শিরোনাম
Passenger Voice | ১১:৫৩ এএম, ২০২৬-০১-১৯
সারা দেশের ১২টি ডিপো থেকে ৭ কোটি ১৮ লাখ ৩৮ হাজার ৪৯ টাকার রাজস্ব আহরণ করতে পারেনি বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি)। পাশাপাশি দীর্ঘ মেয়াদে বিআরটিসির বাস ইজারা নিয়ে দেশের ছয়টি ডিপোতে ৩ কোটি ১৪ লাখ ৬৫ হাজার ৯৯ টাকা বকেয়া রেখেছেন বিভিন্ন মালিক ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান।
সব মিলিয়ে গত বছর ১০ কোটি ৩৩ লাখ ৩ হাজার ১৪৮ টাকার রাজস্ব আদায় করতে পারেনি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বিআরটিসি।
গত কয়েক বছরে বিআরটিসি কিছুটা লাভের মুখ দেখলেও বিভিন্ন ডিপো ব্যবস্থাপক, চালক, চালকের সহকারীরা রাজস্ব আত্মসাৎ করেছেন বলে অভ্যন্তরীণ অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
রাজস্ব অজমা থাকছে
বিআরটিসির একাধিক নথির তথ্য বলছে, গত বছর বগুড়া বাস ডিপোতে ১ কোটি ৫৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা, চট্টগ্রাম বাস ডিপোতে ১২ লাখ ৩৮ হাজার টাকা, কুমিল্লা বাস ডিপোতে ৭০ হাজার, গাজীপুর বাস ডিপোতে ৯ লাখ ৩৫ হাজার, কল্যাণপুর বাস ডিপোতে ২ লাখ ৮৭ হাজার, খুলনা বাস ডিপোতে ১ লাখ ৬৮ হাজার টাকা রাজস্ব অজমা রেখেছেন চালক ও চালকের সহযোগীরা। এ ছাড়া ময়মনসিংহ বাস ডিপোতে ১ কোটি ৮০ লাখ ৫৪ হাজার, মিরপুর বাস ডিপোতে ১ কোটি ৩২ লাখ ৮২ হাজার টাকা, মতিঝিল বাস ডিপোতে ১ কোটি ১২ লাখ ৮৫ হাজার টাকা, নারায়ণগঞ্জ বাস ডিপোতে ৯৬ হাজার টাকা, নরসিংদী বাস ডিপোতে ১৮ লাখ ৭৪ হাজার, রংপুর বাস ডিপোতে ৮৫ লাখ ৯৫ হাজার টাকা রাজস্ব অজমা থাকার তথ্য মিলেছে।
আরেক নথি থেকে জানা গেছে, দীর্ঘমেয়াদি বাস ইজারা দিয়ে বগুড়া বাস ডিপো ৭৭ লাখ ৭৫ হাজার টাকা, ঢাকার জোয়ারসাহারা বাস ডিপো ৫৯ লাখ ৫১ হাজার টাকা, খুলনা বাস ডিপো ৩ লাখ ২২ হাজার টাকা গত বছর আয় করতে পারেনি। গত বছর রাজধানীর মতিঝিল বাস ডিপো ৬১ লাখ ৮১ হাজার টাকা, রংপুর বাস ডিপো ২৭ লাখ টাকা ও কল্যাণপুর বাস ডিপো ৮৫ লাখ টাকা আয় করতে পারেনি।
বিআরটিসির বিভিন্ন ডিপোর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাজস্ব অজমার প্রধান কারণ হলো বাসের টিকিট ও ভাড়া আদায়ে অনিয়ম। রাজধানীতে চলাচল করা বিআরটিসির সব বাসে টিকিট দেওয়া হয় না। মোহাম্মদপুর বাস ডিপো থেকে কুড়িল বিশ্বরোডে চলাচল করা দ্বিতল বাসের যাত্রীদের টিকিট দেওয়া হয়। সে টিকিটও ম্যানুয়াল সিস্টেমে দেওয়া হয়। বাসচালক, চালকের সহকারীরা হিসাবের খাতায় টিকিট কম বিক্রি হয়েছে বলে তথ্য দেন। প্রতি ট্রিপে কতসংখ্যক যাত্রী পরিবহন করা হচ্ছে, তার সঠিক তথ্য পান না ডিপো ব্যবস্থাপক। বিআরটিসির কিছু এসি বাসে ই-টিকিটের ব্যবস্থা চালু করা হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে ম্যানুয়াল সিস্টেমে টিকিট বিক্রি করা হয়।
যেসব বাস ডিপোতে রাজস্ব অজমা রয়েছে, সেসব বাস ডিপোর ব্যবস্থাপকদের মন্তব্য জানতে বার্তা পাঠানো হয় হোয়াটসঅ্যাপ এবং অফিশিয়াল ই-মেইল অ্যাড্রেসে। তাদের একাধিকবার ফোনও করা হয়েছে। তবে রাজস্ব অজমা নিয়ে তারা কেউ মুখ খোলেননি।
হিসাবে গরমিল দেখিয়ে অর্থ আত্মসাৎ চলছে
রাজস্ব অজমার তথ্য অনুসন্ধান করতে গিয়ে খবরের কাগজের হাতে ইউনিটপ্রধান এবং ডিপো ব্যবস্থাপকের অনিয়মের একাধিক নথি এসেছে। বিআরটিসির বিভিন্ন ইউনিট এবং ডিপোতে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে ব্যাপক আর্থিক অনিয়ম ও ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, ইউনিটপ্রধানরা দায়িত্ব নেওয়ার সময় যে আর্থিক হিসাব দেখান এবং দায়িত্ব ছাড়ার সময় যে হিসাব দেন, এই দুইয়ের মধ্যে মিল থাকে না। এতে দায়িত্বকালীন অর্থ ও সম্পদের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।
বাজেট ব্যবস্থাপনাতেও গুরুতর অনিয়ম লক্ষ করা গেছে। খাতভিত্তিক অনুমোদিত বাজেটের বাইরে অর্থ ব্যয় করা হয়েছে, আবার এক খাতের অর্থ অন্য খাতে ব্যয় করার প্রবণতাও দেখা গেছে।
জ্বালানি খাতে অনিয়ম সবচেয়ে বেশি। বাসের প্রকৃত চলাচলের চেয়ে বেশি কিলোমিটার চলা দেখিয়ে অতিরিক্ত জ্বালানির বিল তোলা হয়েছে। একইভাবে কয়েকটি ডিপোর ব্যবস্থাপক দৈনিক মজুরিভিত্তিক কর্মচারীদের কর্মদিবস বেশি দেখিয়ে অতিরিক্ত বিল আদায় করেছেন।
এ ছাড়া বিভিন্ন ইউনিটপ্রধান এবং ডিপো ব্যবস্থাপকরা ফ্রেমওয়ার্ক চুক্তি সঠিকভাবে অনুসরণ করেননি। কারিগরি বিভাগের তদন্তে দেখা গেছে, চুক্তির শর্ত ভেঙে ইচ্ছামতো দামে যন্ত্রাংশ কেনা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ফ্রেমওয়ার্ক চুক্তির আওতায় যন্ত্রাংশ কিনে ভ্যাট এবং আয়কর কর্তন না করে বিল পরিশোধ করা হয়েছে, ফলে বিআরটিসির আর্থিক দায় আরও বেড়েছে।
আয়-ব্যয়ের হিসাবেও বড় ধরনের গরমিল পাওয়া গেছে। প্রদর্শিত ব্যয়ের সঙ্গে প্রকৃত আয় ও ব্যাংকে জমা অর্থের মিল নেই। এমনকি একাধিক ক্ষেত্রে অব্যয়িত ছাড়পত্র থাকা সত্ত্বেও একই খাতে আবার ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে।
চালকদের মধ্যেও অনিয়মের প্রবণতা দেখা গেছে। বাসের অর্জিত কিলোমিটারের চেয়ে বেশি কিলোমিটার দেখিয়ে অতিরিক্ত ছাড়পত্র নেওয়া হয়েছে।
ডিপোগুলোর নিজস্ব জ্বালানি পাম্প থাকা সত্ত্বেও অনেক ডিপো বাইরে থেকে জ্বালানি কিনে ব্যয় অযথা বাড়িয়েছে।
আয়-ব্যয়ের হিসাবে ডিপোগুলোকে লাভজনক দেখিয়েছেন বিভিন্ন ইউনিট ও ডিপোপ্রধানরা। তা সত্ত্বেও কার্যালয় থেকে আর্থিক সহায়তা নেওয়ার প্রবণতা আগের বছরের তুলনায় আরও বেড়েছে।
গত বছরের আগস্টে বরিশাল, কুমিল্লা, পাবনা, সোনাপুর, সিলেট ও টুঙ্গীপাড়া বাস ডিপোতে ট্রিপের সংখ্যা কমিয়ে দেন ব্যবস্থাপকরা। প্রধান কার্যালয়ে অপারেশনস বিভাগকে এ বিষয়ে অবহিত করা হয়নি। প্রতি ট্রিপের আয়-ব্যয় ও নিট লাভের হিসাব পরবর্তী দিন অপারেশনস বিভাগে পাঠানোর নির্দেশনাও সব বাস ডিপোতে যথাযথভাবে মানা হচ্ছে না।
যা বলছে কর্তৃপক্ষ
বিআরটিসিতে ব্যাপক অনিয়মের কথা স্বীকার করে নিয়েছেন বিআরটিসির চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ মোল্লা। তিনি বলেন, ‘এমনিতেই আমরা ঋণের বোঝা বয়ে বেড়াচ্ছি। তারপর বিভিন্ন ডিপোর ম্যানেজার বা চালকরা নানা সময়ে রাজস্ব অজমা রেখেছেন। এতে বিআরটিসির বোঝা বাড়ছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ সব সময় আমাদের চাপে রাখে, যাতে বিআরটিসি একটি লাভজনক করপোরেশন হয়। সেদিক বিবেচনায় এবার আমরা একটু কড়া ব্যবস্থা নিচ্ছি।’
তিনি জানান, ডিপোভিত্তিক চালক, চালকের সহকারীদের কাছে রাজস্ব অজমা থাকলে রাজস্ব সমন্বয় না হওয়া পর্যন্ত প্রতি মাসের বেতন থেকে কিস্তিতে টাকা কেটে নেওয়া হবে।
বিআরটিসির বাসে ভেহিকল ট্র্যাকিং সিস্টেম (ভিটিএস) প্রযুক্তি সংযুক্ত করা হবে। এতে কোনো বাস কত কিলোমিটার পথ চলেছে; সে হিসাব কষে জ্বালানি, যন্ত্রাংশ খরচ দেওয়া হবে। দীর্ঘমেয়াদে বাস ইজারা নিয়ে যারা রাজস্ব বকেয়া রেখেছেন, সেসব বাস মালিক বা প্রতিষ্ঠানের জামানত থেকে অর্থ কেটে নেওয়া হবে।
প্যা.ভ.ম
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত 2019 - 2026 PassengerVoice | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Developed By Muktodhara Technology Limited.
পাবলিক মতামত