প্যাসেঞ্জার ভয়েসে সংবাদ প্রকাশ

স্লিপারবাস নিবন্ধনে জালিয়াতি, বিআরটিএর দুই কর্মকর্তা বরখাস্ত

Passenger Voice    |    ০৫:৩৬ পিএম, ২০২৬-০১-২৮


স্লিপারবাস নিবন্ধনে জালিয়াতি, বিআরটিএর দুই কর্মকর্তা বরখাস্ত

আকতার হোসেন, নিজস্ব প্রতিবেদকঃ গত ৯ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার মিরসরাইয়ে কাঠবোঝাই ট্রাকের পেছনে স্লিপার বাসের ধাক্কায় তিনজনের প্রাণহানির ঘটনায় সড়কে  আরেকটি বিশৃঙ্খলার ঘটনা সামনে এসেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিআরটিএ মোটাদাগে ঘুষ নিয়ে অনুমোদন ছাড়াই অনেকগুলো কোম্পানির অবৈধ স্লিপার বাসের নিবন্ধন দিয়েছে। বাসগুলো নামকাওয়াস্তে স্লিপার ও কাঠামোগতভাবে বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। অনুমোদনহীন এসব বাসের বিরুদ্ধে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিআরটিএ দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না, সাম্প্রতিক বিআরটিএর কক্সবাজার জেলা সার্কেলের কর্মকর্তাগণ কয়েকটি বাসকে ভ্রাম্যমান আদালতের মাধ্যমে জরিমানা করলেও এইসব গাড়ি সড়ক থেকে সরাতে কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি। যা সড়ক নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগজনক হিসেবে মনে করছে পরিবহন বিশেষজ্ঞরা। 

যাত্রীদের ভাষ্য অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন মহাসড়কে রাতের আঁধারে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে অবৈধ স্লিপার বাস। আরামদায়ক যাত্রার প্রতিশ্রুতি দিয়ে যাত্রী টানলেও, বাড়ছে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির আশঙ্কা। এ বাসগুলো আসলে আরামের আড়ালে মারণফাঁদে পরিণত হয়েছে। কারণ এসব বাসে নিরাপত্তা নকশা, ভারসাম্য বণ্টন, ব্রেক সিস্টেম এবং জরুরি নির্গমন পথের কোনো বৈজ্ঞানিক হিসাব রাখা হয় না। কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে যাত্রীদের বের হওয়ার উপায় থাকে না। আগুন লাগলে বা বাস উল্টে গেলে উদ্ধার কাজও হয়ে পড়ে কঠিন।

এদিকে স্লিপার বাস নিবন্ধনে জড়িত বিআরটিএর ময়মনসিংহ সার্কেলের সাবেক সহকারী পরিচালক (ইঞ্জিঃ) এস এম ওয়াজেদ হোসাইন ও মোটরযান পরিদর্শক আব্দুল খাবীরুর অনিয়ম দুর্নীতি নিয়ে প্যাসেঞ্জার ভয়েস সংবাদ প্রকাশ করলে নড়েচড়ে বসে সংস্থাটি। ২০২৪ সালের ১০ ডিসেম্বর জালজালিয়াতির মাধ্যমে মোটা অঙ্কের ঘুষ নিয়ে স্লিপার বাসের নিবন্ধন প্রদানের বিষয়ে প্যাসেঞ্জার ভয়েস পত্রিকায় অনুসন্ধান প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনটি আমলে নিয়ে বিআরটিএর সাবেক চেয়ারম্যান মো. ইয়াছিনের নির্দেশে একই বছরের ১২ ডিসেম্বর পরিচালক (অপারেশন) মীর আহমেদ তারিকুল ওমর স্বাক্ষরীত ৮৫১ নং স্বারকে সংস্থাটির উপ পরিচালক (ইঞ্জিঃ) মোঃ তৌহিদুল ইসলাম তুষারকে এক সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটির দায়িত্ব প্রদান করেন। তদন্তকারী কর্মকর্তা ২০২৫ সালের ২৬ জানুয়ারি সহকারী পরিচালক (ইঞ্জিঃ) ওয়াজেদ হোসাইন ও মোটরযান পরিদর্শক আব্দুল খাবীরুকে অভিযুক্ত করে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। তবে সংস্থাটির বর্তমান চেয়ারম্যান আবু মমতাজ সাদ উদ্দিন আহমেদ যোগদানের পরে দুর্নীতিবাজ এই দুই কর্মকর্তার চাপে তদন্ত প্রতিবেদনসহ ফাইলটি গোপন করা হয়।  

বিআরটিএর কোন দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা এগুলো নিবন্ধন দেয়ঃ গত ৯ জানুয়ারি চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে দুর্ঘটনার শিকার ঢাকা মেট্রো-ব-১২-২৮৮১ স্লিপার বাসটি নিবন্ধন দিয়েছিলো বিআরটিএর ঢাকা মেট্রো-২ সার্কেল অফিস। বিআরটিএর সূত্র বলছে গাড়িটি পরিদর্শন না করে ঘুষের বিনিময়ে ২০২৩ সালের ৩০ অক্টোবর নিবন্ধন প্রদানের জন্য ভুয়া পরিদর্শন রিপোর্ট দিয়েছিল সংস্থাটির তৎকালিন উক্ত সার্কেলের মোটরযান পরিদর্শক তাজুল ইসলাম। অন্য দিকে মোটাদাগে ঘুষ নিয়ে নিবন্ধন প্রদান করে সার্কেলটির রেজিষ্ট্রেশন কর্তৃপক্ষ। তবে এই সকল স্লিপার বাসের সবচেয়ে বেশি নিবন্ধন প্রদান করেছে সংস্থাটির ময়মনসিংহ সার্কেলে। ২০২৩-২৪ সালে ওই সার্কেলে দায়িত্বরত সহকারী পরিচালক (ইঞ্জিঃ) ওয়াজেদ হোসাইন ও মোটরযান পরিদর্শক আব্দুল খাবীরু। বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা ও বিআরটিএর নিজস্ব তদন্ত কমিটির কাছেও তার প্রমাণ মিলেছে। অন্যদিকে গোয়েন্দা সংস্থার এক প্রতিবেদনে সহকারী পরিচালক (ইঞ্জিঃ) এস এম ওয়াজেদ হোসেনের শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অনেকে মনে করছেন দ্রুত সময়ের মধ্যে এই কর্মকর্তার শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদের অফিশিয়াল তদন্ত শুরু করবেন তাঁরা। 

বিআরটিএর তদন্ত প্রতিবেদনে যা বলা হয়েছেঃ ২০২৪ সালের ১০ ডিসেম্বর জালজালিয়াতির মাধ্যমে মোটা অঙ্কের ঘুষ নিয়ে স্লিপার বাসের নিবন্ধন প্রদানের বিষয়ে প্যাসেঞ্জার ভয়েস পত্রিকায় অনুসন্ধানি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনটি আমলে নিয়ে বিআরটিএর সাবেক চেয়ারম্যান মো. ইয়াছিনের নির্দেশে একই বছরের ১২ ডিসেম্বর পরিচালক (অপারেশন) মীর আহমেদ তারিকুল ওমর স্বাক্ষরীত ৮৫১ নং স্বারকে সংস্থাটির উপ পরিচালক (ইঞ্জিঃ) মো: তৌহিদুল ইসলাম তুষারকে এক সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটির দায়িত্ব প্রদান করেন। তদন্তকারী কর্মকর্তা ২০২৫ সালের ২৬ জানুয়ারি সহকারী পরিচালক (ইঞ্জিঃ)  এস এম ওয়াজেদ হোসেন  ও মোটরযান পরিদর্শক আব্দুল খাবীরুকে অভিযুক্ত করে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। তবে সংস্থাটির বর্তমান চেয়ারম্যান আবু মমতাজ সাদ উদ্দিন আহমেদ যোগদানের পরে দুর্নীতিবাজ এই দুই কর্মকর্তার চাপে তদন্ত প্রতিবেদনসহ ফাইলটি গোপন করা হয়। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ৩ নভেম্বর পুনরায় এই বিষয়ে সংবাদ প্রকাশিত হলে ২৪ ডিসেম্বর নং-৩৫.০৩.০০০০.০০১.৩৩.০৮১.২০-২৭৫৩ সংক্ষক স্বারকে তদন্তকারী কর্মকর্তা উপ পরিচালক (ইঞ্জিঃ) মো: তৌহিদুল ইসলাম তুষারকে পুনরায় চিঠি ইস্যু করে বিআরটিএ। ২য় বারের মতো আবারও তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। গত ৯ জানুয়ারী চট্টগ্রামের মীরসরাই উপজেলার মসজিদিয়া গ্রামের মার্চেন্ট নৌবাহিনীর সদস্য নাফিজ আহমেদ অয়নসহ তিনজন নিহতের ঘটনায় আবারও সামনে চলে আসে স্লিপার বাস নিবন্ধন কেলেঙ্কারির তথ্য। পরবর্তীতে চলতি বছরের ১৪ জানুয়ারি বিআরটিএর চেয়ারম্যান আবু মমতাজ সাদ উদ্দিন আহমেদ স্বাক্ষরিত নং-৩৫.০৩.০০০০.০০০.০০১.২৭.০১১৯.২৫-১১২ সংক্ষক স্বারকে সরকারী কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ এর ২ (খ) অনুযায়ী অসদাচরণ এবং একই বিধিমালার ৩ (খ) অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ করায় সহকারী পরিচালক (ইঞ্জিঃ)  এস এম ওয়াজেদ হোসেনকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত এবং তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা রুজু করা হয়। একই সাথে ১৪ জানুয়ারী নং-৩৫.০৩.০০০০.০০০.০০১.২৭.০১১৯.২৫-১১৩ সংক্ষক স্বারকে মোটরযান পরিদর্শক আব্দুল খাবীরুকেও সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।