শিরোনাম
Passenger Voice | ০২:৪৩ পিএম, ২০২৬-০১-১৯
বেলা আনুমানিক ১১টা। স্পিডবোটে শাহপরীর দ্বীপ থেকে দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিনের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করি। কাছাকাছি পৌঁছাতেই চোখে পড়ে সেন্ট মার্টিন উপকূল ঘেঁষে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর দুটি বড় আকৃতির জাহাজ নোঙর করে রাখা। পাশেই কোস্টগার্ডের আরেকটি জাহাজ। তার মাঝেই উচ্চগতির ছোট জাহাজ বা স্পিডবোটে সাগর-উপকূলে টহল দিচ্ছিলেন নৌবাহিনীর সদস্যরা।
গত বুধবার (১৪ জানুয়ারি) সরেজমিনে সেন্ট মার্টিন ও বঙ্গোপসাগর এলাকা পরিদর্শনকালে এমনই দৃশ্য দেখা যায়। কেবল সেন্ট মার্টিন দ্বীপ নয়, নৌবাহিনীর এই টহল এবং বিচরণ দেখা গেছে গভীর সমুদ্র এলাকাতেও। অথচ, ‘সেন্ট মার্টিন দখল হচ্ছে বা বিদেশিদের হাতে যাচ্ছে’ বলে সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন মাধ্যমে নানা ধরনের গুজব বা বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু সেখানে গিয়ে এমন কোনো চিত্র চোখে পড়েনি।
সেন্ট মার্টিন নিয়ে গুজব, যা বলছেন স্থানীয়রা
এ নিয়ে ওইদিন কথা হয় সেন্ট মার্টিন দ্বীপের জেলে ও স্থানীয় বাসিন্দা মো. আলমের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘সেন্ট মার্টিনে প্রথমে যে ১৩টি পরিবার বসবাস শুরু করেছিল, তার মধ্যে আমার দাদার বাবার পরিবারও ছিল। বলতে গেলে চার পুরুষ ধরে আমরা সেন্ট মার্টিনে বসবাস করছি।’
সেন্ট মার্টিন দ্বীপে বিদেশি জাহাজের আগমন বা দখলসংক্রান্ত বিষয়ে জানতে চাইলে হেসে ফেলেন মো. আলম। তিনি বলেন, ‘সেন্ট মার্টিন দ্বীপে বিদেশি কোনো জাহাজ আসেনি বা দখলের কোনো ঘটনা ঘটেনি। এগুলো আমরা ফেসবুকেই দেখেছি, শুনেছি। এখানে সব সময় নৌবাহিনীর জাহাজ মোতায়েন থাকে। সব সময় টহল চলছে। আমরা স্থানীয়রা কেউই ওই জাতীয় কোনো দৃশ্য দেখিনি। সেন্ট মার্টিন দখল বা অন্য দেশের জাহাজ আসার খবরগুলো মিথ্যা।’
সেন্ট মার্টিন জেটি ঘাটের অদূরে কথা হয় স্থানীয় দোকানি আব্দুল শুক্কুরের সঙ্গে। ষাটোর্ধ্ব শুক্কুর বলেন, ‘সেন্ট মার্টিনের পাশেই মিয়ানমারের সীমানা। এ কারণে অনেক সময় নানা গুজব ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু এখানে এমন কোনো ঘটনা কখনোই ঘটেনি। দ্বীপের চারপাশেই নৌবাহিনী সবসময় অবস্থান করছে। কোস্টগার্ড, পুলিশ ও বিজিবিও এখানে দায়িত্ব পালন করছে। আমরা যারা সেন্ট মার্টিন দ্বীপে বসবাস করি, তাদের মধ্যে কোনো রকম ভয় বা চিন্তা কাজ করে না। কারণ, এখানে সব সময় নৌবাহিনী মোতায়েন আছে। বাইরের লোকজনই নানা রকম গুজব ছড়িয়ে থাকে।’
সেন্ট মার্টিনের নিরাপত্তা-সুরক্ষায় ২৪ ঘণ্টা প্রস্তুত নৌবাহিনী
সেন্ট মার্টিন দ্বীপসহ বঙ্গোপসাগরের নিরাপত্তায় নিয়োজিতরা জানিয়েছেন, বাংলাদেশ নৌবাহিনী বঙ্গোপসাগরের সংবেদনশীল উপকূল রেখা সুরক্ষিত করার পাশাপাশি সেন্ট মার্টিন দ্বীপের চারপাশে সব সময় নিয়ন্ত্রণ জোরদার করে রাখে। সেন্ট মার্টিন দ্বীপে ভ্রমণকারী যে কেউ এলেই নৌবাহিনীর অন্তত এক থেকে দুটি জাহাজকে উপকূলের ঠিক পাশেই নোঙর করে রাখা অবস্থায় দেখতে পাবেন, যা দেশের গুরুত্বপূর্ণ এই ভূখণ্ডে সামরিক উপস্থিতির প্রতীক।
ওই এলাকায় দায়িত্বরত নৌবাহিনীর কর্মকর্তারা জানান, বাংলাদেশ নৌবাহিনী সেন্ট মার্টিন দ্বীপের চারপাশে সর্বদা সতর্ক থাকে। যেকোনো হুমকি বা অপ্রীতিকর ঘটনা তাৎক্ষণিকভাবে নৌবাহিনী মোকাবিলা করে থাকে। অবৈধ অনুপ্রবেশ বা যেকোনো ধরনের হুমকি প্রতিরোধে নৌবাহিনীর সদস্যরা ২৪ ঘণ্টা রাডারে নজরদারি বজায় রাখেন বলে জানান কর্মকর্তারা।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সেন্ট মার্টিন ফরওয়ার্ড বেইজের ‘ওআইসি’ লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মহিউদ্দিন বলেন, ‘সেন্ট মার্টিন দ্বীপ নিয়ে অনেক গুজব বা মিথ্যাচার রয়েছে। বলা হয়, সেন্ট মার্টিন দ্বীপ নাকি অন্য কোনো দেশ নিয়ে যাচ্ছে। এ প্রোপাগান্ডা চালাতে কিছু ছবি কিংবা ভিডিও এমনভাবে এডিট করে প্রকাশ করা হয়, যেন অন্য দেশের বাহিনী চলে এসেছে। আসলে এগুলো ভিত্তিহীন। অনেক সময় আন্তর্জাতিক সামরিক রীতি অনুযায়ী অন্য দেশের বাহিনীর সঙ্গে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর বিভিন্ন সময় মহড়া হয়। ওইসব মহড়ার ভিডিও ও ছবি এডিট করে মূলত গুজব ছড়ানো হয়।’
লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মহিউদ্দিন বলেন, ‘এই দ্বীপের সুরক্ষা-নিরাপত্তার জন্য বাংলাদেশ নৌবাহিনী ২৪ ঘণ্টা প্রস্তুত থাকে। এখানে প্রায় সময় নৌবাহিনীর দুই থেকে তিনটি জাহাজ মোতায়েন থাকে।’
যেমন চলছে সেন্ট মার্টিনের জনজীবন
গত মঙ্গল ও বুধবার সেন্ট মার্টিনে অবস্থানকালে দেখা যায়, ভোরের আলো ফোটার আগেই সেন্ট মার্টিনের জেটিঘাট এলাকায় ব্যস্ততা শুরু হয়ে যায়। দ্বীপজুড়ে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত বিরামহীন কর্মব্যস্ততা চোখে পড়ে। বিশাল বিশাল মাছ ধরার বোট নিয়ে জেলেরা দল বেঁধে গভীর সমুদ্রে পাড়ি জমাচ্ছেন, কারও হাতে জাল, কারও কাঁধে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সব মিলিয়ে এক কর্মমুখর দৃশ্য। জনজীবন একেবারেই স্বাভাবিক ও প্রাণচঞ্চল।
অন্যদিকে পর্যটন মৌসুম শুরু হওয়ায় দ্বীপটি উৎসবের রঙে সেজেছিল। প্রতিদিন গড়ে প্রায় দুই হাজার পর্যটক সেন্ট মার্টিনে আসছেন। সকাল হলেই কক্সবাজার থেকে জাহাজে দল বেঁধে পর্যটকদের নামতে দেখা যায় সেন্ট মার্টিনের জেটি ঘাটে। হোটেল, রেস্টুরেন্ট, নৌকা ভ্রমণ ও স্থানীয় পণ্যের দোকানিরা অতিথিদের আতিথেয়তায় ছিলেন ব্যস্ত।
সরেজমিনে আরও দেখা গেছে, সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী পর্যটন কার্যক্রম স্বাভাবিক ও নিরাপদ রাখতে সার্বক্ষণিক তৎপর ছিলেন নৌবাহিনীর সদস্যরা। পাশাপাশি কোস্টগার্ডের সদস্যদের জেটি ঘাট এলাকায় মোতায়েন থাকতে দেখা যায়। দ্বীপজুড়ে এবং সাগর উপকূলে নৌবাহিনীর সদস্যদের দায়িত্বশীল উপস্থিতি চোখে পড়ে।
বঙ্গোপসাগরে সর্বদা সজাগ নৌবাহিনী
শুধু সেন্ট মার্টিন দ্বীপ নয়, উপকূলীয় এলাকা ও গভীর সমুদ্রে বাংলাদেশের জলসীমা পাহারা দিতে সমুদ্রে অবস্থান করতে দেখা যায় বাংলাদেশ নৌবাহিনীর একাধিক অত্যাধুনিক জাহাজকে। গত বুধবার গভীর সমুদ্রে টহলে যায় অত্যাধুনিক ‘জাহাজ খালিদ বিন ওয়ালিদ’। এ জাহাজে গভীর সমুদ্র এলাকা পরিদর্শন করেন এই প্রতিবেদক। এ সময় দেখা গেছে, নৌবাহিনীর আরও একাধিক জাহাজের টহল। প্রযুক্তি বা রাডারের মাধ্যমে পুরো বঙ্গোপসাগরের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছিল ওই জাহাজ থেকে। বানৌজা খালিদ বিন ওয়ালিদে প্রস্তুত রাখা হয়েছিল নেভাল অ্যাভিয়েশনের একটি আধুনিক হেলিকপ্টার, যা এই জাহাজ থেকেই সরাসরি বিভিন্ন অভিযান চালিয়ে থাকে।
এ প্রসঙ্গে বানৌজা খালিদ বিন ওয়ালিদের অধিনায়ক ক্যাপ্টেন আরিফ বলেন, ‘সেন্ট মার্টিনসহ সমুদ্র উপকূলের অধিকাংশ মানুষ মৎস্য সম্পদের ওপর নির্ভরশীল। তাদের জন্য নিরাপত্তা জোরদার করা এবং তারা আমাদের জলসীমার মধ্যে থেকে মাছ শিকার করছে কি না, অথবা সীমানা অতিক্রম করছে কি না– সে বিষয়ে নৌবাহিনী সার্বক্ষণিক কাজ করে থাকে। সমুদ্রে সার্বক্ষণিক আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং রাডারে নজরদারি নিশ্চিত করা হয়, কেউ যেন অন্য দেশের জলসীমানায় প্রবেশ না করে, যা দেশের ভাবমূর্তির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে অন্য দেশের কেউ যাতে অনুপ্রবেশ করতে না পারে সেটাও নজরদারি করা হয়। বিভিন্ন মাধ্যমে প্রায়ই শোনা যায়, বিভিন্ন গোষ্ঠী (আরাকান আর্মি) আমাদের জেলেদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে। অথচ, পরে তদন্তে দেখা যায়, মূলত নিজেদের জলসীমা অতিক্রম করে অন্য দেশে প্রবেশ করলেই এ ধরনের ঘটনা ঘটে। বাংলাদেশের জলসীমার ভেতর থেকে কাউকে ধরে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।’
ওই জাহাজের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, ‘নৌবাহিনীর জাহাজ, গার্ড বোট এবং হাইস্পিড বোটের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক জলসীমা এলাকায় নিয়মিত টহল দেওয়া হয়। রাডারের মাধ্যমে সমুদ্রপৃষ্ঠে থাকা ছোট বোটও ডিটেক্ট করার সক্ষমতা রয়েছে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর, ফলে তাদের গতিবিধিও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হয়। আজ পর্যন্ত কোনো বাংলাদেশি নাগরিককে দেশের জলসীমা থেকে ধরে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেনি। তবে জেলেদের ভুলের কারণেই অনেক সময় তারা সীমানা অতিক্রম করে ফেলেন। নৌবাহিনী এ বিষয়ে জেলেদের সচেতন করার চেষ্টা করছে।’
বানৌজা খালিদ বিন ওয়ালিদে নিয়োজিত নেভাল অ্যাভিয়েশনের পাইলট লেফটেন্যান্ট কমান্ডার শফিক বলেন, ‘বাংলাদেশ নৌবাহিনীর জাহাজগুলো সাগরে প্যাট্রোলিং করে আমাদের সমুদ্র রক্ষা, বিভিন্ন অপারেশনাল মিশন বা শান্তিকালীন যে ধরনের কর্মকাণ্ড চালিয়ে থাকে, সেই কাজগুলোকে আরও বৃদ্ধি করার লক্ষ্যে আমাদের নেভাল অ্যাভিয়েশনের চারটি মেরিটাইম প্যাট্রোল এয়ারক্রাফট, চারটি হেলিকপ্টার এবং নতুন সংযুক্ত দুটি ইউএভি (আনমেন্ট এরিয়াল ভেহিকেল) সংযোজিত হয়েছে। এর মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, জাহাজগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে আমাদের সমুদ্রসীমাকে প্যাট্রোলিং (টহল) করা, সমুদ্রকে নজরদারি করা। আমাদের অত্যাধুনিক হেলিকপ্টারগুলোতে প্রয়োজনীয় প্রায় সব ধরনের ব্যবস্থা রয়েছে।’
সেন্ট মার্টিনে অপতৎপরতা ও পাচার রোধে তৎপর নৌবাহিনী
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, নৌবাহিনীর সদস্যরা অবৈধ পরিবহন রোধ, নিষিদ্ধ জালের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি এবং সন্দেহজনক গতিবিধি পর্যবেক্ষণের জন্য দিনরাত টহল পরিচালনা করে থাকেন। জানুয়ারির শুরুতে, নৌবাহিনীর একটি জাহাজ সেন্ট মার্টিনের প্রায় ৩০ নটিক্যাল মাইল দক্ষিণ-পশ্চিমে অভিযান চালিয়ে ২৭৩ জনকে বহনকারী একটি কাঠের ট্রলার আটক করে। ওই যাত্রীরা অবৈধভাবে বাংলাদেশ ত্যাগ করে মালয়েশিয়ায় পাচার হচ্ছিলেন। যাত্রীদের মধ্যে নারী ও শিশুও ছিল। পাশাপাশি নৌকাটিতে জীবন রক্ষাকারী মৌলিক সরঞ্জাম, খাবার বা পানীয় জলের যথেষ্ট অভাব ছিল। সন্দেহভাজন পাচারকারীসহ ২৭৩ জনকে আটক করে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য টেকনাফ পুলিশ এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এভাবেই নিয়মিতভাবে সেন্ট মার্টিনসহ সাগর উপকূলে এ জাতীয় বিষয়েও কাজ করে যাচ্ছে নৌবাহিনী।
প্রসঙ্গত, স্বচ্ছ নীল জলরাশিতে ঘেরা প্রবাল দ্বীপ সেন্ট মার্টিন বঙ্গোপসাগরের উত্তর-পূর্ব অংশে অবস্থিত। দ্বীপটি প্রায় ৮ বর্গকিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত। সেন্ট মার্টিনে জনসংখ্যা আনুমানিক ১১ হাজার। এই দ্বীপ ও সমুদ্রসীমার নিরাপত্তার দায়িত্বে কাজ করছে বাংলাদেশ নৌবাহিনী ছাড়াও বাংলাদেশ কোস্টগার্ড, বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড ও পুলিশ।
প্যা. ভ.ম
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত 2019 - 2026 PassengerVoice | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Developed By Muktodhara Technology Limited.
পাবলিক মতামত