শিরোনাম
Passenger Voice | ১২:২৬ পিএম, ২০২৬-০১-১৪
দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্ট মার্টিনের জেটিঘাটে জাহাজ থেকে নামতেই মাইকিংয়ের শব্দ কানে ভেসে আসে। পরিবেশ অধিদপ্তরের এক কর্মীকে পর্যটকদের উদ্দেশে বলতে শোনা যায়, ‘সম্মানিত পর্যটকবৃন্দ, প্রতিবেশ সংকটাপন্ন ছেঁড়াদিয়া দ্বীপে ভ্রমণ করবেন না, পরিবেশ-প্রতিবেশ রক্ষায় সরকার ছেঁড়াদিয়া দ্বীপে ভ্রমণ নিষিদ্ধ করেছে।’ দ্বীপের প্রবেশমুখেও ছেঁড়াদিয়া দ্বীপ কেন ভ্রমণ করা যাবে না—এসবের নির্দেশনাসংবলিত সাইনবোর্ড নজরে পড়ে।
কিন্তু এত প্রচার-প্রচারণার পরও দেশের সর্বদক্ষিণের শেষ ভূখণ্ড জীববৈচিত্র্যে ভরপুর প্রতিবেশ সংকটাপন্ন ছেঁড়াদিয়া দ্বীপে ভ্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। দিনের বেলায় যেতে না পারলেও ভোররাতেই প্রশাসনের নজর এড়িয়ে পর্যটকেরা ছেঁড়াদিয়া ভ্রমণে হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন।
গত সোমবার সকাল ৬টায় সেন্ট মার্টিনের দক্ষিণ সৈকতে গিয়ে এই দৃশ্য দেখা যায়। পর্যটক আনা-নেওয়ায় সেখানে সৈকতের বালিয়াড়িতে রীতিমতো ইজিবাইক ও মোটরসাইকেলের স্ট্যান্ড গড়ে উঠেছে। রয়েছে কয়েকটি দোকানপাটও। শ-দেড়েক ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক (টমটম), ভ্যান ও শতাধিক মোটরসাইকেল সেখানে পার্ক করে রাখা।
ভ্রমণ নিষিদ্ধ ছেঁড়াদিয়া দ্বীপে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, প্রবাল, সামুদ্রিক জীব ও পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য পর্যটকদের প্রবেশে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে সরকার। সেখানে সাইক্লিং, মোটরযান চলাচল, রাতে থাকা এবং প্লাস্টিক ব্যবহার নিষিদ্ধ।
সেন্ট মার্টিনের দক্ষিণ সৈকত থেকে একটু এগোলেই ছেঁড়াদিয়া দ্বীপ। দ্বীপের প্রবেশমুখে প্রায় ২০০ ফুট এলাকা বাঁশ দিয়ে ঘিরে পথ বন্ধ করা। এর পাশেই ১৫-২০ ফুট জায়গা উন্মুক্ত। বাঁশের মাথায় উঁচিয়ে দেওয়া হয়েছে লাল পতাকা। ঘেরার মাঝামাঝি বালিয়াড়িতে টাঙানো হয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তরের সাইনবোর্ড। তাতে লেখা, ‘প্রতিবেশ সংরক্ষণের জন্য নির্ধারিত জায়গা। এ জায়গা সর্বসাধারণের প্রবেশ নিষিদ্ধ।’
পর্যটক ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভোর চারটা থেকে ছেঁড়াদ্বীপ ভ্রমণের জন্য হাজারো পর্যটক সেন্ট মার্টিনের দক্ষিণ সৈকতে জড়ো হয়। সেখান থেকে হেঁটে ছেঁড়াদ্বীপে যেতে হয়।
ইজিবাইকচালক আবদুল হান্নান (৫০) ও আবদুল শুক্কুর (৪০) জানান, সেন্ট মার্টিন ভ্রমণে আসা পর্যটকদের ছেঁড়াদ্বীপ ভ্রমণের আগ্রহ বেশি। কিন্তু দুই বছর ধরে দিনের বেলায় ভ্রমণে কড়াকড়ি আরোপ করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর। এ জন্য ভোরে গিয়ে সকাল ৮টার মধ্যে পর্যটকেরা ফেরেন।
ছেঁড়াদ্বীপের প্রবেশমুখে কথা হয় নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার থেকে ভ্রমণে আসা সাফায়েত করিম ও শায়লা শারমিনের সঙ্গে। এই নবদম্পতি উঠেছেন সেন্ট মার্টিন পশ্চিম সৈকতের একটি রিসোর্টে। ভোর ৫টায় তাঁরা ভ্রমণে বের হন। ভ্রমণের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে এ দম্পতি বলেন, ‘অযথা ছেঁড়াদিয়ায় গেলাম। অন্ধকারে তেমন কিছুই দেখা হয়নি। তারপরও দেশের শেষ সীমানায় যেতে পেরেছি, সেটাই সান্ত্বনা।’
কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম থেকে আসা হামিদুল হক (৫৫) নামের এক পর্যটক আক্ষেপ করে বলেন, ‘নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও এত মানুষ এখানে কেন এসেছেন, তা বোধগম্য নয়।’ তাহলে তিনি কেন এলেন জানতে চাইলে হামিদুল বলেন, পরিবারের লোকজনের সঙ্গে ঘোরের মধ্যে তিনিও চলে এসেছেন।
সকাল ৬টা থেকে ৮টা পর্যন্ত ছেঁড়াদ্বীপের মুখে অবস্থান করে দেখা যায়, কুয়াশায় সূর্যের দেখা নেই। ভাটার কারণে দ্বীপের রাস্তার দুই পাশের প্রবাল পাথরগুলো ভেসে উঠেছে। আশপাশের গাছগাছালিতে পাখির হাঁকডাক ও ওড়াউড়িতে প্রাণবন্ত হয়ে উঠছে সকাল। এর মধ্যে শত শত পর্যটককে দ্বীপে ঘোরাঘুরি শেষে চলে যেতে দেখা যায়।
পর্যটকদের পেছনে পরিবেশ অধিদপ্তরের তিন কর্মী হ্যান্ডমাইক হাতে দ্বীপ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি তুলে ধরে প্রচার চালাচ্ছিলেন। আবদুল হামিদ নামের এক কর্মী বলেন, ‘ভোর চারটার দিকে তাঁরা ঘুম থেকে জেগে ওঠার আগেই পর্যটকেরা ছেঁড়াদিয়ায় ঢুকে পড়েন। একসঙ্গে এত পর্যটক সামাল দেওয়া মুশকিল হয়ে পড়ে। অসহায়ের মতো আমাদের তাকিয়ে থাকা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না। তখন শুধু পর্যটকদের পাহারা দিই।’
জেটিঘাট এলাকার একটি রিসোর্টের ব্যবস্থাপক জাফর আলম বলেন, ‘পর্যটকদের ছেঁড়াদিয়া দ্বীপে ভ্রমণে নিরুৎসাহিত করা হয়। কেউ শোনেন, কেউ শোনেন না। ভ্রমণ শেষে কিছু দেখতে না পেয়ে হতাশা প্রকাশ করেন।
জানতে চাইলে পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজার অঞ্চলের পরিচালক জমির উদ্দিন বলেন, ‘ছেঁড়াদিয়া দ্বীপের পরিবেশ পুনরুদ্ধারে পর্যটকদের ভ্রমণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কিন্তু ভোররাতে অন্ধকারে কী জন্য তাঁরা দ্বীপ ভ্রমণে যান, তা বোধগম্য নয়। এ দ্বীপের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় স্থানীয়দের পাশাপাশি পর্যটকদেরও দায়িত্ব রয়েছে। সংকটাপন্ন দ্বীপের পরিবেশ-প্রতিবেশ রক্ষায় সচেতনতা জরুরি।’
প্যা/ভ/ম
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত 2019 - 2026 PassengerVoice | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Developed By Muktodhara Technology Limited.
পাবলিক মতামত