শিরোনাম
Passenger Voice | ১১:২৫ এএম, ২০২৬-০১-১৯
বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে একীভূত হওয়া পাঁচ ব্যাংকের ২০২৪ ও ২০২৫ সালের মুনাফা কাটার ঘোষণায় ক্ষুব্ধ সারা দেশের আমানতকারীরা। এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে তারা রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে পাঁচ ব্যাংকের শাখায় গিয়ে ক্ষোভ-বিক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। এতে উত্তাল হয়ে উঠেছে সারা দেশ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও আমানতকারীরা বিক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। এ সময় অনেক শাখার কার্যক্রম বন্ধ রাখতে বাধ্য হন সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্মকর্তারা।
রাজধানীর গুলশানে নাভানা টাওয়ারের সামনে বিক্ষোভ করেন আমানতকারীরা। বিক্ষোভের পর তারা পাঁচ ব্যাংকের প্রশাসক বরাবর একটি চিঠি দেন। সেখানে তারা ‘হেয়ারকাট’ পদ্ধতি বাতিলসহ ছয় দফা দাবি জানিয়েছেন।
তারা আগামীকাল মঙ্গলবারের মধ্যে হেয়ারকাট পদ্ধতি বাতিল এবং আমানতকারীদের সব ধরনের হিসাবের আমানতের টাকা নগদায়ন বা উত্তোলনের ব্যবস্থা না করলে পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে কাফনের কাপড় পরে আত্মাহুতি কর্মসূচি অথবা মতিঝিল শাটডাউন কর্মসূচি পালন করতে বাধ্য হবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন।
এদিকে দেশের বিভিন্ন জায়গায় আমানতকারীদের বিক্ষোভে কার্যক্রম বন্ধ রাখতে বাধ্য হন অনেক শাখার কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এ সময় তারা নিরাপত্তা আতঙ্কে ভোগেন। এ বিষয়ে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের কুমিল্লা জোনাল অফিসের ব্যবস্থাপক প্রশাসক বরাবর চিঠি দিয়ে বলেছেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের হেয়ারকাটের সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়ায় বিক্ষুব্ধ আমানতকারীদের মারমুখী আচরণে আমাদের নিরাপত্তা হুমকির সম্মুখীন। গ্রাহকরা আমাদের জানিয়েছেন, মুনাফা কর্তনের বিষয়টি সমাধান না হলে আগামীকাল থেকে শাখা খুলতে দেওয়া হবে না।’
এ পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল সন্ধ্যায় সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যানসহ পাঁচ ব্যাংকের প্রশাসকরা বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে গভর্নর আহসান এইচ মনসুর জানিয়েছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার সুযোগ নেই।
বৈঠক শেষে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান আইয়ুব মিয়া বলেন, ‘বিভিন্ন জায়গায় কিছু অপ্রীতিকর ঘটনার খবর এসেছে। গভর্নরকে সবকিছু অবহিত করেছি। এ পরিপ্রেক্ষিতে আজ সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হওয়ার কথা থাকলেও সেটা পিছিয়ে ২৫ জানুয়ারি করা হয়েছে।’
হেয়ারকাট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আন্তর্জাতিক রীতি মেনেই হেয়ারকাটের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তাই এটা পরিবর্তনের সুযোগ নেই। তবে আমানতকারীদের ডিপোজিট স্কিমের বিপরীতে ২০ শতাংশ ঋণের সীমা দ্বিগুণ করা হয়েছে। তারা চাইলে ৩০-৪০ শতাংশ ঋণ নিতে পারবে। ইসলামী ব্যাংকিং নিয়ম অনুযায়ী, এসব ব্যাংকে স্থায়ী মুনাফার হার থাকে না। মুনাফা বা ক্ষতির নীতি অনুসরণ করা হয়। পাঁচ ব্যাংকের অডিটে দেখা গেছে মুনাফা হয়নি, শরিয়াহ বোর্ড বলে দিয়েছে মুনাফা না হলে কীভাবে মুনাফা দেবে?’
বৈঠক শেষে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, হেয়ারকাট বিষয়ে সিদ্ধান্ত পূর্বের জায়গায়ই আছে।
গ্রাহকদের ক্ষোভ
গতকাল গুলশানের নাভানা টাওয়ারের সামনে মানববন্ধন করেন ভূক্তভোগী আমানতকারীরা। এ সময় তারা বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের লাইসেন্সপ্রাপ্তি ব্যাংকেই আমরা আমাদের সারা জীবনের সঞ্চয় আমানত হিসেবে রেখেছি। এখন কেন আমাদের প্রয়োজনে আমরা টাকা তুলতে পারব না। তাহলে ব্যাংকগুলো এতদিন ধরে যে চরম সংকটে ছিল, নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক কেন কোনো ধরনের ব্যবস্থা নেয়নি? আর ব্যাংকগুলোর এই সংকটের দায় কেন আমরা আমানতকারীরা নেব?’
মানববন্ধন শেষে তারা পাঁচ ব্যাংকের প্রশাসকের কাছে একটি চিঠিও দিয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ২০২৪ ও ২০২৫ সালের আমানতকারীদের আমানতের ওপর কোনো মুনাফা দেওয়া হবে না। কিন্তু কেন? আমরা জানি ব্যাংকে আমানত রাখা মানে একটি লিখিত ও অলিখিত চুক্তি। নির্দিষ্ট সময় শেষে নির্দিষ্ট হারে মুনাফা পাওয়ার নিশ্চয়তা থাকে। আমানতকারীরা এটিকে পশ্চাৎমুখী সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছেন।
আমানতকারীরা মনে করেন, ব্যাংকিং ব্যবস্থা আস্থার ওপর টিকে থাকে। দুই বছরের মুনাফা বাতিল ও হেয়ারকাট সেই আস্থায় গভীর ফাটল ধরাচ্ছে। তারা মনে করেন, ব্যাংক লুট দীর্ঘস্থায়ী একটি নিয়ন্ত্রক সংস্থার ব্যর্থতার ফল। সেই ব্যর্থতার দায় তারা বহন করবেন কেন?
এ সময় তারা ছয় দফা দাবি জানিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে- মুনাফা কাটার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা না করা হলে আমানতকারীরা তা কোনোভাবেই মেনে নেবেন না। আগামীকাল মঙ্গলবারের মধ্যে সঞ্চয়ী হিসাব, চলতি হিসাব, এফডিআর, ডিপিএস, (স্বল্পমেয়াদি আমানত) এবং (মেয়াদি আমানাত) হিসাবের টাকা মুনাফাসহ নগদায়ন প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে।
এফডিআর, ডিপিএস (স্বল্পমেয়াদি আমানত) এবং (মেয়াদি আমানত) সব হিসাবের টাকা মুনাফাসহ সঞ্চয়ী অথবা চলতি হিসাবে দিতে হবে। সঙ্গে আমানত সুরক্ষার ২ লাখ টাকা নগদায়ন বা উত্তোলন করার সুযোগ দিতে হবে। পুরোনো ও নতুন আমানতকারী হিসাবের জমা ও উত্তোলন এবং মুনাফার ক্ষেত্রে সমান অধিকার দিতে হবে।
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের সব হিসাবের আমানতকারীদের মুনাফাসহ সম্পূর্ণ আমানত ফেরতের নিশ্চয়তা দিতে হবে। ২ লাখের পর অবশিষ্ট আমানত দুই মাস পরপর ২ লাখ টাকা করে দিতে হবে এবং ২৪ মাস পর সম্পূর্ণ আমানতের টাকা এককালীন নগদায়ন বা উত্তোলনের সুযোগ দিতে হবে। এনপিএসবি, আরটিজিএস, ইএফটি, এটিএমসহ সব ধরনের অনলাইন সেবা চালু করতে হবে। সেই সঙ্গে লেনদেন স্বাভাবিক করতে হবে।
যদি মঙ্গলবারের মধ্যে হেয়ারকাট পদ্ধতি বাতিলসহ আমানতকারীদের এসব দাবি না মানা হয়, তাহলে ভুক্তভোগী আমানতকারীরা পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে কাফনের কাপড়সহ আত্মহুতি কর্মসূচি অথবা মতিঝিল শাটডাউন কর্মসূচি পালন করতে বাধ্য হবেন।
ব্যাংক কর্মকর্তাদের নিরাপত্তা চেয়ে চিঠি
সারা দেশের বিভিন্ন শাখায় আমানতকারীরা গতকাল যেভাবে বিক্ষোভ করেছেন, এতে অনেক শাখার আমানতকারীদের নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি হয়েছে। অনেক ব্যাংককর্মীদের সঙ্গে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে বলেও জানা গেছে। এ জন্য পাঁচ ব্যাংকের বিভিন্ন শাখা থেকে প্রশাসক বরাবর নিরাপত্তা চেয়ে চিঠি দিয়েছেন ব্যাংককর্মীরা।
মুনাফা কত কাটা পড়বে
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দুই বছরে মুনাফা না দেওয়ার সিদ্ধান্তে ১০ হাজার কোটি টাকার দায় কমে যাবে। গত বছরের সেপ্টেম্বরে পাঁচ ব্যাংকের আমানত ছিল ১ লাখ ৪১ হাজার কোটি টাকা। ডিসেম্বর শেষে পাঁচ ব্যাংকের আমানত কমে হয়েছে ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা। দুই বছরের মুনাফা কেটে রাখা হলে তা কমে হবে ১ লাখ ২১ হাজার কোটি টাকা। পাঁচ ব্যাংকে প্রায় ৭৫ লাখ আমানতকারী রয়েছেন বলে জানা গেছে। ব্যাংকগুলোতে ৭ থেকে ৯ শতাংশ মুনাফার আমানত রয়েছে।
শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধী, স্বামীর পেনশনের টাকা, প্রবাসী পরিবার, অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, যারা এই মুনাফার টাকার ওপর নির্ভরশীল- কেন তারা হঠাৎ দুই বছরের আয় থেকে বঞ্চিত হবেন। একজন অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি ২৫ লাখ টাকা মাসিক মুনাফার আমানত রেখে মাসে ২০ হাজার টাকা মুনাফা তুলে সংসার চালাতেন এই হেয়ারকাটের ফলে। তার প্রাপ্ত মুনাফা ৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা কর্তন হয়ে যাবে। মূলধন ২৫ লাখ থেকে ২০ লাখ ২০ হাজার টাকায় নেমে যাবে।
আমানতকারীরা বলেন, এটি শুধু আর্থিক ক্ষতি নয়, বরং জীবনযাত্রার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, এসব ব্যাংকে অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তির আমানত রয়েছে ৫০ হাজার কোটি টাকার। নিয়ম অনুযায়ী এখানে মুনাফা কাটা হবে ১৬ হাজার কোটি টাকা। ছোট ব্যবসায়ীর আমানত রয়েছে ৭৫ হাজার কোটি টাকার, মুনাফা কর্তন হবে ২৪ হাজার কোটি টাকা। প্রবাসী পরিবারের ৬০ হাজার কোটি টাকার আমানত রয়েছে। নতুন নিয়মে মুনাফা কাটা হবে ২০ হাজার কোটি টাকা। সাধারণ আমানতকারীর ৬৫ হাজার কোটি টাকার বিপরীতে মুনাফা কাটা হবে ২২ হাজার কোটি টাকা।
প্যা.ভ.ম
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত 2019 - 2026 PassengerVoice | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Developed By Muktodhara Technology Limited.
পাবলিক মতামত