কম আমদানির কারণে এলপিজি সংকট চরমে

Passenger Voice    |    ০২:২৯ পিএম, ২০২৬-০১-১৮


কম আমদানির কারণে এলপিজি সংকট চরমে

তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) চাহিদা বাড়লেও ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর কিছু কোম্পানির আমদানি বন্ধ হয়ে যায়। ওই পরিস্থিতিতে আমদানিকারক কোম্পানি ডেল্টা এলপিজি লিমিটেডসহ আরও অনেক কোম্পানি বেশি করে আমদানির অনুমতি চাইলেও অন্তর্বর্তী সরকার তাতে সম্মতি দেয়নি। এর ধাক্কা লেগেছে দেড় বছর পর। 

সরবরাহ কমে যাওয়ায় ২০ দিন ধরে দেশে এলপি গ্যাসের সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। ডিলাররা প্রতি সিলিন্ডারে ১৫০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত বেশি দামে বিক্রি করছেন। সরকার নির্ধারিত ১ হাজার ৩০৬ টাকার ১২ কেজির সিলিন্ডার দ্বিগুণ দামেও পাচ্ছেন না ভোক্তারা। কোনো কোনো ভোক্তা চার হাজার টাকায়ও কিনেছেন। গ্যাস আমদানিকারকরা বলছেন, সরকার আগে বেশি করে আমদানির অনুমতি দিলে এমন সংকট হতো না।

শনিবার (১৭ জানুয়ারি) বেলা ঠিক আড়াইটা। রাজধানীর মোহাম্মদপুরের চাঁদ উদ্যান হাউজিংয়ে (ওয়ালটন সার্ভিস সেন্টারের দক্ষিণ পাশে) পেট্রোম্যাক্সের ডিলার মেসার্স সোহেল এন্টারপ্রাইজে গিয়ে দেখা যায় দোকান বন্ধ। এ সময় ঢাকা উদ্যান থেকে আসা শাফিনা বেগম নামে এক গৃহিণী জানতে চান দোকানদার কোথায়। তিনি গ্যাস নেবেন। এর আগেও এসে ঘুরে গেছেন। 

তিনি বলেন, ‘এক সপ্তাহ ধরে সিলিন্ডারের গ্যাস শেষ হয়ে গেছে। আজকেও পেলাম না। কী করব। রান্নাবান্নার যে কী খারাপ অবস্থা।’ দোকান বন্ধ থাকলেও সামনে ছিলেন এর কর্মচারী আসাদুজ্জামান। তিনি বলেন, ‘গ্যাস নেই। তাই ম্যানেজারও দোকানে নেই। আগে দিনে তিন থেকে চার গাড়ি গ্যাসের সিলিন্ডার এলেও কিছু দিন ধরে একটি গাড়িও আসছে না। প্রতি গাড়িতে ১২ কেজি ওজনের ৬১৫টি সিলিন্ডার থাকে। আগে ১ হাজার ৩০৬ টাকায় বিক্রি করা হতো। কয়েক দিন ধরে ১ হাজার ৪৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বেশি দামে বিক্রি করার কারণে ভোক্তা অধিদপ্তর একবার জরিমানা করেছে।’ 

এই দৃশ্য শুধু মেসার্স সোহেল এন্টারপ্রাইজের নয়। মোহাম্মদপুরের ৪০ ফুট সড়কে মেসার্স এম এন ট্রেডার্সেও দেখা গেছে একই চিত্র। সেখানে দেখা যায় অসংখ্য মানুষের জটলা। কিন্তু গ্যাস পাচ্ছেন না। এই দোকানের ম্যানেজার মো. আকাশ বলেন, ‘আমরা যে তিন কোম্পানির ডিলার, তাদের গ্যাস সিলিন্ডার পাই না। টোটাল গ্যাস সিলিন্ডার কিছু পাচ্ছি। ১২ কেজির সিলিন্ডার ১ হাজার ৮০০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। তাও সবার চাহিদা মেটানো সম্ভব হচ্ছে না। কারণ সরবরাহ একেবারে কম। কখন ঠিক হবে কোম্পানি থেকেও জানাতে পারছে না।’ 

কারওয়ান বাজারসহ সারা দেশে বিভিন্ন গ্যাস কোম্পানির ডিলারের (পরিবেশক) দোকানে দেখা গেছে এই চিত্র। কারওয়ান বাজারের জনতা ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী আব্দুল হকের দোকানে গেলে দেখা যায়, বিভিন্ন এলাকা থেকে খুচরা বিক্রেতা ও ভোক্তারা সিলিন্ডার গ্যাসের জন্য অপেক্ষা করছেন। চাহিদা পূরণ করতে না পারার ব্যাপারে পেট্রোম্যাক্সসহ তিন কোম্পানির পরিবেশক আব্দুল হক খবরের কাগজকে বলেন, ‘আগের তুলনায় গ্যাসের সংকট আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। আগে কিছু পেলেও বর্তমানে তেমন পাচ্ছি না।’ অধিকাংশ ক্রেতা ফিরে যাচ্ছেন। আগে ১২ কেজির সিলিন্ডার ১ হাজার ৩৫০ টাকায় বিক্রি করা হতো। কিন্তু গতকাল থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকায় বিক্রি করছি। ভোক্তা অধিদপ্তর জরিমানা করলেও করার কিছু নেই। 

ডিলাররা খুচরা বিক্রেতাদের মাধ্যমে বিভিন্ন কোম্পানির এলপি গ্যাস বিক্রি করেন। পরিবেশক পর্যায়ে ১৫০ থেকে ৫০০ টাকা বেশি দামে বিক্রি করা হলেও খুচরা বিক্রেতারা দ্বিগুণের বেশি দামে এমনকি অধিকাংশ এলাকায় ৩ হাজার থেকে ৪ হাজার টাকায় বিক্রি করছেন। শুক্রাবাদের গৃহিণী নাজমা বেগম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘এখানে-সেখানে ঘুরে শেষে ৪ হাজার টাকায় ১২ কেজির সিলিন্ডার কিনতে হয়েছে। কোন দেশে বাস করছি। দেখার কেউ নেই।’ 

এলপিজির সংকট থেকে উত্তরণের ব্যাপারে এলপিজি অপারেটর অব বাংলাদেশের (লোয়াব) সভাপতি আমিরুল হক বলেন, ‘লোয়াবের পক্ষ থেকে এক বছর আগে আমদানি বাড়াতে অনুমোদন চেয়েছিল। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়। চিঠিতে বলা হয়েছিল, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে কিছু কোম্পানির এলপি গ্যাস আমদানি বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে সরবরাহ কমে গেছে। 

এক বছর পর চিঠির জবাবে মন্ত্রণালয় বলেছে, এটা নীতিমালা অনুমোদন করে না। এরপর আবার গত ২১ আগস্ট চিঠি দেওয়া হয়। নতুন প্ল্যান্টের অনুমোদন চাইলেও দেয়নি। এমনকি ডেল্টা এলপিজি লিমিটেড ৬০ হাজার টন থেকে ২ লাখ ৩০ হাজার টন এলপিজি আমদানির অনুমতি চাইলেও গত ১২ নভেম্বর জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সিনিয়র সচিব এনামুল হকের সই করা চিঠিতে জানিয়ে দেওয়া হয় আবেদন বিবেচনা করার সুযোগ নেই। এ কারণেই সরবরাহ কমে গেছে। এ ছাড়া ইরান থেকে সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে। এ জন্য এলপিজির সংকট চলছে। আমদানি বেড়েছে। তা দেশে আসতে সময় লাগবে। সেই পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।’ 

ভোক্তাদের কাছে বেশি দামে বিক্রির ব্যাপারে ডেল্টা এলপিজি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, ‘আমরা ডিলারের মাধ্যমে গ্যাস বিক্রি করি। তারা বেশি দামে বিক্রি করলে দেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, ভোক্তা অধিদপ্তর কী করছে। কেউ বেশি দামে বিক্রি করলে তাদের ধরা উচিত। তাহলে কেউ বেশি দামে বিক্রি করতে পারবে না।

লোয়াবের কিছু সদস্যকে কেন বেশি করে আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়নি, তা জানতে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলামের সঙ্গে বহুবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি। 

তবে সংকট কাটাতে এলপিজি আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। এ লক্ষ্যে গত ১০ জানুয়ারি সরকার থেকে সরকার (জিটুজি) ভিত্তিতে এলপিজি আমদানির অনুমতি চেয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাটি। বিপিসির চেয়ারম্যান মো. আমিন উল আহসান জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগে পাঠানো চিঠিতে উল্লেখ করেন, বর্তমানে বাজারে এলপিজি সিলিন্ডারের তীব্র সংকট ও অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি দেখা দিয়েছে। বেসরকারি অপারেটরদের অনেকেই নানা জটিলতার কারণে নিয়মিত আমদানি করতে পারছেন না, যার সুযোগ নিয়ে কোথাও কোথাও কৃত্রিম সংকট তৈরি হচ্ছে। 

এ বিষয়ে জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান জানান, সরকার এরই মধ্যে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে জিটুজি ভিত্তিতে এলপিজি আমদানির সম্ভাবনা যাচাই করছে। আপাতত সরকার শুধু আমদানির দায়িত্ব নেবে, আর সংরক্ষণ ও বোতলজাতকরণের কাজ বেসরকারি খাতের মাধ্যমেই সম্পন্ন হবে। 

উল্লেখ্য, দেশে বর্তমানে এলপিজির চাহিদা বছরে প্রায় ১৭ লাখ টন। ব্যবহৃত এলপিজির প্রায় ৮০ শতাংশ খরচ হয় রান্নায়, বাকি ২০ শতাংশ শিল্পকারখানা ও যানবাহনে। 

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনসহ (বিইআরসি) সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশে প্রতিবছর ১০ শতাংশের বেশি এলপিজির চাহিদা বাড়ে। ২০২৩ সালে এলপিজি আমদানি হয় ১২ লাখ ৭৫ হাজার টন। ২০২৪ সালে দেশে এলপিজি আসে ১৬ লাখ ১০ হাজার টন। আর গত বছরে আমদানি হয় ১৪ লাখ ৬৫ হাজার টন। সরবরাহ কমে যাওয়ায় বাজারের চাহিদা মেটানো যাচ্ছে না। এর ফলে ভোক্তারা দ্বিগুণ দামেও সিলিন্ডার গ্যাস পাচ্ছেন না। গ্যাস না পেয়ে অনেকেই বিদ্যুতের চুলা কিনে রান্না করছেন। কেউ কেউ মাটির চুলাও ব্যবহার করছেন।

প্যা.ভ.ম