শিরোনাম
Passenger Voice | ০২:৪২ পিএম, ২০২৬-০১-২৪
ছয় দশক ধরে আলোচনা ও সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পর বহুল আলোচিত পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণ করতে যাচ্ছে সরকার। আগামী মার্চ মাসেই প্রকল্পের কাজ শুরু হচ্ছে। আপাতত প্রকল্পের ব্যয় ধরা হচ্ছে ৫০ হাজার ৪৪৪ কোটি টাকা। তবে এ ব্যয় বাড়তে পারে। এত বড় ব্যয়ের জোগান বিবেচনায় তিনটি পর্যায়ে প্রকল্পের কাজ শেষ করা হবে। ব্যারাজ নির্মাণে ব্যয় জোগান দেওয়া হবে সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে। আপাতত কোনো বিদেশি ঋণ নেই প্রকল্পে। তবে উন্নয়ন সহযোগীদের আগ্রহ দেখা গেলে পরিস্থিতি বুঝে পরবর্তী সময় ঋণ নেওয়া হতে পারে। আগামীকাল রোববার জাতীয় অর্থনৈতিক পর্ষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে অনুমোদনের জন্য প্রকল্পটি উপস্থাপন করা হবে। সূত্র সমকাল
প্রকল্প প্রস্তাবে বলা হয়েছে, ১৯৭৫ সালে ভারত পশ্চিমবঙ্গে ফারাক্কা ব্যারাজ নির্মাণের কারণে বাংলাদেশের পদ্মা নদীতে প্রবাহ ব্যাপকভাবে কমে যাওয়ায় কৃষি, নৌ চলাচল, সুন্দরবন ও জীববৈচিত্র্যের যে ক্ষতি হয়েছে, তা থেকে সুরক্ষা দেবে। পদ্মা নদীতে শুষ্ক মৌসুমে পানি সংরক্ষণ এবং পানির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের নদীগুলোতে প্রবাহ বাড়ানোর মাধ্যমে সেচ সহজ করা প্রকল্পের বড় উদ্দেশ্য। এর বাইরে প্রকল্পের হাইড্রো প্লান্ট থেকে প্রায় বিনা ব্যয়ে ১১৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে। ব্যারাজের ওপর দিয়ে দুই কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের একটি রেলওয়ে সেতুও নির্মাণ হবে।
প্রকল্প প্রস্তাব অনুযায়ী পদ্মা ব্যারাজের জন্য ডেডিকেটেড একটি ল্যাব নির্মাণ করা হবে, যেখানে নির্মাণসামগ্রীর মান যাচাই করা হবে। এ ছাড়া নির্মাণে প্রতিটি ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ মান নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল সহায়তা নেওয়া হচ্ছে। সাত বছরের মাথায় ২০৩৩ সালে শেষ করা হবে নির্মাণকাজ। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে।
পানিসম্পদ বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাত মনে করেন, বর্তমান সরকারের একেবারে শেষ সময়ে এসে এ ধরনের প্রকল্প নেওয়ার উদ্যোগ একেবারেই রাজনীতির বিষয়। গত প্রায় ছয় দশক ধরে প্রকল্পটি না হওয়ার পেছেনও রাজনীতিই বড় কারণ ছিল। তিনি বলেন, একনেকে অনুমোদন হলেও প্রকল্পটি আদৌ বাস্তবায়ন হবে কিনা, তা নিয়ে সংশয় থেকে যাবে। কারণ, ভারতের সঙ্গে পানি নিয়ে সমঝোতায় না এলে পানি প্রবাহ পাবে না বাংলাদেশ। বিষয়টি অমীমাংসিত রেখে বাংলাদেশে ব্যারাজ নির্মাণ কোনো কাজে দেবে না। এমনকি ভারতের কাছ থেকে পানি পাওয়ার প্রতিশ্রুতি পাওয়া না গেলে বড় কোনো উন্নয়ন সহযোগী প্রকল্পে ঋণ দিতেও রাজি হবে না।
ডিপিপি এবং পিইসির বৈঠকে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের যৌক্তিকতা প্রসঙ্গে বলা হয়, পদ্মা নদীর ৪০ হাজার কিউসেক পানি ভাগীরথী-হুগলি নদীতে প্রবাহিত করা এবং দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে সংযুক্ত কলকাতা বন্দরের নাব্য উন্নয়নে ভারত ১৯৭৫ সালে ফারাক্কা ব্যারাজ নির্মাণ করে। ফারাক্কা ব্যারাজের উজানে পানি প্রবাহের ফলে বাংলাদেশের পদ্মা নদীর প্রবাহ ব্যাপক হ্রাস পায়। এ কারণে কৃষি, মৎস্য, বনায়ন, নৌ চলাচল ও ইকোসিস্টেম ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্বাদু পানির প্রবাহ হ্রাসের কারণে সুন্দরবন এবং এর জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে সন্দরবনের আশপাশের নদী ও খালে উচ্চ ঘনত্বের লবণাক্ততায় গুরুতর হুমকির সম্মুখীন হয়েছে।
সম্ভাব্যতা সমীক্ষার ভিত্তিতে রাজবাড়ী জেলার পাংশা পয়েন্টকে গঙ্গা ব্যারাজ নির্মাণের জন্য সবচেয়ে উপযোগী স্থান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ২ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ ব্যারাজের মাধ্যমে নদীর প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ, পানি বিভাজন এবং নিম্ন প্রবাহে পানির সুষ্ঠু বণ্টন তুলনামূলক সহজ হবে। ডিপিপিতে প্রকল্পের প্রধান কাজের মধ্যে রয়েছে ৭৮টি স্পিলওয়ে গেট, যার প্রতিটির প্রস্থ ১৮ মিটার। এ ছাড়া ১৮টি আন্ডার স্লুইসগেট থাকবে। নৌযান চলাচলের জন্য ১৪ মিটার প্রশস্ত একটি নেভিগেশন লক এবং দুটি ২০ মিটার প্রশস্ত ফিশ পাস রাখা হবে। ব্যারাজের ওপর দিয়ে ২ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি রেলওয়ে সেতুও অন্তর্ভুক্ত থাকবে। ১১৩ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ প্লান্ট থাকবে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় পানির সরবরাহ নিশ্চিত করা প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের কৃষি, পানিসম্পদ ও পল্লি প্রতিষ্ঠান বিভাগ পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পটি যাচাই করেছে। জানতে চাইলে এই বিভাগের সদস্য সরকারের সচিব ড. মোস্তাফিজুর রহমান সমকালকে বলেন, প্রকল্পটি গুরুত্বপূর্ণ। সম্ভাব্যতা সমীক্ষা অনেক পুরোনো হওয়ায় হালনাগাদ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। যাচাই-বাছাইয়ে বিভিন্ন অঙ্গের ব্যয়সহ বেশ কিছু পরামর্শ দিয়েছেন তারা। সেগুলো ডিপিপিতে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। প্রায় ৬ দশক আগে পরিকল্পনা নেওয়া হলেও এতদিন কেন বাস্তবায়িত হয়নি– এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টরা ভালো বলতে পারবেন। তবে এখন সবারই উচিত দেশের স্বার্থে কাজ করা।
ডিপিপিতে বলা আছে, পদ্মা ব্যারাজ বাস্তবায়ন হলে শুষ্ক মৌসুমে প্রায় দুই হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনমিটার পানি সংরক্ষণ করা হবে, যা হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতী, চন্দনা-বারাশিয়া, ইছামতী ও বড়াল নদের ব্যবস্থায় প্রবাহ ফিরিয়ে আনবে। এতে লবণাক্ততা হ্রাস পাবে, স্বাদুপানির নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে এবং সুন্দরবনের প্রতিবেশ রক্ষা পাবে। একই সঙ্গে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদীগুলো থেকে পলি অপসারণ, পোল্ডারগুলোর নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং সেচ সুবিধা বাড়বে।
সংকটাপন্ন শুষ্ক মৌসুমে ব্যারাজ দিয়ে ন্যূনতম ৫৭০ ঘনমিটার প্রতি সেকেন্ড পানি ছাড়ার পরিকল্পনা রয়েছে, যা নিম্ন প্রবাহের নদীগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করবে। প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় ১৯ লাখ হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা নিশ্চিত হলে কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, যশোর, খুলনা, বরিশাল, পাবনা ও রাজশাহী অঞ্চলে কৃষি উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত 2019 - 2026 PassengerVoice | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Developed By Muktodhara Technology Limited.
পাবলিক মতামত