জামায়াত জোটের ৫০ আসন বণ্টনে টানাপোড়েন

Passenger Voice    |    ১১:৪১ এএম, ২০২৬-০১-১৮


জামায়াত জোটের ৫০ আসন বণ্টনে টানাপোড়েন

প্রার্থিতা চূড়ান্ত করতে আর দুদিন বাকি; এখনও অন্তত অর্ধশত আসন বণ্টন চূড়ান্ত করতে পারেনি জামায়াতে ইসলামীর ১০ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য। চরমোনাইর পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন জোট ছাড়ায় দলটির জন্য রাখা আসনগুলো কোন দল ভাগে কয়টি পাবে, তা ঠিক করা যায়নি। এনসিপি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও এবি পার্টি বাড়তি আসন দাবি করায় নতুন করে টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়েছে। নির্বাচনী তপশিল অনুযায়ী আগামী মঙ্গলবার প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন। ওই দিনের মধ্যে জোটগুলোকে একক প্রার্থী চূড়ান্ত করতে হবে। এর মধ্যে কেউ প্রার্থিতা প্রত্যাহার না করলে ব্যালটে তার নাম থাকবে। 

জামায়াত জোটে গত ডিসেম্বরে যুক্ত হওয়া একটি দলের শীর্ষ নেতা সমকালকে বলেন, আসন বণ্টন নিয়ে ‘হচপচ’ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। জামায়াত নেতারা সমস্যার সমাধান করতে পারছেন না, আবার অন্য কোনো দলের কাছে দায়িত্বও ছাড়ছেন না। এ বিলম্বের কারণে নির্বাচনের মাঠে প্রভাব পড়বে। তবে জামায়াত নেতারা আগের মতোই সমকালকে বলেছেন, জোটে সমস্যা নেই। দুয়েক দিনের মধ্যে আসন বণ্টন চূড়ান্ত হয়ে যাবে। ২২ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু হলে আর ঘাটতি থাকবে না। ১০ দল একসঙ্গে মিলে প্রচার চালাবে জোট প্রার্থীর পক্ষে। 

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি হবে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন এবং গণভোট। বিএনপির জোটের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জামায়াত, এনসিপি, ইসলামী আন্দোলন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, এলডিপি, খেলাফত মজলিস, নেজামে ইসলাম পার্টি, বিডিপি, জাগপা এবং খেলাফত আন্দোলন মিলে ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য গঠন করেছিল। তবে আসন ভাগাভাগি নিয়ে জামায়াতের সঙ্গে মতবিরোধে ইসলামী আন্দোলন গত শুক্রবার জোট ছেড়ে এককভাবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ঘোষণা দেয়। এর আগের দিন জামায়াত, এনসিপিসহ ১০ দল তিনটি আসন উন্মুক্ত রাখাসহ ২৫০ আসনে সমঝোতা ঘোষণা করে। পাঁচটি উন্মুক্তসহ ইসলামী আন্দোলনের জন্য ৫০টি আসন রাখা হয়েছে। উন্মুক্ত আসনে জোটের একাধিক দলের প্রার্থী রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। 

বণ্টনের সময়ে জামায়াতসহ রংপুর বিভাগের ৩৩টি আসনের ২৬টি নিজের ভাগে রাখে। চারটি এনসিপিকে এবং তিনটি ইসলামী আন্দোলনকে ছেড়েছিল। ইসলামী আন্দোলন জোট ছাড়ার পর জামায়াত দলটিকে দেওয়া তিনটি আসনেও দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী রাখতে চায়।

রাজশাহী বিভাগের ৩৯টি আসনের মধ্যে এনসিপিকে নাটোর-৩ এবং সিরাজগঞ্জ-৬, ইসলামী আন্দোলনকে নওগাঁ-৩ এবং বাংলাদেশ খেলাফতকে সিরাজগঞ্জ-৩ আসন ছেড়েছিল জামায়াত। বাকি ৩৫টি আসন নিজের জন্য রেখেছিল। জামায়াত এখন  নওগাঁ-৩ আসনেও প্রার্থী রাখতে চায়।

খুলনা বিভাগের ৩৬টি আসনের মধ্যে কুষ্টিয়া-৪, যশোর-৩, মাগুরা-২ এবং খুলনা-৪ আসন ইসলামী আন্দোলনকে ছেড়েছিল জামায়াত। বাকি ৩২টি আসন নিজের জন্য রেখেছিল। খুলনা-৩ আসন দাঁড়িপাল্লা ও হাতপাখার জন্য উন্মুক্ত রাখার প্রস্তাব করেছিল। ইসলামী আন্দোলন চলে যাওয়ার পর এই বিভাগের চুয়াডাঙ্গা-১ আসনটি এনসিপি এবং এবি পার্টি উভয় দল চাচ্ছে। তবে জামায়াত ৩৬ আসনেই একা নির্বাচন করতে চাচ্ছে।

রংপুর, রাজশাহী ও খুলনা বিভাগকে নিজের শক্ত ঘাঁটি বলে মনে করে জামায়াত। এই তিন বিভাগের ১০৮ আসনের ১৫টি জোট শরিকদের ছেড়েছিল জামায়াত। বাকি ৯৩টিতে দলীয় প্রার্থী রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। ইসলামী আন্দোলনের জন্য ছাড়া ৮টি আসনেই এখন জামায়াত দলীয় প্রার্থী রাখতে চায়। ফলে এই তিন বিভাগের ১০১টি দাঁড়িপাল্লা থাকবে।

তবে এনসিপি, বাংলাদেশ খেলাফত, এবি পার্টি তা মানছে না বলে জোট সূত্র জানিয়েছে। দলগুলো এ তিন বিভাগে আরও কয়েকটি করে আসন চাইছে। বাংলাদেশ খেলাফত কুড়িগ্রাম-৩ আসন চায়। এ আসনে দ্বৈত নাগরিকত্বের কারণে জামায়াত প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। তিনি আপিল করেছেন। জামায়াত ইসলামী আন্দোলনকে কুড়িগ্রাম-১ আসন ছেড়েছিল। 

ইসলামী আন্দোলনের ছেড়ে দেওয়া গোপালগঞ্জ-৩ আসন চাইছে এনসিপি। ইসলামী আন্দোলনকে ছেড়ে দেওয়া সুনামগঞ্জ-১ আসন চায় বাংলাদেশ খেলাফত। 

৩০ আসনে ছাড় পাওয়া এনসিপি এবং ২০ আসন পাওয়া বাংলাদেশ খেলাফতও কিছু আসন নতুন করে চাইছে। জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়া চরমোনাই পীরের জন্য রাখা আসন বাকি ১০ দলের মধ্যে সমঝোতায় বণ্টন হবে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ খেলাফত আমির মাওলানা মামুনুল হক। তিনি বলেছেন, ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে আসন বণ্টনের আনুষ্ঠানিক আলোচনার আর সম্ভাবনা নেই। তবে রাজনৈতিক সমঝোতা হতে পারে। 

গতকাল শনিবার রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতে ইসলামীর কার্যালয়ে দলটির নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহেরের সঙ্গে বৈঠক করেন মামুনুল হক। ডা. তাহের জোটের আসন বণ্টনের দায়িত্বে রয়েছেন। 

আগামী ২০ জানুয়ারি মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন। তার আগেই আসনগুলো বণ্টন হয়ে যাওয়ার আশা প্রকাশ করে মামুনুল হক বলেন, এরপর আসনগুলোতে যে দলের প্রার্থী থাকবেন, তিনি ছাড়া বাকিরা মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নেবেন।

জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেছেন, ইসলামী আন্দোলনের রাখা আসনগুলোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে লিয়াজোঁ কমিটিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তারা সিদ্ধান্ত নিয়ে জানালে শীর্ষ নেতৃত্ব বসে সিদ্ধান্ত নেবেন।

৪৪ আসনে প্রার্থী দিয়েছে এনসিপি। ইসলামী আন্দোলনের রাখা আসনের অন্তত ১০টি চায় জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ছাত্রনেতৃত্বের গড়া দলটি। ঢাকা-৭ আসনে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে নির্বাচন করবেন জামায়াতের সবচেয়ে ধনাঢ্য প্রার্থী হাজী মো. এনায়েত উল্লা। তবে এ আসনে প্রার্থী রেখেছে এনসিপি। ঢাকার সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর মুহাম্মদ আদেলের ছেলে তারেক আহম্মেদ আদেল শাপলা কলি প্রতীকের প্রচার চালাচ্ছেন। গতকালও তাঁর পক্ষে শীতবস্ত্র বিতরণ করেন অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পদ থেকে পদত্যাগের পর এনসিপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেওয়া আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। তিনিও বলেছেন, ৩০টির বাইরেও কিছু আসনে শাপলা কলির প্রার্থীরা ১০ দলীয় জোটের হয়ে লড়বেন। 

বরিশাল বিভাগের ২১টি আসনে ছয়টি নিজের জন্য রেখে বাকি ১১টি ইসলামী আন্দোলনকে ছেড়েছিল জামায়াত। দুটি এবি পার্টি এবং এনসিপি ও এলডিপিকে একটি করে আসন ছাড়া হয়েছিল। ইসলামী আন্দোলন বরিশাল অঞ্চলের দল। জামায়াত এবং জোটের অন্য দলগুলোর অবস্থান এসব এলাকায় দুর্বল। ফলে ইসলামী আন্দোলনকে ছাড়া কিছু আসন অন্যান্য দলকে দেওয়া হতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে বরগুনা-১, পটুয়াখালী-৪ ও বরিশাল-২সহ কয়েকটি আসন। তবে এসব আসনেও কোনো দলের সাংগঠনিক শক্তি সবল নয়।

এনসিপির দাবিতে রয়েছে ঝালকাঠি-১ আসন। আগের বণ্টনে এনসিপি এ আসনটি জামায়াতকে ছেড়ে দিয়েছিল। ইসলামী আন্দোলনকে ঝালকাঠি-২ আসন ছাড়া হয়েছিল। ইসলামী আন্দোলন জোট ছাড়ার পর এনসিপিকে ঝালকাঠি-২ দিয়ে ঝালকাঠি-১ আসনে নির্বাচন করতে চায় জামায়াত।