২০২৬-০১-৩১


ভোটের আগেই নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল চুক্তি নিয়ে তড়িঘড়ি

নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) নিয়ে ফের উত্তপ্ত হয়ে উঠছে চট্টগ্রাম বন্দর। ভোটের আগেই বিদেশি প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে এনসিটি পরিচালনার চুক্তি করতে যাচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। অন্যদিকে এটি প্রতিহত করার ঘোষণা দিয়েছেন বন্দরের শ্রমিক-কর্মচারীরা। বন্দরে আজ শনিবার থেকে শাটডাউন কর্মসূচিও ঘোষণা করেছেন তারা। তবে চুক্তির ব্যাপারে অনমনীয় অবস্থানে আছে সরকার। তড়িঘড়ি করে সম্পন্ন করছে তারা চুক্তির যাবতীয় প্রক্রিয়াও। 

লালদিয়া টার্মিনাল ৪৮ বছর ও পানগাঁও টার্মিনাল ২২ বছরের জন্য পরিচালনা করার চুক্তি করলেও নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল বা এনসিটির ক্ষেত্রে হচ্ছে ব্যতিক্রম। চট্টগ্রাম বন্দরের সর্ববৃহৎ এই টার্মিনাল দীর্ঘ মেয়াদে নিতে চাচ্ছে না সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ড। এই টার্মিনালে বড় ধরনের কোনো বিনিয়োগও করতে চাচ্ছে না তারা। চট্টগ্রাম বন্দরের কেনা অত্যাধুনিক যেসব যন্ত্রপাতি এখন এই টার্মিনালে আছে; সেগুলো যতদিন কর্মক্ষম থাকবে, ডিপি ওয়ার্ল্ডও এনসিটিতে থাকতে চায় ঠিক ততদিন। অর্থাৎ যতদিন ‘মধু’ আছে ততদিনই। এনসিটিতে থাকা কি গ্যান্ট্রি ক্রেন, রাবার টায়ার্ড গ্যান্ট্রি ক্রেনের মতো বেশির ভাগ অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি কেনা হয়েছে গত পাঁচ বছরে। আরও ১৫ বছর কর্মক্ষমতা আছে এসব যন্ত্রপাতির। তাই বিদেশি প্রতিষ্ঠানও প্রাথমিকভাবে ১৫ থেকে ২০ বছর পরিচালনা করতে চায় এনসিটি। দ্বিতীয় মেয়াদেও তারা থাকতে চায় একই সময়। তাদের এমন প্রস্তাব মূল্যায়ন করেই চূড়ান্ত করা হচ্ছে চুক্তির দিনক্ষণ। চুক্তির বিষয়ে স্বনামে কোনো বক্তব্য দিচ্ছেন না চট্টগ্রাম বন্দরের কোনো কর্মকর্তা। মন্ত্রণালয় থেকেও বিধিনিষেধ দেওয়া হয়েছে।

 তবে চট্টগ্রাম বন্দরের মুখপাত্র ও পরিচালক (প্রশাসন) মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, ‘বন্দরে প্রথম কি গ্যান্ট্রি ক্রেন যুক্ত হয় ২০০৫ সালে। এখন এমন যন্ত্রপাতি সবচেয়ে বেশি আছে এনসিটিতে। এর বেশির ভাগই কেনা হয়েছে গত পাঁচ বছরে। গড়ে ২০ বছর লাইফটাইম হিসাব করলে আরও ১৫ থেকে ২০ বছর ভালো সার্ভিস দেবে কি গ্যান্ট্রি ক্রেনগুলো।’ 

এনসিটির চুক্তি কখন, কত বছরের জন্য হচ্ছে– এমন প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে গিয়ে তিনি বলেন ‘সরকার যাদের ডকুমেন্ট তৈরি করার দায়িত্ব দিয়েছে তারাই বলতে পারবে।’ তবে আদালতের দেওয়া রায়ের সার্টিফায়েড কপি শুক্রবার পর্যন্ত বন্দরে আসেনি বলে জানান মুখপাত্র।

এনসিটিতে যেসব যন্ত্রপাতি আছে 
জাহাজ থেকে কনটেইনার ওঠানো-নামানোর জন্য বিশ্বের সবচেয়ে অত্যাধুনিক যন্ত্র ধরা হয় ‘কি গ্যান্ট্রি ক্রেন’কে। বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল বা এনসিটিতে এই ক্রেন দরকার ১২টি। আছে ১৪টি। এটি জাহাজ থেকে ঘণ্টায় ২৫ থেকে ৩০টি কনটেইনার ওঠাতে কিংবা নামাতে পারে জেটিতে। এনসিটি পরিচালনার জন্য শিপ-টু-শোর গ্যান্ট্রি ক্রেনসহ গত পাঁচ বছরে ধাপে ধাপে ৬০টি যন্ত্রপাতি কেনে বন্দর কর্তৃপক্ষ। এসব যন্ত্রপাতির মধ্যে আরও রয়েছে ৪২টি রাবার টায়ার গ্যান্ট্রি ক্রেন (আরটিজি), ১০টি স্ট্রাডেল ক্যারিয়ার (এসসি), রেল মাউন্টেড ইয়ার্ড ক্রেন, মোবাইল হারবার ক্রেন, পাঁচটি কনটেইনার মুভার ও চারটি খালি কনটেইনার হ্যান্ডলিং রিচ স্টেকার। চট্টগ্রাম বন্দরের অন্য কোনো টার্মিনালে এত বেশি সংখ্যক আধুনিক যন্ত্রপাতি নেই।

বিদেশি প্রতিষ্ঠানের টার্গেট কেন ১৫ থেকে ২০ বছর
এনসিটি পরিচালনায় বিদেশি অপারেটর ডিপি ওয়ার্ল্ড কেন ১৫ থেকে ২০ বছরের চুক্তি চাচ্ছে, তার ব্যাখ্যা দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এনসিটির টেন্ডার প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত বন্দরের এক পরিচালক জানান, বন্দরে ব্যবহৃত আধুনিক যন্ত্রপাতির সর্বোচ্চ কার্যক্ষমতা বা লাইফটাইম প্রায় ২০ বছর। এ সময়ের পর যন্ত্রপাতি সচল থাকলেও কাঙ্ক্ষিত সেবা পাওয়া যায় না। এ কারণেই ডিপি ওয়ার্ল্ড প্রাথমিকভাবে ১৫ থেকে ২০ বছরের জন্য চুক্তি করতে চায় এবং পরে একই মেয়াদে নবায়নের আগ্রহ দেখাচ্ছে। ফলে তারা মোট ৩০ থেকে ৪০ বছর এনসিটি পরিচালনায় থাকতে পারে।

আন্দোলনকারী ও বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সাবেক প্রচার সম্পাদক হুমায়ুন কবীর বলেন, প্রথম ধাপে ডিপি ওয়ার্ল্ড বর্তমানে থাকা সচল যন্ত্রপাতির পূর্ণ কর্মক্ষমতা ব্যবহার করেই পরিচালনা শেষ করতে চায়। পরে মেয়াদ বাড়ালে আরও নতুন অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি কিনে আবার ১৫ থেকে ২০ বছর পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে। তাঁর মতে, এভাবে ৩০-৪০ বছর শেষে টার্মিনাল বুঝিয়ে দিলেও বন্দর কর্তৃপক্ষ বড় সুবিধা পাবে না, কারণ তখন নতুন করে যন্ত্রপাতিতে বিনিয়োগ ও নতুন ম্যানেজমেন্ট গড়তে হবে। দীর্ঘ সময় পরিচালনার বাইরে থাকায় বন্দর কর্তৃপক্ষ তখন কঠিন চ্যালেঞ্জে পড়বে।

এনসিটির আয় বাড়ছে 
এনসিটির আয় ও নিট মুনাফা ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। সর্বশেষ পাঁচ অর্থবছরে (২০২০-২১ থেকে ২০২৪-২৫) এনসিটি থেকে মোট আয় এসেছে যথাক্রমে এক হাজার ৪৯ কোটি, এক হাজার ২৪৩ কোটি, এক হাজার ৩৭৫ কোটি, এক হাজার ৫২৩ কোটি ও এক হাজার ৭০০ কোটি টাকা। একই সময়ে সব খরচ বাদ দিয়ে নিট মুনাফা হয়েছে ২৩৩, ৩৪০, ৩৮৯, ৪৫৬ ও ৬৫০ কোটি টাকা। চট্টগ্রাম বন্দরের ট্যারিফ প্রায় ৪১ শতাংশ বেড়েছে, ফলে চলতি অর্থবছরে এনসিটির আয়ও আনুপাতিকভাবে বাড়বে।

গণসংহতি আন্দোলনের চট্টগ্রাম জেলার প্রধান সমন্বয়কারী হাসান মারুফ রুমি বলেন, এনসিটি একটি আধুনিক ও স্বয়ংসম্পূর্ণ টার্মিনাল। বর্তমান ট্যারিফ কাঠামো অনুযায়ী, প্রতিটি ২০ ফুট কনটেইনারে বন্দর কর্তৃপক্ষ গড়ে ১৬৫ ডলার আয় করলেও অপারেটরকে দিতে হয় মাত্র ১০ ডলার। অন্যান্য ব্যয় বাদ দিলে বন্দরের নিট আয় থাকে প্রায় ১০০ ডলার। কিন্তু ডিপি ওয়ার্ল্ড শুরুতে মাত্র ৬৫ ডলার দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল, পরে কিছুটা বাড়ালেও মূল্যায়ন কমিটি ১০০ ডলারের বেশি দাবি করেছে এবং এখনও তারা সেই দাবিতে অনড় রয়েছে।

যা বলছেন সাবেক বোর্ড মেম্বার 
বন্দরের সাবেক বোর্ড মেম্বার জাফর আলম এর আগে বলেন, ‘গ্রিন ফিল্ডে নতুন অবকাঠামো নির্মাণ ও পরিচালনার জন্য বিদেশি বিনিয়োগ সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্ত। লালদিয়ার চর, বে-টার্মিনালে বিদেশি বিনিয়োগের যে প্রক্রিয়া চলছে, সেটিকে আমি ইতিবাচকভাবে দেখছি। কারণ, বন্দরের কোনো অবকাঠামো নেই সেখানে। তবে নিউমুরিং টার্মিনালের প্রেক্ষাপট পুরো ভিন্ন। এখানে বন্দরের সব অবকাঠামো আছে, আছে অত্যাধুনিক সব যন্ত্রপাতিও। তাই এ টার্মিনাল নিয়ে আরও ভাবা উচিত। আরও দরকষাকষিতে যাওয়া উচিত।’ 

আন্দোলনকারীদের ব্যাপারে কঠোর হচ্ছে প্রশাসন 
এনসিটি পরিচালনায় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তিতে কোনো বাধা নেই– বৃহস্পতিবার হাইকোর্ট এমন রায় দেওয়ার পর উত্তপ্ত হচ্ছে বন্দর পরিস্থিতি। বন্দর ভবনে ঢুকে ২৯ জানুয়ারি বিক্ষোভ করেন শ্রমিক-কর্মচারীরা। বিক্ষোভে অংশ নেওয়া কর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ
এনসিটি বিদেশিদের কাছে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ সমাবেশ হয়েছে। গতকাল বিকেলে রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে ‘স্টুডেন্টস ফর সভরেন্টি’ নামের একটি সংগঠন এ কর্মসূচি পালন করে। সমাবেশে স্টুডেন্টস ফর সভরেন্টির আহ্বায়ক মুহম্মদ জিয়াউল হক, যুগ্ম আহ্বায়ক মহিউদ্দিন রাহাত ও দপ্তর সদস্য সাইফুল ইসলাম বক্তব্য দেন।