ভোট দিতে পারছেন না অনেক ব্যাংক কর্মকর্তা

Passenger Voice    |    ০২:৪৫ পিএম, ২০২৬-০১-২১


ভোট দিতে পারছেন না অনেক ব্যাংক কর্মকর্তা

নির্ধারিত সময়ে চিঠি না পাওয়ায় নির্বাচনে দায়িত্ব পাওয়া অধিকাংশ ব্যাংক কর্মকর্তা আসন্ন নির্বাচনে ভোট দিতে পারছেন না। যদিও পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোটের জন্য তারা নির্বাচিত হয়েছেন।

এ ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন, সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দিচ্ছে। 

এবারের নির্বাচনে কেবলমাত্র সরকারি ছয় ব্যাংকের প্রায় পাঁচ হাজার কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করছেন। বেসরকারি ব্যাংক কর্মকর্তাদের এবার দায়িত্ব পালনে বিধিনিষেধ রয়েছে। সরকারি ব্যাংকগুলোর অধিকাংশ কর্মকর্তা সময়মতো নির্বাচন কমিশনের চিঠি না পাওয়ায় তারা নির্ধারিত সময়ে পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোটাধিকার প্রয়োগের জন্য নিবন্ধন করতে পারেননি।

যদিও নির্বাচন কমিশন বলছে, তারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই চিঠি পাঠিয়েছেন। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, ৫ জানুয়ারি নিবন্ধনের মেয়াদ শেষ হলেও বাংলাদেশ ব্যাংক ১৫ জানুয়ারি নিবন্ধনের বিষয়ে নির্দেশনা জারি করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে তথ্যপ্রযুক্তি-সমর্থিত পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়ার জন্য ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্য থেকে যারা নির্বাচনি দায়িত্বে নিয়োজিত হবেন, তাদের নিয়োগ পাওয়ার পরপরই অনতিবিলম্বে ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ (Postal Vote BD) অ্যাপের মাধ্যমে নিবন্ধন সম্পন্ন করতে হবে।

মূলত, নির্বাচনি ব্যবস্থাপনার সামনের সারিতে থেকে দায়িত্ব পালনকারীরা যেন ডিজিটাল প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার সঙ্গে নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন, সেই লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানী ঢাকার শাখাগুলোতে চিঠি পৌঁছালেও ঢাকার বাইরের শাখাগুলোতে এখনো এ-সংক্রান্ত কোনো নির্দেশনা পাননি সেখানকার কর্মকর্তারা। জানতে চাইলে টাঙ্গাইলের ব্যাংক কর্মকর্তা সংযুক্তা বর্ধণ খবরের কাগজকে বলেন, ‘নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করতে হবে কি না, এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো নির্দেশনা পাইনি।’ 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শওকত আলী খান বলেন, ‘আমাদের ব্যাংকে চিঠি এসেছে ৮ তারিখে। কেউ কেউ নিজে থেকে নিবন্ধন করলেও অধিকাংশ কর্মকর্তাই নিবন্ধন করতে পারেননি। এ বিষয়ে আমরা নির্বাচন কমিশনে যোগাযোগ করলে তারা আমাদের জানিয়েছেন, নিবন্ধনের সময় আর বাড়ানোর সুযোগ নেই। তবে যদি বিশেষ কোনো কারণে এ সুযোগ বাড়ানো হয়, তাহলে বাদপড়া কর্মকর্তারা অবশ্যই নিবন্ধন করতে পারবেন।’ 

নির্ধারিত সময়ের পর বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলার জারির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনের ‘আউট অব কান্ট্রি ভোটিং সিস্টেম অ্যান্ড ইমপ্লিমেন্টেশন (ওসিভি-এসডিআই)’ প্রকল্পের ‘টিম লিডার’ অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সালীম আহমাদ খান বলেন, পোস্টাল ব্যালটে ভোটের নিবন্ধন ইস্যুতে নির্বাচন কমিশন কোনো দেরি করেনি।

তিনি বলেন, ‘আইটি সাপোর্টেট পদ্ধতিতে পোস্টাল ব্যালটের জন্য নিবন্ধন করতে সরকারি কর্মকর্তাদের উদ্বুদ্ধ করতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে দুই দফা আনুষ্ঠানিক চিঠি দেওয়া হয়। সর্বশেষ গত ৩১ ডিসেম্বর পোস্টাল ব্যালটের জন্য নিবন্ধনের বর্ধিত ৫ জানুয়ারি পর্যন্ত নির্ধারিত সময়ের ৫ দিন আগেই (৩০ ডিসেম্বর ২০২৫) বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানে চিঠি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক কেন সময় শেষ হওয়ার ১০ দিন পর কর্মকর্তাদের জন্য চিঠি দিয়েছেন তার জবাব সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানই বলতে পারবে। আমাদের পক্ষ থেকে শুধু চিঠি নয়, নির্ধারিত সময়ের অনেক আগে থেকেই এ বিষয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে বিজ্ঞাপন ও বিজ্ঞপ্তিও প্রকাশ করা হয়েছে।’

বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র  বলেন, প্রতিটি ব্যাংকের সঙ্গে নির্বাচন কমিশন এ-সংক্রান্ত কাজে সরাসরি যোগাযোগ করেছে। এখানে বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো ভূমিকা নেই। ফলে দেরিতে সার্কুলার দিলেও কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়। বাংলাদেশ ব্যাংক শুধুমাত্র রুটিনমাফিক কাজ হিসেবে এটা করেছে। 

সারা দেশ থেকে প্রায় পাঁচ হাজার ব্যাংক কর্মকর্তা এবারের নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করবেন। এদের অর্ধেকেরও বেশি কর্মকর্তা এবার ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারছেন না। তারা বলছেন, ‘আমরা নির্ধারিত সময়ে চিঠি না পাওয়ায় পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে আবেদনের জন্য নিবন্ধন করতে পারিনি।’ 

নিবন্ধন করতে না পারা সোনালী ব্যাংকের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দেওয়ার জন্য নিবন্ধনের শেষ সময় ছিল ৫ জানুয়ারি। আর আমি চিঠি পেয়েছি ৮ জানুয়ারি। ফলে আমি সেখানে নিবন্ধন করতে পারিনি। আমি আমার ভোট দেওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছি। শুধু আমি নই, অধিকাংশ কর্মকর্তাই এই নিবন্ধন করতে পারেননি।’ রূপালী ব্যাংকের কর্মকর্তা শাহেদ খান খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমি ৫ তারিখেই চিঠি পেয়েছি। আর সেদিনই তড়িঘড়ি করে শেষ সময়ে নিবন্ধন করেছি। তবে আমাদের অনেক কর্মকর্তা পরে চিঠি পাওয়ায় নিবন্ধন করতে পারেননি।’ 

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নির্ধারিত সময়ে চিঠি না পাওয়ায় ব্যাংক কর্মকর্তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগে বাধা একটি গুরুতর সমস্যা, যাতে নির্বাচনি প্রক্রিয়ার দুর্বলতাই প্রকাশ পায়। নির্বাচন কমিশন প্রথমবারের মতো বড় পরিসরে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট গ্রহণের উদ্যোগ নিলেও সময়মতো ব্যালট পেপার পৌঁছানো ও সঠিক পদ্ধতিতে জমা দেওয়া চ্যালেঞ্জিং, যার ফলে অনেক কর্মকর্তার ভোট দেওয়া থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এ জন্য নির্বাচন কমিশনকে আরও উন্নত ও ব্যবহারকারীবান্ধব ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে হবে, যেখানে কর্মকর্তারা সহজেই ব্যালট পাবেন ও ফেরত পাঠাতে পারেন। 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ সংস্থা ফেমার প্রেসিডেন্ট মনিরা খান বলেন, ‘প্রতিটা কাজ যদি রোডম্যাপ অনুযায়ী করা হয় এবং নির্ধারিত কাউকে দায়িত্ব দেওয়া হয়, তাহলে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জবাবদিহির আওতায় থাকেন। জবাবদিহি যদি সঠিকভাবে করতে না পারে তাহলে তো সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে তার বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলাজনিত কারণে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ আছে। এ ছাড়া যেসব ব্যাংক কর্মকর্তা নিবন্ধন করতে পারেননি, তারা নির্বাচন কমিশনের কাছে আপিল করতে পারেন, যে সংস্থাটির গাফিলতির কারণে তারা ভোট দেওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোকেই এ বিষয়ে উদ্যোগ নিতে হবে। যদি সেটি না করা হয়, তাহলে যে কথাটি আমরা বারবার বলছি সবার জন্য সমান সুযোগ, সেটি সঠিকভাবে কার্যকর হবে না। সেই সঙ্গে দেশের নাগরিক হিসেবে তারা বঞ্চিত হবেন। এখনো সময় আছে, নির্বাচন কমিশনকে অতিদ্রুত এ বিষয়ে উদ্যোগ নিতে হবে।’ 

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মূল ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হলেও পোস্টাল ব্যালটে নিবন্ধিত ভোটারদের জন্য ভোটের সময় নির্ধারণ করা হয়েছে ২১ থেকে ২৫ জানুয়ারির মধ্যে। নিয়ম অনুযায়ী, যারা সফলভাবে নিবন্ধন করবেন, তাদের বর্তমান ঠিকানায় ডাকযোগের মাধ্যমে আগাম ব্যালট পেপার পাঠিয়ে দেওয়া হবে। প্রতিটি ব্যালট পেপারে আলাদা কিউআর (QR) কোড ও ট্র্যাকিং ব্যবস্থা থাকবে, যাতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা যায়।

পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়ার পর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তা ফেরত পাঠানো বাধ্যতামূলক। দেশের ভেতরে অবস্থানরত ভোটারদের বাংলাদেশ ডাক বিভাগের মাধ্যমে এবং প্রবাসীদের সংশ্লিষ্ট দেশের ডাক বিভাগের মাধ্যমে ব্যালট ফেরত পাঠাতে হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ব্যালট ফেরত না পাঠালে সংশ্লিষ্ট ভোটটি বাতিল বলে গণ্য হবে।

নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে, এবারের নির্বাচনে পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দেওয়ার জন্য দেশ-বিদেশ মিলিয়ে ১৫ লাখের বেশি ভোটার নিবন্ধন করেছেন। এর মধ্যে দেশের অভ্যন্তরে অবস্থান করছেন ৭ লাখ ৬১ হাজার ভোটার। নির্বাচনি দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যাংকার ও সরকারি চাকরিজীবী ছাড়াও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, কারাবন্দি এবং প্রবাসী বাংলাদেশিরাও এই পোস্টাল ব্যালট ব্যবস্থার আওতায় ভোট দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। সূত্র খবরের কাগজ

 

 

প্যা.ভ.ম