দুই সংগঠনের চাপ, সুতার বন্ড সুবিধা ‘সমন্বয়ের’ পথে হাঁটছে সরকার

Passenger Voice    |    ১২:০৫ পিএম, ২০২৬-০১-২৬


দুই সংগঠনের চাপ, সুতার বন্ড সুবিধা ‘সমন্বয়ের’ পথে হাঁটছে সরকার

সুতা আমদানির একটি অংশে বন্ড সুবিধা থাকা ও তা প্রত্যাহার নিয়ে দেশের তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাতের ব্যবসায়ীরা পরস্পর মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ‘সমন্বয়ের’ পথে হাঁটছে সরকার। এ দুটি খাতই এককভাবে সবচেয়ে বেশি ব্যক্তির কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের উৎস হওয়ায় এ বিষয়ে বিশেষ নজর দিতে হচ্ছে সরকারের সংস্থাগুলোকে।

সুতা আমদানিতে একক দেশ নির্ভরতা এড়ানো এবং কম দামে তৈরি পোশাক খাতে সুতার যোগান দেওয়ার উদ্যোগে যে সংকট দেখা দিয়েছে, তার উপায় খুঁজতে ফের ‘কো-অর্ডিনেশন’ সভা করতে যাচ্ছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।

এজন্য তৈরি পোশাক খাতের কাঁচামাল হিসেবে আমদানি করা সুতার উপর বন্ড সুবিধা বাতিলের যে সুপারিশ করা হয়েছিল, সেখান থেকে সরে এসেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। সব ধরনের সুতা নয়, দেশে বেশি ব্যবহার হওয়া ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের সুতা আমদানিতে বন্ডেড ওয়্যারহাউজ সুবিধা তুলে নেওয়ার কথা বলেছিল মন্ত্রণালয়।

এমন পরিস্থিতিতে পোশাক রপ্তানি খাতের বৃহৎ দুই সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ এর চাপের মুখে সুপারিশ পুনঃপর্যালোচনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে মন্ত্রণালয়টি। এজন্য বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনকেও চিঠি দিয়েছে তারা। মন্ত্রণালয় ও ট্যারিফ কমিশন যৌথভাবে পর্যালোচনা করে নতুন করণীয় ঠিক করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তিন সংগঠনের এমন চাপের মুখে আপাতত বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সুপারিশ বাস্তবায়ন না করে নতুন সিদ্ধান্ত জানতে অপেক্ষা করবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড(এনবিআর)।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মাহবুবুর রহমান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘‘আমরা তাদের (বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ) এর প্রক্রিয়া দেখছি গণমাধ্যমে। তাদের স্বার্থ নিয়ে তারা কথা বলবেন এটা ঠিক। আবার দেশীয় শিল্প খাতকেও আমাদের দেখতে হবে।

‘‘আপাতত বন্ড সুবিধা বাতিল হচ্ছে না। এনবিআরও সময় নিচ্ছে। আমরা আবার তাদের (বিকেএমইএ, বিজিএমইএ ও বিএমটিএ) নিয়ে কো-অর্ডিনেশন মিটিং করবো। দেখব সকলের সঙ্গে আলোচনা করে কী করা যায়।’’

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের সপ্তাহ তিনেকের কম সময় আগে তিন সংগঠনের চাপ সমন্বয় করা যাবে কি না- এমন প্রশ্নে বাণিজ্য সচিব বলেন, ‘‘আমরা চেষ্টা করবো কো-অর্ডিনেশনটি করার। কিছু কাজ তো রুটিন হিসেবেই করা যায়। চলতি সপ্তাহের মধ্যে সভা করা যাবে হয়ত আশা করছি।’’

এ নিয়ে টানাপড়েনের মধ্যে গত বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ) সংবাদ সম্মেলন করে সাত দিনের মধ্যে বন্ড সুবিধা বাতিলের সুপারিশ বাস্তবায়ন না হলে ১ ফেব্রুয়ারি থেকে কারখানা বন্ধ করে দেবে। বর্তমানে বিটিএমএর সদস্য কারখানাগুলোর মধ্যে ৪৬০টি সচল রয়েছে।

অবশ্য ট্যারিফ কমিশন শুধু বিটিএমএ এর সঙ্গে আলোচনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কমিশনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘‘পোশাক খাতে বন্ড সুবিধা অব্যাহত রেখে সুতা উৎপাদনকারী স্থানীয় শিল্প-কারখানাকে কীভাবে বাড়তি সুবিধা দেওয়া যায় তা নিয়েই নতুন নীতি নির্ধারণী উপায় খুঁজে বের করে সুপারিশ করবে ট্যারিফ কমিশন।’’

এজন্য বিটিএমএকে একটি প্রশ্নপত্র ও সুপারিশপত্র দেওয়ার জন্য চিঠি দিয়েছে ট্যারিফ কমিশন। এটি সমন্বয় করছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এ বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘‘নির্বাচনের আগে সম্ভবত পর্যালোচনা শেষ হবে না। বন্ড সুবিধা দেওয়া না দেওয়ার সিদ্ধান্তটি রাজনৈতিক অর্থনীতিতে চলে গিয়েছে। সিদ্ধান্ত যতই যৌক্তিক হোক না কেনো, কোনো না কোনো সংগঠন নাও মানতে পারে। আর সপ্তাহ তিনেক পরেই নতুন সরকার আসবে, তাদের দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’’

তিন সংগঠনের এমন চাপ সামলাতে ‘আলাপ-আলোচনার’ মাধ্যমে সমাধান দেখার পরামর্শ দিয়েছেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) জ্যেষ্ঠ গবেষক তৌফিকুল ইসলাম খান।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, ‘‘শুধু বন্ড সুবিধা রাখা বা বাতিল করলেই খাতগুলোর সক্ষমতা বাড়বে না। জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সমস্যাও রয়েছে। স্পিনিং মিলগুলোকেও সক্ষমতা বাড়াতে হবে কীভাবে তুলনামূলক দামে সুতা দেওয়া যায়। এখন সরকার সবার সঙ্গে আলোচনা করেই বাস্তবসম্মত পথ বের করতে পারে।

স্থানীয় শিল্প হিসেবে স্পিনিং মিলগুলোকে সুরক্ষার যুক্তি তুলে ধরে দেশি স্পিনিং ও বস্ত্রকল ব্যবসায়ীদের সংগঠন বিটিএমএ গত সেপ্টম্বর ও ডিসেম্বর মাসে দুই দফায় তুলা দিয়ে বানানো সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা বাতিলের চিঠি দেয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে। সেই দাবির বিষয়ে যৌক্তিক সুপারিশ দিতে ট্যারিফ কমিশনকে দায়িত্ব দেয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগ। পরে তিন সংগঠনকে নিয়ে সভা করে কমিশন।

পরে ট্যারিফ কমিশনের সুপারিশের আলোকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় তুলা দিয়ে বানানো ১০-৩০ কাউন্টের সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা বাতিল করতে এনবিআরকে চিঠি দেয় গত ১২ জানুয়ারি। এরপরই সরব হয়ে উঠে পোশাক খাতের বড় দুটি সংগঠন বিজেএমইএ ও বিকেএমইএ। সরকারের এমন সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানাতে থাকে বিভিন্ন উপায়ে।

রপ্তানি শিল্প প্রতিষ্ঠান কাঁচামাল আমদানিতে বন্ড সুবিধা পায়। এ সুবিধার অর্থ হলো, শতভাগ রপ্তানি পণ্যর বিপরীতে শুল্কমুক্তভাবে কাঁচামাল আমদানি করতে পারবেন উদ্যোক্তরা। অভিযোগ আছে বন্ড সুবিধার আওতায় শুল্কমুক্ত সুতা এনে কালো বাজারে উচ্চ দরে বিক্রি করছেন অনেক ব্যবসায়ী। এতে সরকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বিটিএমইএর দাবি, স্থানীয় তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকরা বছরে যে পরিমাণ সুতা আমদানি করেন তার পুরোটাই দেশি প্রতিষ্ঠান থেকে যোগান দেওয়া সম্ভব।

এরপর বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এনবিআরকে আমদানি করা ১০-৩০ কাউন্টের তুলা দিয়ে বানানো সুতাকে বন্ড সুবিধার বাইরে রাখার সুপারিশ করে। তৈরি পোশাক খাতে ব্যবহৃত সুতার সর্বোচ্চ কাউন্ট হচ্ছে ৩০ থেকে ৩২। কোন ধরনের কাপড় তৈরি বা কোন কাজে ব্যবহৃত হবে তার উপর নির্ভর করে সুতার মান নির্নয়ের মাধ্যম হচ্ছে সুতার সংখ্যা গণনা। নতুন এ সিদ্ধান্তে তুলা দিয়ে বানানো এ ধরনের সুতা আমদানিতে আগাম প্রায় ৩৯ শতাংশ শুল্ক পরিশোধ করতে হবে তৈরি পোশাক খাতের ব্যাবসায়ীদের।

বিটিএমইএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘‘দেশি শিল্পকে সুরক্ষা করতে হবে আগে। ভারত ডাম্পিং হিসেবে আমাদের চেয়ে কম দামে সুতা দিচ্ছে। এভাবে তারা বছর খানেক চালাতে পারলে বাংলাদেশের স্পিনিং মিলগুলো দেউলিয়া হয়ে যাবে, ব্যবসায়ীরা খেলাপি হয়ে মিল বন্ধ করতে বাধ্য হবেন।’’

তার আশঙ্কা, ‘‘বাংলাদেশের স্পিনিং মিল বন্ধ হয়ে গেলেই ভারত সুতার দাম পার কেজিতে ১ ডলার বাড়িয়ে দেবে। দাম বাড়াবে এটা নিশ্চিত, তখন আরএমজি খাত কী করবে?’’ বাংলাদেশ বছরে যে পারিমাণ সুতা আমদানি করে তার ৪০ শতাংশই আসে ভারত থেকে। অন্যদিকে দেশটির সুতা রপ্তানির ৬০ শতাংশের গন্তব্য বাংলাদেশ।

আমদানিতে একক নির্ভর দেশ হওয়া ‘ঝঁকিপুঁর্ণ’ মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘‘ভারত কোভিডের সময়ে হঠাৎ করেই আমদানি বন্ধ করে দিয়েছিল। পেঁয়াজ, মরিচের কথা নাই বা বললাম। তারা বাণিজ্য নীতিতে কোনো নির্ভরশীল দেশ না। সবচেয়ে বড় কথা হলো, দেশি শিল্পকে রক্ষা করতে হবে কর্মসংস্থানের জন্য।’’

দেশে প্রতি বছর গড়ে ৩৯ বিলিয়নে ডলারের রপ্তানি করে তৈরি পোশাক খাত, যা দেশের মোট পণ্য রপ্তানির প্রায় ৮৫ শতাংশ। অন্যদিকে পোশাক কারখানাগুলোতে সুতা ও কাপড় সরবরাহ করতে প্রায় ২৩ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগে গড়ে উঠেছে বস্ত্র খাত।

হঠাৎ করে সুতা আমদানি ২০২৩ সালে ৯ লাখ ২৪ হাজার টন থেকে বেড়ে ২০২৪ সালে হয় প্রায় ১২ লাখ ১৫ হাজার টন, যার আর্থিক মূল্য হয় ৩০০ কোটি ডলারের বেশি। এক বছরে প্রবৃদ্ধি হয় ৩১ দশমিক ৪৫ শতাংশ। আমদানি বেড়ে যাওয়া অংশের ৯৫ শতাংশ এসেছে ভারত থেকে।

অন্যদিকে দেশের মোট চাহিদার সুতার শতভাগ দেশি মিলগুলো যোগান দিতে পারবে বলে দাবি করেছে বিটিএমএ। তারপরও তৈরি পোশাক খাতের উদ্যোক্তরা ৬০ শতাংশ দেশ থেকে ও ৪০ শতাংশ বাহির থেকে আমদানি করে। এ কারণে বিটিএমএ সদস্য মিলগুলোতে প্রায় সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকার সুতা অবিক্রিত হয়ে আছে।

ট্যারিফ কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারত ও বাংলাদেশের স্পিনিং মিলে সুতা উৎপাদনে প্রায় কাছাকাছি অর্থাৎ প্রতি কেজিতে ২ ডলার ৯৩ সেন্ট খরচ হয়। বর্তমানে প্রতি কেজি সুতা ভারত থেকে আমদানিতে আড়াই থেকে ২ দশমিক ৬০ ডলার লাগার তথ্য দিয় বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘‘দেশি মিলগুলো আমাদের আমদানির চেয়ে অনেক বেশি কোনো কোনো সময়ে এক ডলার পর্যন্ত বেশি দাম রাখে। এখন দাম বেশি হলে কেন কিনবে ব্যবসায়ীরা। বায়াররা তো সেটা বুঝবে না, তারা আন্তর্জাতিক বাজারের দামতো জানে।’’

তিনি বলেন, ‘‘আমদানি সুতার চেয়ে দেশি মালিকরা প্রতি কেজিতে ৪৬ টাকা বেশি নিচ্ছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। ১০ থেকে ২০ সেন্ট প্রতি কেজিতে বেশি নিলেও মানা যায়। কিন্তু এর চেয়ে বেশি হলে খাত সমস্যায় পড়বে।’’

বর্তমানে আমদানি সুতার সঙ্গে স্থানীয় স্পিনিং মিলের সুতার দামে প্রতি কেজিতে পার্থক্য ২৫ থেকে ৩০ সেন্ট। এটি নামিয়ে ১২ থেকে ২৫ টাকা করার মধ্যে দাবি করেছে বিজিএমইএ নেতা সেলিম রহমান।

ভারতে তুলা উৎপাদিত হয়। এজন্য দেশটি সুতা রপ্তানিতে নিয়মিত প্রণোদনা দিচ্ছে। যে কারণে তারা কম দামে তুলা রপ্তানি করতে পারছে মন্তব্য করে বিটিএমএ সভাপতি বলেন, ‘‘আমাদের বিনিয়োগ খরচ বেশি। আগে ২৫ শতাংশ প্রণোদনা দেওয়া হতো, এখন নামতে নামতে দেড় শতাংশে এসে দাঁড়িয়েছে। আমাদের সুবিধা দিলে আমরাও দাম কমাতে পারবো।’’